শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ মার্চ, ২০২০ ২৩:১৬

বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে সুখী?

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে সুখী?

বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে সুখী! এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন আমাকে কঠিন ভাষায় গালমন্দ দিতে পারে; গণসমাবেশে হলে নির্ঘাৎ আমার ওপর জুতা, স্যান্ডেল ছুড়ে মারা হতে পারে। লোকজন আগ্রাসী হলে জুটে যেতে পারে ভালো রকমের উত্তমমধ্যমও। সবাই বলবে, সারা বাংলাদেশ যখন করোনা আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে, তখন এই পাগল বলছে, ‘বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে সুখী!’ কিন্তু কথাটি আমার নয়। এটি জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন সমাধানের নেটওয়ার্ক বা ইউএন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন)-এর একটি প্রতিবেদন, যা ২০ মার্চ শুক্রবার প্রকাশ করা হয়েছে। এসডিএসএন যে ‘বৈশি^ক হ্যাপিনেস ইনডেক্স’ তৈরি করেছে, তাতে ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৭তম। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৫তম। ১৮ স্তর উন্নতি হওয়ায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে সুখী। আন্তর্জাতিক একটি সূচকে বাংলাদেশের ১৮ ধাপ উন্নতি হয়েছে এবং সে সূচক বলছে, বাংলাদেশের মানুষ এখন আগের চেয়ে সুখ ও স্বচ্ছন্দের মধ্যে আছে। ওই সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও শ্রীলঙ্কারও ওপরে। এমন আনন্দময় ও উদ্দীপক একটি সংবাদে তো সবার উৎফুল্ল, উচ্ছ্বসিত ও উদ্বেলিত হওয়ার কথা। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে কভিড-১৯-এর আবির্ভাব ও নভেল করোনাভাইরাসের চকিত ও সাঁড়াশি আক্রমণে দেশের পর দেশ বিপর্যস্ত হওয়ায় এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতিও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করায় আপাতত আমরা উৎফুল্ল হতে পারছি না বা উৎফুল্ল হলেও সেটিকে অগ্ন্যুৎপাতের লাভার মতো জোর করে চেপে রাখতে হচ্ছে।

এখন মূল প্রশ্নটি হলো- ‘সুখে’র সংজ্ঞা কী? একটি মানুষ কখন সুখী, কীসে সুখী, কতটা সুখী? ব্যক্তি সুখ, পারিবারিক সুখ, সামষ্টিক সুখ মাপার কি কোনো পদ্ধতি আছে? যে মেথডোলজি প্রয়োগ করে জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন সমাধানের নেটওয়ার্ক এ গবেষণাটি করেছে, তাতে কি নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্র এবং সেই রাষ্ট্রের অধিবাসীদের সামষ্টিক সুখ নির্ণয় করা যায়? এ কথা তো অস্বীকার করা যাবে না যে, সুখ একটি আপেক্ষিক বিষয়। এটি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, পরিবার থেকে পরিবার, রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে ভিন্ন। সৎ ও নিষ্ঠাবান একজন ব্যক্তি মাথা গোঁজার মোটামুটি ধরনের একটি ঠাঁই পেলে, তিন বেলা ভালো-মন্দ খেতে পারলে, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও বাবা-মাকে নিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক একটি জীবন যাপন করতে পারলেই সুখী। আবার কোনো ব্যক্তি হাজার হাজার টাকা লুট করে, কানাডা ও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড ও থার্ড হোম বানিয়ে, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের রাজার হালে রেখে সুখী নাও হতে পারে।

