শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:৩১

তাৎপর্যপূর্ণ লাইলাতুল বরাত

মুফতি আমজাদ হোসাইন হেলালী

তাৎপর্যপূর্ণ লাইলাতুল বরাত

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রাত অর্থাৎ ১৪ শাবান দিবাগত রাত উপস্থিত হয়, তখন সেই রাতে জাগরণ করে তোমরা নামাজে মগ্ন হবে এবং পরদিন রোজা রাখবে। কারণ আল্লাহতায়ালা এ রাতে সূর্যাস্তের পর পৃথিবীর আসমানে অবতরণ করেন এবং তাঁর বান্দাদের ডেকে ঘোষণা দিতে থাকেন- আছে কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? যাকে আমি ক্ষমা করব, আছে কোনো রিজিকপ্রার্থী? যাকে আমি রিজিক দেব? আছে কোনো বিপদাপন্ন? যার বিপদ আমি দূর করে দেব? আছে কোনো তওবাকারী? যার তওবা আমি কবুল করব। এভাবে নানা শ্রেণির বান্দাকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা আহ্বান করতে থাকেন।’ ইবনে মাজাহ, মিশকাত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান’ অর্থাৎ অর্ধ শাবানের রাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের সমাজে এ রাতটি ‘শবেবরাত’ নামে পরিচিত। ‘শব’ অর্থ রাত আর ‘বারাআত’ অর্থ মুক্তি। আরবিতে ‘লাইলাতুল বারাআত’ বলা হয়। ‘লাইলাতুন’ অর্থ রাত আর ‘বারাআত’ অর্থ মুক্তি, নাজাত, নিষ্কৃতি প্রভৃতি। এক কথায় ‘লাইলাতুল বারাআত’ মানে মুক্তির রাত। এ রাতে আল্লাহর খাঁটি মমিন বান্দা-বান্দিরা আল্লাহর কাছ থেকে গুনাহ ক্ষমা করিয়ে থাকেন। তাই এ রাতকে শবেবরাত বা গুনাহমুক্তির রাত বলা হয়। বিশ্বে বিশেষ করে আমাদের ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের কাছে শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি অত্যন্ত বরকতময় ও মহিমান্বিত বলে বিবেচিত। মুসলমানরা পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে নিজের সারা জীবনের দোষ-ত্রুটি, পাপকাজ ও অন্যায়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। মুমিন বান্দা-বান্দিরা যদি শরিয়ত-নির্ধারিত পদ্ধতিতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তাহলে আল্লাহ ইচ্ছা করলে বান্দার সব গুনাহ মাফ করে দিতে পারেন। এ রাতে মুমিন বান্দা-বান্দিদের ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষিত হয়; সুবহানাল্লাহ। যেহেতু এ রাতে মহান রব্বুল আলামিন ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিপদ থেকে উত্তরণের পথ দেখান তাই মুসলমানের কাছে শবেবরাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য এক হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘শাবানের ১৪ তারিখের রাতে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন (যারা তওবা করে ক্ষমা চায়)।’ বায়হাকি। পাপী লোকেরা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিজ নিজ পাপকাজ পরিত্যাগ করে তওবা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শবেবরাতেও তাদের জন্য ক্ষমার দ্বার উন্মুক্ত হবে না। এ রাতটি মানুষের নৈতিক চরিত্র গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে বান্দা শবেবরাতের তাৎপর্য অনুধাবন করে সব ক্ষেত্রে অন্যায় পরিহার ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়। এভাবে ইসলামের প্রতি মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ রাতে ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে নিমগ্ন থাকাই প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের প্রধান কাজ। এ রাতে তওবা-ইস্তেগফার করা, আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আকুতি জানানো এবং জীবিত ও মৃতদের পাপরাশি ক্ষমালাভের জন্য দোয়া করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এ রাতে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, কবর জিয়ারত ও পরদিন নফল রোজা রাখার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সক্ষম হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এ রাতে কবর জিয়ারত করতেন এবং ইবাদতে নিমগ্ন হতেন। রসুলুল্লøাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শাবানের ১৫ তারিখে রোজা রাখবে, দোজখের আগুন তাকে স্পর্শ করবে না।’ আবু দাউদ। শবেবরাতে করণীয় আমলের সঙ্গে কতগুলো বর্জনীয় বিষয়ও সম্পৃক্ত আছে। এ রাতে অপব্যয় না করে এবং আতশবাজিতে অনর্থক অপচয় না করে সে অর্থ মানবতার কল্যাণকর কাজে বা গরিব-মিসকিনের মধ্যে দান-সাদকা করা অনেক সওয়াব ও বরকতের কাজ। প্রকৃতপক্ষে শবেবরাতের বৈশিষ্ট্য অনুষ্ঠানের আড়ম্বরতার মধ্যে নয়, বরং উন্নত চরিত্র গঠনের মাধ্যমে আল্লাহর করুণালাভের আন্তরিক প্রয়াসই এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। আপন শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের এ বিষয়টি বোঝানো প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব ও অবশ্য-কর্তব্য। এ রাতে প্রত্যে ইমানদার মানুষের মধ্যে অতুলনীয় এক ধর্মীয় অনুভূতি ও চেতনা পরিলক্ষিত হয়। এ রাতে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করাই বান্দার একমাত্র কর্তব্য।

                লেখক : মুহাদ্দিস, মুফাসসির, খতিব ও টিভি উপস্থাপক।


আপনার মন্তব্য