Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:২২

কোর্ট ম্যারেজ ও স্বামীকে তালাক

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

কোর্ট ম্যারেজ ও স্বামীকে তালাক

মানবজীবনের অনেক গল্প থাকে। কিছু গল্পের অবতারণা হয়, যার কোনো সান্ত্বনা থাকে না। মনে হতে থাকে এ সমস্যার নেই বুঝি কোনো সমাধান। পাঠক! আমি আমি আজ তেমনি একটি গল্প শোনাবো। কিন্তু গল্পের চরিত্র যদি আপনার দুঃখবোধকে উসকে দেয়; তাহলে ক্ষমা করে দেবেন। একটি অভিজাত পরিবারের শিক্ষিতা মেয়ে রুশি (ছদ্মনাম)। মাঝারি গড়নের, চিকন ও ফরসা। ডাগর ডাগর দুটি চোখজুড়ে যেন কিছু না পাওয়ার প্রতিচ্ছবি। ওই দুটি চোখই বলে দেয়, তার হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা যন্ত্রণার ঢেউ। হঠাৎ একদিন আইনজীবী চেম্বারে এসে হাজির। মোয়াক্কেলা হিসেবে পরিচয় পর্বেই মেয়েটিকে অদ্ভুত প্রকৃতির মনে হলো। তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা বিষয় নিয়ে আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ছাড়ল। একটা মানুষ অজানা বিষয় জানতে চাইতে পারে। আইন বিষয়ে যেটুকু পড়াশোনা করেছি, জেনেছি, জানাতে তো অসুবিধা নেই! এই ভেবে আমি ধৈর্য ও আন্তরিকতা নিয়েই তার প্রশ্নগুলো শুনে, বুঝে উত্তর দিতে চেষ্টা করলাম। পাঠক, আমি গল্পের শুরুতেই বলেছি, মেয়েটি অভিজাত পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া শিক্ষিতা মেয়ে। আইনের সামান্য ছোটখাটো বিষয়ে মেয়েটির জ্ঞানের গভীরতা দেখে মনে হলো, এই যদি হয় একজন শিক্ষিত মেয়ের দশা, তাহলে এ দেশের মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, স্বল্প শিক্ষিত নারীদের জানার পরিধি কতটা! এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলতে হয়, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ আইনের স্বাভাবিক বিবর্তন নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা মনে করে আইন, অপরাধ, শাস্তি ইত্যাদি আইনের ছাত্র, শিক্ষক ও বোদ্ধা আইনজীবীদেরই একান্ত জানা প্রয়োজন। অথচ জনগণের আইন সচেতনতা একটি মৌলিক প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনগ্রন্থ সে দেশের সংবিধান। আমাদের সংবিধানের (প্রস্তাবনা-অনুচ্ছেদ ৪) এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানকে রক্ষার, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের একটি সাধারণ দায়িত্ব জনগণের হাতে অর্পণ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, জনগণের আইনবিষয়ক সুষ্ঠু চিন্তাভাবনা ও সচেতনতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয় জীবনে আমাদের আইন ভাবনা খুব একটা ক্রিয়াশীল তো নয়ই, বরং বহুমাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল।  পাঠক, আসল কথায় ফিরে আসি। মেয়েটি প্রথমে আমার কাছে জানতে চাইলো, ধরুন কেউ যদি শুধু কোর্ট ম্যারেজ করে, কিন্তু কাবিননামাটি সম্পন্ন না করে সংসার করতে থাকে, তাহলে বিয়ের বৈধতা কতটুকু? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে আমাকে যা বলতে হলো তা নিুরূপ বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজের কোনো বৈধতা নেই, এমনকি এর কোনো অস্তিত্বও নেই। অনেকে ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে গিয়ে হলফনামা করাকে বিয়ে বলে অভিহিত করা হয়। অথচ এফিডেভিট বা হলফনামা শুধুই একটি ঘোষণাপত্র। আইনানুযায়ী কাবিন রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেই কেবল ঘোষণার জন্য এফিডেভিট করা যাবে। মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ বিধি ২০০৯-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী ‘নিকাহ রেজিস্ট্রার ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহ করান তাহলে বর ৩০ দিনের মধ্যে ওই নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে অবহিত করবেন, যার এলাকায় ওই বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে।’ মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ আইন ১৯৭৪-এর ধারা ৫(৪) অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রেশন না করার শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ  বা তিন হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দে  দি ত করার বিধান রয়েছে। উপরের গল্প ও প্রশ্নোত্তর শুনে মেয়েটি বলল, আমি আমার স্বামীকে ভালোবেসে কোর্ট ম্যারেজ করেছিলাম। ওর ঔরসে আমার একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। কিন্তু আমি ওকে তালাক দিতে চাই। ১৯৩৯ সালের মুুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কি কি কারণে একজন স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবে। কারণগুলো হলো ১. চার বছর পর্যন্ত স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলে। ২. দুই বছর স্বামী স্ত্রীর খোরপোশ দিতে ব্যর্থ হলে। ৩. স্বামীর সাত বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি কারাদ  হলে। ৪. স্বামী কোনো যুক্তিসংগত কারণ ব্যতীত তিন বছর যাবৎ দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে। ৫. বিয়ের সময় পুরুষত্বহীন থাকলে এবং তা মামলা দায়ের করা পর্যন্ত বজায় থাকলে। ৬. স্বামী দুই বছর ধরে পাগল থাকলে অথবা কুষ্ঠ ব্যাধিতে বা মারাÍক যৌন ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকলে। ৭. স্বামী ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধান লঙ্খন করে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করলে। ৯. স্বামীর নিষ্ঠুরতার কারণে। উপরে যে কোনো এক বা একাধিক কারণে স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে। অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব স্ত্রীর। তালাক বিষয়ে উপরোক্ত আইনগত ব্যাখ্যার পর মেয়েটির এবারের প্রশ্ন, আমার মেয়েটি আমার সঙ্গে থাকতে পারবে কি-না? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমাকে যা বলতে হলো তা নিুরূপ মুসলিম আইন ও রাষ্ট্রীয় আইন অনুসারে পিতাই সন্তানের প্রকৃত অভিভাবক। তাই সন্তানের ভরণপোষণের সমস্ত দায়-দায়িত্ব হচ্ছে বাবার।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন গ্রন্থ প্রণেতা।

           Email:seraj.pramanikÑgmail.com


আপনার মন্তব্য