শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৩

আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার প্রয়োজনীয়তা

মুফতি আমজাদ হোসাইন হেলালী

আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার প্রয়োজনীয়তা

কোনো মুসলমানের সন্তান যখনই বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন তার ওপর শরিয়তের সব বিধিবিধান মেনে চলা জরুরি হয়ে পড়ে। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তিকেই নাফরমান ও পাপী বলা হয়, যে বালেগ হওয়ার পরও শরিয়তের বিধিবিধান মেনে চলে না কিংবা কাজকর্মে হালাল-হারাম বেঁচে চলে না। এ গুনাহ মূলত দুই প্রকার- ১. প্রকাশ্য গুনাহ ২. অপ্রকাশ্য গুনাহ। আর এ উভয় প্রকার গুনাহকে বর্জন করে এক আল্লাহর ভয়কে দিলে স্থান দিয়ে জীবন পরিচালনার নামকেই সংক্ষেপে তাকওয়া বলা হয়। রব্বুল আলামিন আল কোরআনে তাকওয়া অর্জনের প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন বারংবার। ইরশাদ করছেন, ‘এই কোরআন মুত্তাকি তথা তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য হেদায়াতস্বরূপ।’ আর প্রকৃত মুত্তাকি তারাই হতে পারে যাদের আছে ইসলাহে নফস বা আত্মশুদ্ধি। কারণ যার অন্তরে ইসলাহ বা আত্মশুদ্ধি আছে তার জন্য গুনাহমুক্ত জীবন ধারণ করা খুবই সহজ হয়ে যায়। ইসলাহ বা আত্মশুদ্ধি ছাড়া কখনোই গুনাহ বর্জন করা সম্ভব নয়। পরকালে নাজাত ও সফলতা পেতে হলে আত্মশুদ্ধি কিংবা ইসলাহ অতীব জরুরি। আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল কোরআনে আত্মশুদ্ধি অর্জনকারীর সফলতার নিশ্চয়তা ও তা পরিত্যাগকারীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারে ১১ বার কসম করেছেন সূরা শামসে। এরপর তিনি ইরশাদ করেন, ‘যে পরিশুদ্ধতা অর্জন করেছে, সে-ই সফলকাম হয়েছে, আর যে পরিশুদ্ধতা অর্জন করেনি, বরং গুনাহে নিমজ্জিত রয়েছে, সে ব্যর্থ হয়েছে।’ প্রিয় পাঠক! মানুষের আত্মা যখন তাকে পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনের দিকে আহ্বান করে তখন এ আত্মাই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়। কেননা এ অপরিশুদ্ধ, পাপাচারী, ব্যাধিগ্রস্ত অন্তর মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এজন্য রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় আল্লাহর কাছে অন্তরের খারাপি থেকে অধিক পরিমাণে মুক্তি চাইতেন এই বলে, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার অন্তরকে আত্মরক্ষার ক্ষমতা দাও এবং তাকে পরিশুদ্ধ কর। তুমিই অন্তরের সর্বোত্তম পরিশোধনকারী এবং তুমিই তার অভিভাবক ও প্রতিপালক।’ মুসলিম, মিশকাত। সব মুসলমানকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে যে, আত্মশুদ্ধি অর্জন জান্নাতলাভের অনেক বড় উপায়। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় করে এবং নিজের অন্তরকে কুপ্রবৃত্তি থেকে দূরে রাখে, জান্নাতই হবে তার জন্য চূড়ান্ত আবাসস্থল।’ সূরা আন নাজিয়াত, আয়াত ৪০। প্রিয় পাঠক! আত্মা হলো মানুষের ইমানের প্রধান সংরক্ষণস্থল। আর একজন মুমিনের কাছে ইমানই হলো অনেক বড় দামি ও মূল্যবান সম্পদ। যদি ইমান না থাকে তাহলে মানুষের সমগ্র জীবনটাই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তাই এ সম্পদকে সুরক্ষা ও ঠিক রাখার জন্য অন্তরজগতের পরিশুদ্ধি নিশ্চিত করতে হয়। সমগ্র মুসলিম জাতির আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত থাকতে হবে অটল অবিচল। তাই কোনো ধরনের অকল্যাণকর বা খারাপ উপাদান যেন মুসলিম জাতির অন্তরকে বক্র করে না ফেলে বা সংকীর্ণতায় নিক্ষেপ না করে সেজন্য তাকে সদাসতর্ক থাকতে হয়। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জানতে চাওয়া হয় কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বললেন, ‘ওই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে সত্যবাদী ও পরিচ্ছন্ন অন্তরের অধিকারী, যা পাপাচার, অবিচার, প্রতারণা ও হিংসা থেকে মুক্ত।’ ইবনে মাজাহ। ভালো-মন্দ যা কিছু হয় সবকিছু এক আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, এর ওপর সন্তুষ্ট ও আস্থাবান আত্মা মানুষের জন্য দুনিয়াবি জীবনে প্রশান্তি অর্জন ও জটিলতা-মুক্তির কারণ এবং পরকালীন জীবনে গনিমতস্বরূপ। প্রিয় পাঠক! আরও দেখুন, মানুষ সবসময় সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও পূর্ণতার আশাবাদী। আর এ সফলতা ও পূর্ণতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন আত্মশুদ্ধির। মানুষ নিজের শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য যেভাবে নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ করে ও যাবতীয় অনিষ্ট থেকে তাকে রক্ষার জন্য সর্বক্ষণ দেখাশোনা ও পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকে; এই দেখাশোনা ও পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনে দেশ-বিদেশ পর্যন্ত ভ্রমণ করে; ঠিক তেমনিভাবে অন্তরকে পবিত্র রাখার জন্য নিয়মিত খাদ্য প্রদান ও পরিচর্যা অতীব প্রয়োজন। ইমান ও নেক আমল হলো অন্তরের সেই খাদ্য। শরীর যেমন খাদ্য পেয়ে শক্তি অর্জন করে তেমন অন্তরও নেক আমলের মাধ্যমে শক্তি অর্জন করে। মুসলিম মনীষী ও ওলামায়ে কিরামরা বিবেকশক্তিকে অন্তরাত্মার পরিশুদ্ধিতে নিয়োজিত করে, নেক আমলের মাধ্যমে তার প্রবৃদ্ধি সাধন করে এবং অন্যায়-অকল্যাণের বিরুদ্ধে অন্তরকে বিজয়ী করে। আর যে ব্যক্তি বিবেকশক্তির প্রতি অবিচার করে এবং তাকে দুর্বল করে ফেলে সে ব্যক্তি ব্যর্থ ও হতভাগা হয়ে যায়। রব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদের সব মুসলিম ভাই-বোনদের সঠিকভাবে আত্মার পরিশুদ্ধি সাধন করে প্রকৃত ইমানদার হিসেবে কবুল করেন।

হলেখক : খতিব ও ইসলামবিষয়ক টিভি উপস্থাপক।


আপনার মন্তব্য