শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩২

দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের শিক্ষা

নজরুল ইসলাম

দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের শিক্ষা

আমাদের গ্রামাঞ্চলে কৃষকের ঘরে ঘরে যেসব প্রাণিসম্পদ ছড়িয়ে আছে তার মধ্যে ছাগল অন্যতম। একসময় এ দেশের গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে ছাগল প্রতিপালিত হতো। কোনো অনুষ্ঠানে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা করা হতো বাড়ির পালা বড় ছাগলটি জবাই করে। হিন্দুদের পূজায় ব্যবহৃত হতো বাড়ির পালা পাঁঠা। এ দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে কিছুসংখ্যক লোকের জীবিকা ছিল ছাগল চরানো। তারা প্রতিদিন সকালে প্রতি পরিবারের ছাগল সংগ্রহ করে নিয়ে যেত চরাতে। বর্তমানে এ প্রথা বিলুপ্তপ্রায়। ছাগল পালন অত্যন্ত লাভজনক একটি পেশা। অল্প মূলধন ও অল্প জায়গায় ছাগল পালন করা যায়। ছাগলকে বলা হয় গরিবের গাভী। প্রথমে দু-চারটি ছাগল নিয়েই এর ফার্ম শুরু করা যায়। ছাগল রাখার জন্য খুব বেশি জায়গা লাগে না। আলাদা ঘরেরও প্রয়োজন হয় না। নিজেদের থাকার ঘরের পাশে লাগোয়া একটা চালাঘর তৈরি করে দিলে এতে অনায়াসে ছাগল পোষা যায়। এর জন্য আলাদাভাবে চারণভূমিরও প্রয়োজন হয় না। ছাগলের খাবারের জন্য তেমন কোনো খরচ নেই বললেই চলে। মাঠের ঘাস, লতাপাতা খেয়ে তারা জীবনধারণ করে। গরু-মহিষ চরার পর মাঠে যে ঘাস অবশিষ্ট থাকে তা খেয়ে এরা পেট ভরায়। তা ছাড়া বাগানের আগাছা, লতা-পাতা, আনাজের খোসা, ফলের খোসা ইত্যাদি যা গরু-মহিষ খায় না তা খেয়ে ছাগল জীবনধারণ করতে পারে। দুধ ও মাংসের জন্য ছাগল পালন করা যায়। ছাগলের মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু। বাজারে গরুর মাংসের চেয়ে ছাগলের মাংসের মূল্যও বেশি। ছাগলের দুধের গুণগতমান মানুষের দুধের কাছাকাছি। অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন, লৌহ ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ পরিমাণে অনেক বেশি থাকে। এ দুধ শিশুখাদ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ছাগলের দুধ সহজে হজম হয়। সাধারণত গাভীর দুধ হজম হতে সময় লাগে। অ্যালার্জি উপসর্গ যেমন একজিমা, অ্যাজমা, বমি বমি ভাব, হাঁচি, সর্দি, পেটের ভিতর অস্বস্তি, ডায়রিয়া, চর্মরোগ ইত্যাদিতে ভুগলে অথবা যাদের গাভীর দুধে উল্লিখিত অ্যালার্জি উপসর্গ দেখা দেয় তাদের জন্য ছাগলের দুধ অতুলনীয়। অন্যান্য অ্যালার্জি উপসর্গের মধ্যে অ্যাজমা যা ছাগলের দুধ নিয়মিত পান করলে উপশম হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও অন্যান্য নবী-রসুল তাঁদের জীবনকালে নিয়মিত ছাগলের দুধ পান করতেন।

