শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ মার্চ, ২০২০ ২২:৫৫

পাকা পেঁপের সাদা বিচি

আফরোজা পারভীন

পাকা পেঁপের সাদা বিচি

অনেক দিন ধরে বাংলাদেশ প্রতিদিনে লেখা ছাপা হচ্ছে না। কিছুটা হতাশ আমি। দেশের শীর্ষস্থানীয় লেখকরা বাংলাদেশ প্রতিদিনে লেখেন। তারা সবাই ভালো লেখক। সেখানে আমার স্থান পাওয়া দুরূহ। মাঝেমধ্যে পেলে তাই অবাক লাগে! শুক্রবার পূর্বাচলে গিয়েছিলাম আমার এক বন্ধুর জমি দেখতে। বন্ধু পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হলেও এ দেশের রাজনীতিবিশারদ। শেখ কামালের বন্ধু ছিলেন। ৩২ নম্বরে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। রাজনীতির খুঁটিনাটি বলতে পারেন নিখুঁতভাবে। মাঝেমধ্যেই তার সাহায্য নিই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প হয় দেশের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে। বলা বাহুল্য, দুজনই হতাশ। বন্ধু বারবার বলছিলেন, সাড়ে ৮টায় আমার বাসায় গাড়ি আসবে। আমি যেন মোটেও দেরি না করি। দেরি করলে অসুবিধা হবে। ওর তাড়ায় যে কাপড় পরে ঘুমিয়েছিলাম সেটা পরেই গাড়িতে উঠলাম। মিরপুর ডিওএইচএসে পৌঁছে শুনি তিনি গেছেন বাজারে। বুঝুন অবস্থা। অবশ্য অল্পক্ষণেই ফিরলেন। বললেন, ওপরে যেতে হবে, ভাবি রেডি হননি। ওপরে গিয়ে বুঝলাম ব্যাপারটা তা নয়। ভাবি আসলে যাবেনই না। উদ্দেশ্য আমাকে নাশতা করানো। আগে বললেই হতো। বন্ধুর অত্যন্ত সাজানো বাসার বহু মূল্যবান ঝাড়বাতিগুলো মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে চমৎকার চালের আটার রুটি ডিম আর মিষ্টি খেলাম। মিষ্টিগুলো দারুণ ছিল। আসার সময় মুড়ি চা খেয়ে এসেছি। বেশি খেতে পারলাম না বলে রাগ হলো বন্ধুর ওপর। ভাবি বললেন, মিষ্টিগুলো তার বেয়াই এনেছেন। বন্ধুর মেয়ের সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে। জামাই আমেরিকায় সেটেল্ড। অথচ আমরা দুজনই বলতাম, ছেলেমেয়ে বিদেশে পড়তে যাবে, কিন্তু স্থায়ী করব না। আমার ছেলে আমেরিকায় পড়াশোনা করে দেশে ফিরে এসেছে। মেয়ে পড়তে যাচ্ছে। ফেরার জন্য জোর করব না এটা নিশ্চিত। পূর্বাচল পৌঁছে রাস্তার পাশে টাটকা সবজি দেখে গাড়ি থামিয়ে বাজার করতে নামলেন বন্ধু। লাউ কিনলেন। জানতে চাইলেন, লাউ নেব কিনা। আমি সাফ জানিয়ে দিলাম, যা কিনবে সবই যেন ডবল কেন। তাই-ই হলো তবে হাঁসের ডিম ছাড়া। ওটাতে বন্ধু আমাকে ঠকাল। ঠকিয়েছে বেশ করেছে, হাঁসের ডিম খাওয়া হয় না। বাসায় এসে দেখলাম সঙ্গে এসেছে দুটো তরুণ লাউ। আহা! কি শান্ত সবুজ তার রং! কি সতেজ! টমেটো, করোলা, শিম, কাঁচা মরিচ, পাকা কলা, পেঁপে। পেঁপে দেখে মন ভালো হয়ে গেল। কিডনির রোগী আমি। ফল খেতে পারি না বললেই চলে। যে দু-একটা খেতে পারি তার একটা পাকা পেঁপে, তাও অল্প। পেঁপের মসৃণ শরীর আর ঝকঝকে হলুদ রং দেখে বুঝলাম, একদম গাছপাকা। তর সইছিল না। ছুরি এনে এক ফাঁলি কাটলাম। কেটেই হাঁ আমি। পাকা পেঁপের বিচিগুলো ফকফকে সাদা। জীবনে পাকা পেঁপের এমন সাদা বিচি দেখিনি। কুচকুচে কালো বিচি দেখেই অভ্যস্ত। কোথায় মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম কালো বিচির কয়েকটা টবে ছড়াব। যদিও জানি লাভ নেই। রোদ ছাড়া গাছ হয় না। যা বোঝার বুঝলাম। হায়রে গাঁওগেরাম! তার পরও এক টুকরো মুখে দিলাম। বিস্বাদ। ভিতর আর বাইরের অমিলই এখন স্বাভাবিক। প্রতিদিনই তার প্রমাণ পাই। দিন কয়েক আগে একজন নামজাদা নেতার বাড়িতে গিয়েছিলাম একটা বই লেখার প্রয়োজনে সাক্ষাৎকার নিতে। তিনি অনেকবার মন্ত্রী ছিলেন। কেন যেতে চাই জানিয়ে অনেক কষ্টে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলাম। উবার ভাড়া করে ছুটতে ছুটতে গিয়েছিলাম বটে কিন্তু তিনি সাক্ষাৎকার দেননি। বলেছিলেন, ‘আর একদিন আসুন। সকাল থেকে ভাষণ দিতে দিতে ক্লান্ত আমি।’ বলতে পারতাম, তাহলে সময় দিলেন কেন? পারিনি, ভয় আছে। বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করে বলেছিলাম, দিলে ভালো হয়। আরেকদিন আসা আমার জন্য কষ্ট। তিনি বিরক্তির সঙ্গে আমার হোয়াটসঅ্যাপে একটা লেখা পাঠিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ওটা থেকে বানিয়ে নিন। আমি তাকে বলতে পারিনি, এই লেখা নেওয়ার জন্য আমি এত দূর আসব কেন, এ তো নেটেই পাওয়া যায়! লেখা আর সাক্ষাৎকার কি এক! ছবি তুলতে বললে উনি তড়াং করে ছুট লাগিয়েছিলেন। ছুটছিলেন আর বলছিলেন, ‘ছবি তুলব না, তুলব না। আপনি শিক্ষিত মানুষ, বোঝেনই তো।’ উনি কী বোঝার কথা বলছেন সত্যিই তখন বুঝিনি। পরে বুঝেছিলাম, পাপিয়া কেস। পাপিয়ার সঙ্গে ওনার অনেক ছবি দেখেছিলাম পরদিন। তা পাপিয়ার সঙ্গে উনি যদি ছবি তুলতে পারেন আমার সঙ্গে তুলতে অসুবিধা কী? আমি তো পাপিয়া না? পাপিয়ার ধারেকাছেও না। নিরেট ভদ্রমানুষ, নিজেই বলছি। আব্বা বলেছিলেন, যাদের বড় জানো তাদের কাছে যেও না। কথাটা যে কত মূল্যবান সেদিন বুঝেছিলাম। এই নেতা আমার কাছে ছিলেন হিমালয়সদৃশ। হিমালয় থেকে সেদিন তাকে নোংরা খাদে ছুড়ে ফেলেছিলাম আমি। পাপিয়া কেসে যাদের নাম এসেছে তাদের দু-একজন আমার চেনা। একজনের দ্বারা সরাসরি ভিকটিম হয়েছি। তিনি একটা বড় দফতরে জাঁকিয়ে ছিলেন দীর্ঘদিন। আমি পলিটিক্যাল পরিবারের মেয়ে, আব্বা ভাষাসৈনিক, তেভাগার আইন পরামর্শক, নড়াইল মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত শহীদের বোন, লেখালেখি করি এসব কারণে ইনসিকিউরিটিতে ভুগে আমাকে ওই দফতর থেকে কৌশলে বিতাড়িত করেছিলেন ওই ব্যক্তি। ওনার ওপরে যারা ছিলেন তারা আমাকে পছন্দ করলেও ওই ক্ষমতাধর ব্যক্তির ভয়ে কিছু বলেননি। দুই দিনের মধ্যে আমার কাছ থেকে গাড়ি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আমার ছেলে তখন ছিনতাইকারীর হাতে পড়ে প্রথম রোজগারের ২ লাখ টাকা খুইয়েছিল। ছিনতাইকারীকে বাধা দিতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে হাত ভেঙে হাসপাতালে ছিল। ওই মহারথী সবই জানতেন। বড় কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। আজও কষ্টটা বুকে বাজে। পাপিয়াকান্ডে তার নাম আসায় এক বন্ধু বললেন, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। আসলে কি নড়ে? নড়তে চায় কিন্তু নড়তে দেওয়া হয় না। এখন ধর্মের চেয়ে বুঝি ক্ষমতা শক্তিশালী। তাই দুই দন যেতে না যেতে নামগুলো চাপা পড়ে গেল। এমন খবরও শুনছি ওনারা নাকি ধোয়া তুলসীপাতা। যে লোকের কথা বললাম, উনি প্রেম করে বিয়ে করেছেন। বউটার বয়স কম, খুব সুন্দরী, স্বামীকে খুব বিশ্বাস করেন। একজন বলছিলেন, অমন মোটা মোটা হাতির মতো লোকগুলো কচি কচি মেয়েগুলোকে ভোগ করে। আহা! তা এই আহা-উহু করে লাভ কী? এরা প্রিভিলেজড গ্রুপ। বঙ্গবন্ধু সারাটা জীবন প্রিভিলেজড গ্রুপের বিপক্ষে কথা বলেছেন। এখন প্রিভিলেজডরা ফল-গোটা-আঁটি-ছাল সব খাচ্ছেন। আর আমরা এতটাই হতভাগ্য যে, সব সয়ে যাচ্ছি, সইতে বাধ্য হচ্ছি ভয়ে। এই যে লিখছি, এ লেখা নিয়ে আপনজনরা ভয়ে কাঁপে। বলে, লিখিস না, লিখিস না বিপদে পড়বি। কেন? ওরা রাখলে আমরা থাকব, ওরা বিদায় করে দিলে চলে যেতে হবে কেন? ওদের ভয়ে কাঁপতে হবে কেন? আমার ভাই এ দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে রক্ত দিয়েছে বলে? অপরাধ করে ফেলেছে রক্ত দিয়ে?

