শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০২

মুন্সীগঞ্জে বিশ্বমানের সর্বাধুনিক ডেইরি খামার

শাইখ সিরাজ

মুন্সীগঞ্জে বিশ্বমানের সর্বাধুনিক ডেইরি খামার

একজন মানুষের দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার দুধের প্রয়োজন। কিন্তু উৎপাদন অনুযায়ী আমরা পাচ্ছি ১৬৫ মিলিলিটার। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট চাহিদার ৬৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ দুধ উৎপাদিত হয়েছে। চাহিদার বেশ বড় একটা অংশই পূরণ হচ্ছে না। ফলে বিদেশ থেকে গুঁড়া দুধ আমদানি করতে হচ্ছে। তাই বোঝা যায়, দুধের বড় একটা বাজারের সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের দেশে। অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্যের তাগিদ থেকে অর্গানিক খাদ্যপণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রাহক চায় নিরাপদ দুধের নিশ্চয়তা। এসব বিবেচনায় এ খাতের একটা বড় সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে যুক্ত হচ্ছেন বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তারা। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় সাতঘরিয়া গ্রামে তৈরি হয়েছে এমনই এক ডেইরি খামার। ১০২ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ডাচ ডেইরি লিমিটেড নামের দুগ্ধ খামারটি দেশীয় দুগ্ধশিল্পের জন্য নতুন এক বার্তা। বছরখানেক ধরেই খামারটি দেখতে যাব বলে ভাবছিলাম। গত ডিসেম্বরের এক সকালে গিয়ে হাজির হলাম ডাচ ডেইরি খামারে। যেমন দৃশ্যপট দেখব বলে ভেবেছিলাম, ঠিক তেমনটিই- এমন দৃশ্য নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ডে দেখে এসেছি। সত্যি মুগ্ধকর এক অভাবনীয় ব্যাপার। একটি শিল্পকারখানা যে আয়োজনে বা যে পরিকল্পনা নিয়ে গড়ে ওঠে এখানেও ঠিক তাই। মাত্র দেড় বছরের উদ্যোগ তাই পরিপূর্ণ খামারের সমৃদ্ধ রূপটি ওপর থেকে সেভাবে বোঝা যায় না। তবে শিল্পকারখানার আদলটি ধরা যায় এক কথায় বিশাল আয়োজন।

একটা সময় ‘গরুর খামার’ কথাটি মনে হলেই অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি গোয়ালঘর কিংবা টিনের চালাঘরে সারি সারি গরু দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আমাদের চোখে ভাসে- এমন দৃশ্যই ধারণ করে এসেছি ৪০ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। তখন ভাবতাম কবে আমাদের দেশের দুগ্ধ খামারে মেশিনে দুধ দোয়ানো হবে। ডাচ ডেইরি খামার দেখে মনে হলো সময় পাল্টাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের একটি গরুর খামার কতটা নিয়মনীতির আলোকে গড়ে উঠতে পারে, কতটা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হতে পারে, তা এখানে এসে বোঝা গেল। যদিও ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর দর্শকদের কাছে এটি নতুন কিছু নয়। নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে নেদারল্যান্ডসের ডো-মার্কের কথা, কিংবা ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের আধুনিকতম গরুর খামার নিশ্চয়ই আপনারা ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে দেখে থাকবেন। যা হোক, বলছিলাম মুন্সীগঞ্জের ডাচ ডেইরি ফার্মের কথা। ২০১৮ সালের ৫ মে মালয়েশিয়ান এয়ারলরাইনসের একটি চার্টার্ড বিমানে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে ৭৫টি গরু আসে। এর আগেও চার্টার্ড বিমানে গরু এসেছে, কিন্তু পরিমাণের দিক থেকে সেটিই ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সেই ৭৫টি গরু দিয়েই আন্তর্জাতিক মানের এই খামারের যাত্রা। পরে আরও অনেক গরু যুক্ত হয়েছে। এখন ছোটবড় মিলে ১ হাজার ২০০ গরুর এ খামার। পাঠক! আপনারা অনেকেই প্রাণিসম্পদের স্মার্ট খামার দেখেছেন। বিশেষ করে ডিজি কাউ ও সূর্যমুখী লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আইওটি ব্যবহৃত খামার দেখেছেন। গরুর পেটে থাকা বোলাস বা কলারে থাকা চিপ থেকে সহজেই তথ্য পৌঁছে যায় মোবাইল ফোনে, খামারি যেখানেই থাকুক, সব তথ্যই সে পেয়ে যাবে। এ খামারে ইন্টারনেট অব থিংসের ব্যবহার আরও ব্যতিক্রম। কয়েকটি ধাপে গরুর পেটে বোলাস প্রয়োগ করা হয়। ফলে গরুর শারীরিক যে কোনো পরিবর্তন সহজেই ধরে ফেলা সম্ভব হয়। তথ্য আরও নির্ভুল। এতে গরুকে সুস্থ রাখা যায়, খরচ কমে যায়। লাভ বেশি হয়।

