শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:১১

ধর্মতত্ত্ব

হ্যালোইন উৎসব বাংলাদেশের সংস্কৃতি নয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

হ্যালোইন উৎসব বাংলাদেশের সংস্কৃতি নয়

উপন্যাসের কল্পকাহিনীর মতো প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর গভীর রাতে ঢাকার আকাশেও কি হ্যালোইন ডাইনি হ্যারি পটারের সেই উড়ন্ত ঝাড়–তে চড়ে হাজির হতে শুরু করেছে? নাকি আমাদের দেশের অত্যুৎসাহী কিছু মানুষ না জেনেই হ্যালোইনের বীভৎস সাজে নিজেদের কুসংস্কারপ্রেমী আসল চেহারাগুলো প্রদর্শন করছে? ঢাকা শহরের অলিগলিতে ঝুলে থাকা পাইভারগুলোয় তো হ্যালোইন ডাইনি আটকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু না, আমাদের দেশের কিছু মানুষ তা হতে দেয়নি। তারা এ কুসংস্কারটাকে উৎসবের রূপ দিতে চাইছে। বাংলাদেশের কোনো অশিক্ষিত মানুষ হয়তো এ উৎসবের ব্যাপারে জানেই না। তবে যে শিক্ষিত মানুষগুলো বড় বড় ফাইভ স্টার হোটেলগুলোয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে তারা কীসের ভিত্তিতে করছে? নাকি জেনেবুঝেই বাংলাদেশের সরলমনা মুসলিমদের ওপর একটি বীভৎস রীতি গেলানোর চেষ্টা চলছে? ইউরি বেজমেনভ নামের একজন রাশিয়ান গুপ্তচর (যিনি ১৯৭০ সালে ¯œায়ুযুদ্ধের সময় রাশিয়া থেকে আমেরিকা ডিফেক্ট করেন) তার একটি লেকচারে এ ধরনের অ্যাকটিভিটিকে ডিমরালাইজেশন আখ্যা দিয়েছিলেন। একটা দেশে ডিমরালাইজ করতে ১৫ থেকে ২০ বছর লাগে। কেন ২০ বছর লাগে? তিনি বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে একটা জেনারেশনের চিন্তাকে নতুন একটা কাঠামোয় রূপ দেওয়া যায়, তার সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করা যায়। এর মাধ্যমে একটি জাতির অনেক বিষয়ের ওপর আঘাত হানা হয়। যেমন ধর্ম, শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, ক্ষমতার বিন্যাস, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, আইন-কানুন ইত্যাদি। আমাদের দেশেও এমন অনেক সংস্কৃতি শকুনের পিঠে চড়ে উড়ে আসছে যা আমাদের যুবসমাজকে দিন দিন ধ্বংস করে দিচ্ছে। হ্যালোইন কেন বর্জনীয় তা জানার আগে হ্যালোইন কী তা জেনে নেওয়া যাক।