পাপিয়াদের বানায় কে? পালে কে, পোষে কে? জানি না বললে তো হয় না। এত বড় ঘটনা জানি না এ কথা বললে কি পাগলেও বিশ্বাস করবে! নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার সময় বেশ লাগে। রাজনীতির ব্যাকগ্রাউন্ড নেই এমন মানুষকে পদ-পদবি কীসের জোরে দেওয়া হয় তা প্রতিবন্ধীও বোঝে। এরা যখন বক্তৃতা দেয় কথার তুবড়ি ছোটায়। বড় বড় নীতি আর আদর্শের কথা বলে। আমরা তন্ময় হয়ে শুনি। ভাবি, আহা কি আদর্শবান! কত্তো খাঁটি মানুষ! কিন্তু আসলে আমার বন্ধুর দেওয়া ওই পাকা পেঁপের মতো। ভিতরে কাঁচা বিচি। যে কৃষক বা ছোট দোকানি এটা করেছে তাকে দোষ দিই না। সে গরিব মানুষ। বড়দের কাছ থেকে ঠকে ঠকে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে ঠকাতে শিখেছে। বড়দের ঠকানোর সাধ্যি ওর নেই।  লোকে বলে, তুই আদার ব্যাপারী জাহাজের খবরে দরকার কী? দরকার কিন্তু আছে। জাহাজের মালিকও কিন্তু আদা খায়। আর ওই আদা চাষ করে কৃষক, বিপণন করে ব্যাপারী। তাই খোঁজ কিন্তু পড়ে। ওই প্রান্তিক মানুষ ছাড়া আদা হয় না, আর আদা না হলে বইবার জন্য জাহাজের দরকার হয় না। সবকিছুর মূলে আছে ওই কৃষক। বঙ্গন্ধুর ভাষায়, আমার দুখী মানুষ। কিন্তু দুখী মানুষ বড় অসহায় আজ। অসংখ্য ভুয়া আদর্শধারী ধনীকুলকে ঠেকানোর কোনো পথ নেই। নেই বলে সামনে গভীর খাদ ছাড়া কিছু চোখে পড়ে না দুখী মানুষের।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক।


আপনার মন্তব্য