খামারের সার্বিক বিষয় দেখভাল করেন ডাচ ডেইরি ফার্মের পরিচালক মো. গিয়াস আহম্মদ। তিনি ১৮-১৯ বছর ধরে ডেইরি ফার্ম ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইংল্যান্ড ও আমেরিকা থেকে কৃষি বিভাগে পড়াশোনা শেষে নেদারল্যান্ডসে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনিই ঘুরে ঘুরে সম্পূর্ণ খামারটি দেখালেন। জানালেন, খামারে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০-এর বেশি গরু রয়েছে। গরুর জন্য শেডের ফ্লোরে বিছানো আছে ‘কাউ ম্যাট্রেস’। এটা দেখতে কার্পেটের মতো। ফলে গরু চলাফেরা করতে ব্যথা অনুভব করে না। ঘুমাতে সুবিধা হয়। পায়ে কোনো রোগব্যাধি দেখা দেয় না। গরুর বাসস্থান অর্থাৎ শেডগুলোয় আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও বাতাস নিয়ন্ত্রণ করা হয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। গরুর শরীরে যেন ঠিকমতো বাতাস লাগে তার জন্য রয়েছে আধুনিক ফ্যান। গিয়াস জানান, প্রতিটি গরুকে ড্রাই ম্যাটার (সলিড খাবার) খাওয়ানো হয়। সলিড খাবার বলতে যেসব খাবার দেওয়া হয় সেখান থেকে পানি সরিয়ে ফেলা হয়। যেমন, যে কোনো ঘাসে পানি থাকে ৭০-৮০ শতাংশ। এ খামারের প্রতিটি গরুকে পর্যাপ্ত ঘাস ও পানি দেওয়া হয়। খামারেই শতভাগ মানসম্পন্ন ও পুষ্টিকর খাদ্য মিশ্রণে তৈরি হয় গো-খাদ্য। স্বয়ংক্রিয় মেশিনে কাটা হয় ঘাস। কাঁচা ভুট্টার ঘাসের সঙ্গে আরও অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হয় মানসম্পন্ন খাবার। গরুর বাছুরের খাবার তালিকায় দুধ না রেখে পর্যাপ্ত ডেনকাভিট মিল্ক রিপ্লেসার খাওয়ানো হয়। বাংলাদেশে একটি ভুল ধারণার প্রচলন আছেÑ এ দেশের আবহাওয়ায় বিদেশি গরু বাঁচবে না। গিয়াস জানান, তিনিই প্রথম এ ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। বিদেশ থেকে আনা গরু থেকে বেশি পরিমাণে দুধ পাওয়া যায় না। এ রকম একটা ধারণাও আছে। এ ধারণাটিও পাল্টে গেছে। জেনে অবাক হবেন, এখানকার প্রায় ৬০০টি গাভীর প্রতিটিই দুধ দিচ্ছে। প্রতিটি গাভী দুধ দেয় ৩৫-৪৫ লিটারের ওপরে। গাভীর দুধ দেওয়ার হার ২০ লিটারের নিচে নেমে এলে সেটি বাদ দেওয়া হয়। রয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসংবলিত মিলকিং পারলার। সেখানে ১২টি গরু থেকে একসঙ্গে দুধ সংগ্রহ করা যায়। দিনে গড়ে ১৫ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করছেন তারা। মিল্কভিটা, রস মিষ্টান্ন ভান্ডার, স্থানীয় ও ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ খামার থেকে দুধ সংগ্রহ করে।

খামারের আরেকটি শেডে রয়েছে বিশাল বিশাল ষাঁড়। এক কথায় বিফ ফ্যাটেনিং। এ শেডটিতে লালনপালন করা হয় মাংস উপযোগী গরু। কথা হলো খামার ব্যবস্থাপক আসিফ মৃধার সঙ্গে। তিনি জানালেন, গরুর মাংসের আন্তর্জাতিক বাজার ধরার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

গত ১০ বছর ধরেই কৃষির এ ধরনের বিবর্তন সম্পর্কে আপনাদের আভাস দিয়ে আসছি। বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তার কাছে সমকালীন, আধুনিক ও স্মার্ট বাণিজ্যের জায়গাটি দখল করছে কৃষি। আমাদের কৃষি আজ সত্যিকারের বাণিজ্য ও বিনিয়োগমুখী। এটি এখন আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্য চিন্তার আলোকে গড়ে তোলার দিন এসেছে। ঠিক এ উপলব্ধি থেকেই অ্যাবা গ্রুপের মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠান কৃষিতে ঝুঁকেছে। এটি যথেষ্টই আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন খাতের জন্য এটি যেমন অনেকটা বিস্ময়ের, তেমন সম্ভাবনার। আমরা যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলছি, তখন যে কোনো উৎপাদন খাতেই সাফল্যের সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সংযোগটা অনেক বেশি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সাফল্যের এক নজির স্থাপন করেছে নতুন এই কৃষি শিল্প উদ্যোগ। আমি বিশ্বাস করি, সময়ের চাহিদা বিবেচনা করে কৃষিতে এমন বিশ্বমানের উদ্যোগগুলো যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে কৃষির যেমন উৎকর্ষ হবে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও সূচনা ঘটবে নতুন যুগের।

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

[email protected]


আপনার মন্তব্য