হ্যালোইন কী : এটি কেল্টিক জাতির একটি পূজা উৎসব। এরা লৌহযুগের পৃথিবীতে ইন্দো-ইউরোপীয় একটি জাতি। বর্তমান আয়ারল্যান্ড ও ফ্রান্সের উত্তরাংশেই এককালে এদের গোড়াপত্তন হয়। তারা ছিল মূর্তিপূজক ও বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এদের বছর শুরু হতো ১ নভেম্বর আর শেষ হতো ৩১ অক্টোবর। একই সঙ্গে  অক্টোবরকেই তাদের গ্রীষ্মের শেষ সময় ধরা হতো এবং নভেম্বর ছিল শীতের শুরু। তাদের বলা হতো কেল্টিক জাতি। তাদের ধারণা ছিল, গ্রীষ্মের শেষে খারাপ আত্মাগুলো পৃথিবীতে চলে আসার কারণেই ফসল ফলে না, গাছের পাতা শুকিয়ে যায়, গাছ মারা যায়, চারপাশের সবকিছু মৃত আর ঠা-া হয়ে যায়। তারা এও বিশ্বাস করত, মৃতদের আত্মা ত্রিকালজ্ঞ, অর্থাৎ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবকিছু জানে। কেল্টিকরা ভাবত, খারাপ আত্মাগুলোই তো ফসল ফলা-না ফলার জন্য দায়ী। তাই এই রাতে খারাপ আত্মাদের সন্তুষ্ট করতে পারলে কেল্টিকদের প্রধান পুরোহিতরা তাদের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ফসল-ফলাদি আর চাষাবাদের ব্যাপারে সম্যক ধারণা পাবে। খারাপ আত্মাগুলো যেন তাদের কোনো ক্ষতি না করতে পারে এই ভেবে উৎসবের পুরোটা সময় কেল্টিকরা অদ্ভুত সব পোশাক আর মুখোশ পরত, একটা ছদ্মবেশে থাকত। পোশাকগুলো হতো কল্পিত ভূতপ্রেতের মতো। কেল্টিকরা এ কাজ করত এই ভেবে, তারা যদি ভূতপ্রেতের পোশাক পরে ছদ্মবেশ নেয় তবে ওপার জগৎ থেকে উঠে আসা খারাপ আত্মাগুলো তাদের চিনতে পারবে না, বেঁচে থাকা কেল্টিকদের নিজেদের সদস্যই মনে করবে। ফলে খারাপ আত্মাদের দ্বারা তাদের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। পাশাপাশি তাদের পুরোহিতরা একটি অন্ধকার ওক (পবিত্র গাছ হিসেবে বিবেচনা করা হতো) বনে মিলিত হতো বনের ছোট পাহাড়ে নতুন আগুন জ্বালানোর জন্য এবং তারা সেখানে বীজ ও প্রাণী উৎসর্গ করত। আগুনের চারদিকে নাচ-গান চলত প্রভাত পর্যন্ত। বর্তমানে হ্যালোইন উৎসবে পালিত কর্মকান্ডের মধ্যে রয়েছে ট্রিক-অর-ট্রিট, বনফায়ার বা অগ্ন্যুৎসব, আজব পোশাকের পার্টি, ভৌতিক স্থান ভ্রমণ, ভৌতিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন ইত্যাদি। আইরিশ ও স্কটিশ অভিবাসীরা উনিশ শতকে এ ঐতিহ্য উত্তর আমেরিকায় নিয়ে আসে। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে অন্যান্য পশ্চিমা দেশও হ্যালোইন উদ্‌দযাপন শুরু করে। বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশে হ্যালোইন পালিত হয়, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, পুয়ের্তো রিকো ও যুক্তরাজ্য। এ ছাড়া এশিয়ার জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে এ দিবসটি পালিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশেও কয়েক বছর ধরে ফাইভ স্টার হোটেলগুলোয় এ কুসংস্কারে মোড়ানো ভিত্তিহীন উৎসব আয়োজিত হয়ে আসছে।

ইসলাম কী বলে : হ্যালোইনের ধারণাটাই এসেছে মূলত মৃত আত্মাদের দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন নিয়ে, যা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। আল কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ও অসংখ্য হাদিসে এর বিরোধিতা করা হয়েছে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, সে বলে, “হে আমার রব! আমাকে ফেরত পাঠান, যেন আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম”। কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদের পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরজখ। অতঃপর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, সেদিন তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না, কেউ কারও বিষয়ে জানতে চাইবে না। অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজদের ক্ষতি করল, জাহান্নামে তারা হবে স্থায়ী।’ সূরা মুমিনুন, আয়াত ৯৯-১০৩। এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়, মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মা দুনিয়ায় ফিরে আসা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য উৎসর্গিত ট্রিক অর ট্রিট, বনফায়ার বা অগ্নিপূজা ইত্যাদি একজন মুসলমান কখনই পালন করতে পারে না। একজন মুসলমান কখনই পারে না উৎসবের নামে জিইয়ে রাখা পৌত্তলিক রীতিনীতিগুলো পালন করতে। একজন মুসলমান পারে না পশ্চিমাদের অনুসরণ করতে গিয়ে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কাজ করতে।  ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের অনুসরণ-অনুকরণ করবে সে তাদের দলভুক্ত হবে।’ আবু দাউদ। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক


আপনার মন্তব্য