যে লোকটি কুঁড়েঘরে থাকে, তিন বেলা ডাল-ভাত খায়, সাধারণ পোশাক পরে, অসুস্থ হলে কবিরাজ বা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে যায়, সেও সুখী হতে পারে। আবার প্রবল পরাক্রমশালী কোনো মন্ত্রী; যার প্রাসাদোপম বাড়ি আছে, পাজেরো, লেক্সাস, বিএমডব্লিউসহ তিন মডেলের তিনটি অত্যাধুনিক গাড়ি আছে; যে পরিবার ও পারিষদ নিয়ে প্রায়ই ইউরোপ-আমেরিক ঘুরতে পারে, সেও সুখী নাও হতে পারে। হয়তো তার প্রতি রাতেই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে হয়, অথবা দেশে-বিদেশে থাকা সম্পত্তির নিরাপত্তার কথা ভেবে সব সময়ই হাইপার টেনশনে থাকে, অথবা প্রতিবন্ধী সন্তান বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে অকালে মৃত্যুমুখে পতিত কিশোর ছেলে বা মেয়েটির কথা মনে পড়লে, সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলে থাকার জন্য তাকে প্রচুর অ্যালকোহল পান করতে হয়।

আবার এমনও হতে পারে যে, ধনাঢ্য (অথবা মধ্যবিত্ত) কোনো ব্যক্তি তার পেশাগত কর্মকান্ড, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-পরিজন নিয়ে বছরের পর বছর সুখে-শান্তিতে আছে। আবার এও আমরা হামেশাই দেখতে পাই যে, দরিদ্র, প্রান্তিক বা দলিত জনগোষ্ঠীর কেউ বা অনেকেই দারিদ্র্য, বৈষম্য, আর্থিক অসচ্ছলতা, অশিক্ষা ইত্যাদি কারণে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এসব কারণে সে এবং তাদের জীবন হতে পারে চরম অসুখী। বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী লেখক কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘দারিদ্র্য’ কবিতা শুরু করেছেন দারিদ্র্যের বন্দনা দিয়ে। কবি নজরুল লিখেছেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে ক’রেছ মহান।/তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান/কণ্টক-মুকুট শোভা।-দিয়াছ, তাপস, ...’

দারিদ্র্যের বন্দনা দিয়ে কবিতা শুরু করা সত্ত্বেও সপ্তম পঙ্ক্তিতে এসে কবি দারিদ্র্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলছেন, ‘দুঃসহ দাহনে তব হে দর্পী তাপস,/অম্লান স্বর্গেরে মোর করিলে বিরস,/অকালে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ!’ দারিদ্র্য, বৈষম্য, বঞ্চনা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সামষ্টিক ‘রূপ রস প্রাণ’ শুকিয়ে ফেলতে পারে। আবার একই দারিদ্র্য কাউকে মহান করতে পারে এবং দান করতে পারে ‘খ্রিস্টের সম্মান’ও।

সুখের উপলব্ধি, ব্যাপ্তি ও মাত্রা ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। অঢেল সম্পদ, নাগরিকদের শিক্ষা-চিকিৎসা-যোগাযোগ ও সামাজিক নিরাপত্তার সুব্যবস্থা থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ‘সিস্টেমেটিক ডিসক্রিমিনেশন’ আছে; আছে করপোরেট লুটপাট, শোষণ, বর্ণবাদ, হেট ক্রাইম, সিরিয়াল কিলিং ও নানা ধরনের সহিংসতা। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ কালো মানুষ ও প্রবাসী শিকার হচ্ছে বৈষম্য, বঞ্চনা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের। তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপারে এগুলোই হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রধান বাধা।

তবে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হলেই খারাপ; বুর্জোয়া, মুনাফালোভী ও শোষকরা সেখানে থাকায় তাদের কোনো সুখ-শান্তি নেই, এ ধরনের অতি-সাধারণীকরণকৃত ধারণা বা কমিউনিস্ট প্রোগান্ডারও কোনো ভিত্তি নেই। কেননা, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের দেশের অভ্যন্তরে যে আইনের শাসনভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, সেটি প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয়। আবার করপোরেট লুটপাট, শোষণ ও বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা যেমন বেকার ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা, শ্রমিকদের পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেয়েও ভালো; যদিও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিকদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়গুলো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকেই নিয়েছে। ফলে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোয় পাওয়া যাবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ যারা মানসম্পন্ন শিক্ষা-চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সুখে-শান্তিতে আছেন।

