Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ জুলাই, ২০১৯ ২৩:২৫

ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক রিফাত হত্যা মামলায়

এ কে এম শহীদুল হক

ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক রিফাত হত্যা মামলায়

বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যার ভিডিওচিত্র দেখে হৃদয় কাঁপেনি এমন কোনো ব্যক্তি নেই। ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রকাশ্য দিবালোকে কলেজের সামনের ব্যস্ত সড়কে এই নির্মম ও রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে স্বামীকে বাঁচানোর জন্য পাগলের মতো হত্যাকারীদের নিবৃত্ত করতে আমরা দেখেছি। তিনি অসহায়ের মতো চিৎকার করছিলেন এবং স্বামীকে বাঁচানোর জন্য কাকুতি করেছিলেন। তার এ প্রচেষ্টার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা বা অভিনয় ছিল, তেমন কোনো কিছু দর্শকের মনে হয়নি। ঘটনার ২০ দিন পর অর্থাৎ ১৬ জুলাই পুলিশ মিন্নিকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গ্রেফতার করে। পুলিশের দাবি, মিন্নি হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তিনি পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

মিন্নিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ রিমান্ড প্রার্থনা করলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। সবচেয়ে আশ্চর্য ও দুঃখজনক বিষয় হলো, আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। আদালতে উপস্থিত আইনজীবীদের কেউ মিন্নির পক্ষে বক্তব্য দেবেন কিনা জানতে চেয়েও বিচারক কোনো আইনজীবীর সাড়া পাননি। মিন্নি আদালতে নিজ আরজিতে স্বামী হত্যার বিচার চেয়েছিলেন। মিন্নির পক্ষে আইনজীবী থা -কবে না এটা স্বাভাবিকভাবে সমর্থন করা যায় না। অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনে আইনি সহায়তা পাওয়া তার সাংবিধানিক অধিকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের পক্ষে আইনজীবী ছিল। যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামিদের পক্ষে আইনজীবী ছিল। ২১ আগস্ট হত্যাকান্ডের আসামিদের পক্ষে আইনজীবী ছিল। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি যারা মামলার আসামি ছিল তাদের সবার পক্ষেই আইনজীবী ছিল। মিন্নি তো কোনো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বা জঙ্গি নয়। সে সাধারণ পরিবারের একজন সাধারণ নারী। তার পক্ষে কেন আইনজীবী থাকবে না। কোনো কোনো সংবাদ প্রতিবেদনে জানা যায়, একটি মহল কর্তৃক আইনজীবীদের সতর্ক করা হয়েছিল যাতে কেউ মিন্নির পক্ষে অবস্থান না নেয়। এটা সত্য হলে অভিযোগটি গুরুতর। একজন নাগরিকের আইনের সহায়তা নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার শামিল।

রিফাত হত্যার অভিযুক্ত আসামিরা সন্ত্রাসী প্রকৃতির ও তারা মাদক ব্যবসাসহ নানাবিধ অপরাধে জড়িত ছিল বলে স্থানীয় জনগণের কেউ কেউ বিভিন্ন মিডিয়ায় অভিযোগ করেছেন। নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর নেতৃত্বে ‘০০৭ বন্ড’ নামে কিশোর অপরাধ চক্র গড়ে উঠেছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছত্রচ্ছায়ায় ছিল। কেউ কেউ তাদের আত্মীয়ও বটে। প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় প্রশাসন ও পুলিশ তাদের অনেকের অপকর্মের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ছিল বলে অভিযোগও আছে। কিন্তু নয়ন বন্ডকে পুলিশ একাধিকবার গ্রেফতার করেছে। তার বিরুদ্ধে ৫-৭টি মামলাও আছে। অন্যদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। কিন্তু তারা বেপরোয়া প্রকৃতির ছিল। তাদের এলাকার শান্তিপ্রিয় লোকেরা ভয় পেত।

হত্যাকান্ডের অভিযুক্ত আসামিরা যেসব প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রচ্ছায়ায় থেকে অপরাধ জগতে সক্রিয় ছিল সেসব প্রভাবশালী মহল রিফাত শরীফের নৃশংস ও মর্মান্তিক হত্যাকান্ডে জড়িত আসামিদের বিপক্ষে গিয়ে হত্যাকান্ডের বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিল না। অভিযোগ আছে একজন সাবেক সংসদ সদস্যের পুত্রের ছত্রচ্ছায়ায় নয়ন বন্ড বেপরোয়া হয়ে ওঠে। রিফাত হত্যার পর তিনি মিন্নির চরিত্রহননের চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। হত্যাকারীদের বিচার চাওয়ার পরিবর্তে তিনি মিন্নিকে গ্রেফতার করার জন্য মানববন্ধন করেন। এতে সচেতন মহলের ধারণা সৃষ্টি না হওয়ার কারণ নেই যে, একটি শক্তিশালী মহল খুনিদের পক্ষে নেপথ্য ও কৌশলে অবস্থান নিচ্ছে এবং পুলিশকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

মিন্নি একজন সাধারণ পরিবারের মেয়ে। সে কোনো প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে নেই। তার বিরুদ্ধে তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেলে পুলিশ এমনিতেই আইনগত ব্যবস্থা নেবে। এজন্য মানববন্ধন ও সামাজিক মিডিয়ায় চরিত্রহননের প্রয়োজন আছে কী?

পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, মিন্নি হত্যাকান্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে তার স¤পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। কী অবস্থার কতটুকু সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন তা পুলিশই বলতে পারবে। তিনি আরও বলেছেন, আসামিদের সঙ্গে মিন্নির কথোপকথনের প্রমাণ আছে। হয়তো এসব তথ্য ঠিক। কিন্তু প্রমাণের ঊর্ধ্বে নয়। মিন্নির বক্তব্য ও অন্য আসামিদের স্বীকারোক্তি, কথোপকথনের সবকিছুরই তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। আসামিরা আদালতে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছে তার সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। অতীতে এমন অনেক ঘটনায় দেখা গেছে আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার সময় তাদের প্রতিপক্ষ বা বাদী/সাক্ষীদের কাউকে জড়িত করে নিজেরা ফায়দা নিয়ে বিপক্ষকে ফাঁসাতে চায়। তদন্ত কর্মকর্তা তদন্তে আসামির ওই স্বীকারোক্তি সমর্থনযোগ্য সাক্ষ্য (Corroborotive Evidence) দ্বারা প্রমাণ করতে হবে। মিন্নি ও অভিযুক্ত আসামিরা একই এলাকার বাসিন্দা ও একে অন্যের পরিচিত। তাই তাদের মধ্যে কথোপকথন হতেই পারে। পুলিশ হয়তো সিডিআর বিশ্লেষণ করে কললিস্টে নয়ন বন্ড কিংবা অন্য কোনো আসামির সঙ্গে মিন্নির কথোপকথনের প্রমাণ পেয়েছে। কিন্তু কী কথা হয়েছিল তা জানা প্রয়োজন। অডিও থাকলে সেগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। সব বিষয়ই তদন্ত করে দেখতে হবে। প্রভাবশালী মহলের তৎপরতায় প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য যাচাই-বাছাই না করে কারও বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করা সমীচীন হবে না।

সর্বশেষ জানা যায়, মিন্নি ১৯ জুলাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে কী বলেছেন তা এখনো জানা যায়নি। একই কথা পুনরাবৃত্তি করতে হয়। তা হলো, স্বীকারোক্তি বিশ্লেষণ করতে হবে। বক্তব্যের বিষয় তদন্ত করতে হবে। স্বামী হত্যার পর মিন্নি যে প্রচ- মানসিক ও সামাজিক চাপের মধ্যে ছিলেন ওই অবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতাকে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

এটা নিশ্চিত যে, নয়নের সঙ্গে মিন্নির একটা সম্পর্ক ছিল। বিয়ের কথা মিন্নি অস্বীকার করলেও কাজির কথায় বিয়ের বিষয়টির প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হলেও কী পরিবেশে বিয়েটি হয়েছিল এবং মিন্নি বিয়ে মেনে নিয়েছিলেন কিনা, মিন্নির পরিবার এ বিয়ে সম্পর্কে অবগত আছে কিনা তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে। আর নয়নের সঙ্গে বিয়ে হয়ে থাকলে কয়েক মাস পরে আনুষ্ঠানিকভাবে যখন মিন্নির রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ে হয় তখন নয়ন বন্ড কী ভূমিকা পালন করেছিল। একই কাজি বিয়ে রেজিস্ট্রি করার কথা। এ ক্ষেত্রে কাজির ভূমিকা কী ছিল ইত্যাদি বিষয় তলিয়ে দেখা আবশ্যক। মিন্নি একসঙ্গে দুটি ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য মিন্নি দায়িত্ব এড়াতে পারে না। সে বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু হত্যাকান্ড ভিন্ন বিষয়। তার স্বামী রিফাত শরীফকে হত্যা করে মিন্নির কী লাভ, হত্যার মোটিভ কী তাও তদন্তের দাবি রাখে। তাই হত্যাকান্ডের সঙ্গে মিন্নির সম্পৃক্ততার বিষয়টি সতর্কতা ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে গভীরভাবে দেখতে হবে। পুরো ঘটনার মধ্যে মিন্নি যতটুকু জড়িত তার দায় ততটুকুই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ বিষয়টির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

আদালতে মামলা পরিচালনা করা একটি জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়। মিন্নি বা তার পিতার পক্ষে মামলা পরিচালনা করা কঠিন হবে। শুরুতেই আইনজীবীরা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। প্রভাবশালীদের ভয়ে যদি আইনজীবীরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে না চান এবং একজন নাগরিককে তার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা হবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কলঙ্কজনক ঘটনা।

যার তদবিরকারী নেই, যার পক্ষে প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদ নেই, তার একমাত্র ভরসা আইন-আদালত। আমার বিশ্বাস, মিন্নি সে জায়গায় ন্যায়বিচার পাবেন। পুলিশকে শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সাহসের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। দুর্বলের পাশে আইনগত অবস্থান নিয়ে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইনজীবীদের মিন্নির পক্ষে আইনি সহায়তা দিতে এগিয়ে আসতে হবে। আইন ও সালিস কেন্দ্র, নারী সংগঠন এবং লিগ্যাল এইডের সহায়তাও মিন্নি নিতে পারেন।

রিফাত হত্যার সঠিক বিচার হোক। প্রকৃত খুনিরা যাতে ছাড় না পায় এবং নির্দোষ ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেটাই দেশবাসী ও সচেতন নাগরিকদের কাম্য।

লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ।


আপনার মন্তব্য