ছাগলের বংশ খুবই তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায়। ছাগী ১০ থেকে ১২ মাস বয়সে গর্ভধারণ করে। একটি ছাগী গড়ে দুই বিয়ানে বছরে চারটি বাচ্চা দেয়। ছাগলের রোগ হয় না বললেই চলে। ফলে এতে ঝামেলা খুব কম। তা ছাড়া ছাগল পালনের একটি মূল্যবান উপজাত হলো চামড়া। এর চামড়া থেকে নানারকম দ্রব্যসামগ্রী তৈরি হয়। ছাগলের লোম থেকে উল তৈরি করা হয় এবং তা থেকে নানারকমের পোশাক তৈরি হয়। ছাগলের বিষ্ঠা জমির একটি উৎকৃষ্ট জৈবসার। একটি ছাগলের বিষ্ঠা থেকে বছরে গড়ে ২০০ কেজি জৈবসার পাওয়া যায়। এ ছাড়া গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা নিরসনে ছাগল পালন কার্যকর অবদান রাখতে পারে। ছাগলের দুধ অধিক হজমকারক বিধায় শিশুদের দুধের চাহিদা পূরণে ছাগলের দুধ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। অধিক হারে ছাগল পালনে পর্যাপ্ত দুধ উৎপন্ন হলে বিদেশ থেকে শিশুখাদ্য হিসেবে দুধের আমদানি হ্রাস পাবে। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। তা ছাড়া এ দেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়ার বিদেশে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। ফলে এর চামড়া রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এ দেশের আবহাওয়া ও ভূমির স্বল্পতার কারণে গরু-মহিষের চেয়ে ছাগল পালন অধিক উপযোগী।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দুধমা হালিমার ঘরে অবস্থানকালে দুধভাইদের সঙ্গে ছাগল চরাতেন। অনুরূপভাবে তিনি যৌবনেও ছাগল চরিয়েছেন। এ সম্পর্কে হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, ‘জাহরান নামক স্থানে আমি রসুলুল্লাহর সঙ্গে ছিলাম। আমি সেখানে পিলু ফল ছিঁড়ছিলাম। তিনি দেখে বললেন কালো কালো দেখে ছিঁড়, এগুলো সুস্বাদু হয়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইয়া রসুলুল্লাহ! আপনি কি ছাগল চরাতেন (যে কারণে আপনি এটা জেনেছেন)? তিনি বললেন হ্যাঁ, এমন কোনো নবী নেই, যিনি ছাগল চরাতেন না।’ বুখারি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এমন কোনো নবী নেই যিনি ছাগল চরাতেন না। সাহাবিরা আরজ করলেন, আপনিও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমিও কয়েক কিরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরিয়েছি।’ বুখারি। ইমাম নাসায়ি নাসর ইবনে খাথন থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, তিনি বর্ণনা করেন, ‘একবার উটের মালিকরা ছাগলের মালিকদের ওপর গর্ব করতে থাকলে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, মুসা (আ.)-কে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল, তিনি ছাগল চরাতেন। দাউদ (আ.)-কে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল, তিনিও ছাগল চরাতেন। আর আমাকেও নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, আমি ও আমার গৃহবাসীদের ছাগল আজইয়াদ নামক স্থানে চরিয়েছি।’ ফাতহুল বারি।

আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা ভেড়া ও ছাগল পালন কর; কারণ তারা সকাল-সন্ধ্যা তোমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে।’ ছাগল পালনের বিশেষত্ব সম্পর্কে একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,  রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ঘোড়া ও উট পালনকারীদের অহংকার আছে যে, তাদের এগুলোর আওয়াজ বড় এবং জঙ্গলে থাকে, কিন্তু নম্রতা ও শান্তি আছে ছাগল পালনকারীদের মাঝে।’

‘নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাগলের দুধ ও মাংস খেতেন। মাংসের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন ছাগলের সামনের রানের মাংস।’ শামায়েল। গৃহপালিত পশুর মধ্যে মানুষের সান্নিধ্যে প্রথম আসে ছাগল। ছাগল পালন মানুষের একটি আদি পেশা। এর সঙ্গে নবী-রসুলরাও যুক্ত ছিলেন। কাজেই ছাগল পালন করাকে হেয় বা ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। ছাগল পালনের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর অসীম রহমত ও বরকত।

                লেখক : কলামিস্ট, গবেষক।


আপনার মন্তব্য