১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর মতো তাদের অঢেল সম্পদ, চাকচিক্য, শান-শওকত না থাকলেও সেখানে কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষসহ সবার অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছিল। সেখানে অপরাধ ও বৈষম্য হ্রাস পাচ্ছিল, পতিতাবৃত্তি নির্মূল হতে বসেছিল। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মূল্যবোধের জাগরণ হয়েছিল, সেটি দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘রাশিয়ার চিঠি’তে বলেছিলেন, রাশিয়াতে না এলে তার এ জীবনের তীর্থযাত্রা হতো না।

সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ যে সুখে-শান্তিতে ছিল, তার প্রামাণিক সাক্ষ্য আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে অনেক মনীষীর লেখায় পাই। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যেই একদলীয় দুঃশাসনের ফলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জনগণ পড়ে গেল এক দুঃসহ অবস্থার মধ্যে। পার্টি ব্যুরোক্রেসির দৌরাত্ম্য, নেতানেত্রীদের পাহাড়সম দুর্নীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দুষ্প্রাপ্যতা, একদলীয় দুঃশাসন, প্রত্যেক নাগরিকের ওপর পুলিশি নজরদারিসহ নানা কারণে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের বৈশ্বিক নেতা সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯০ সালে হুড়মুড় করে ভেঙেই পড়ল। তছনছ হয়ে গেল পূর্ব ইউরোপসহ সমাজতান্ত্রিক বিশে^র অনেক রাষ্ট্র।

ফলে এ কথা বলা যেতে পারে যে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোয় যেমন সুখী ও অসুখী মানুষ আছে, তেমনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতেও আছে সুখী ও অসুখী হওয়ার নানা উপাদান, প্রসঙ্গ ও প্রকরণ। তবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রাষ্ট্রগুলো উদার পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উপাদানের সমন্বয়ে ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেসি’র যে মডেলটি তৈরি করেছে, সেটি ভালোই কাজ করছে। শুধু ‘হ্যাপিনেস ইনডেক্স’ই নয়, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সূচকগুলোতেও এ রাষ্ট্রগুলোকেই তালিকার শীর্ষে দেখা যায়। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন সমাধানের নেটওয়ার্ক সারা বিশ্বের সুখী দেশের যে তালিকা করেছে, সে তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ফিনল্যান্ড। এরপরে ক্রমানুসারে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও লুক্সেমবার্গ। অর্থাৎ তালিকার প্রথম দশের মধ্যে ছয়টিই হচ্ছে নর্ডিক রাষ্ট্রসমূহ, যে দেশগুলো ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেসি’ চর্চার মধ্য দিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা-চিকিৎসা ও অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সব মানুষের সামষ্টিক সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন সমাধানের নেটওয়ার্ক মাথাপিছু আয়, সামাজিক সহযোগিতা, গড় আয়, সামাজিক স্বাধীনতা, উদারতা এবং সমাজে দুর্নীতির হার কত কম তার ভিত্তিতে প্রতি বছর এ তালিকা প্রস্তুত করে। যদিও ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রভেদে সুখের তারতম্য ঘটতে পারে; তথাপি যে মানদ-গুলোর ওপর ভিত্তি করে এসডিএসএন সুখী রাষ্ট্রসমূহের তালিকা প্রস্তুত করেছে, তার ভিতরে সারবত্তা আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হচ্ছে- দুই বেলা দুই মুঠো খেতে পেলে, পরিধেয় বস্ত্র থাকলে এবং মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই পেলে হয়তো বা কেউ কেউ ভালো থাকলেও থাকতে পারে; কিন্তু সুখী, শান্তিপূর্ণ ও অর্থপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য অধিকাংশ মানুষেরই প্রয়োজন অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও বিচারিক সেবা; প্রয়োজন সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার।

                লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।


আপনার মন্তব্য