শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ মে, ২০২০ ২৩:২০

রবীন্দ্রনাথের দুই আধ্যাত্মিক গুরু

সুমন পালিত

রবীন্দ্রনাথের দুই আধ্যাত্মিক গুরু

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে বড় পরিচয় বাংলা ভাষার সর্বকালের সেরা কবি। বিশ্বের অন্যতম সেরা কবি হিসেবেও নন্দিত তিনি। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ বাঙালির অহংকারের অংশ। ১৯১৩ সালে তিনি তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পান। এশিয়ায় তিনিই প্রথম নোবেল বিজয়ী। রবীন্দ্রনাথের নোবেল বিজয় বাংলা ভাষার মর্যাদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

কলকাতার জোড়াসাঁকোর সুবিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের জন্ম। সে সময়কার ব্রিটিশ-ভারতের অন্যতম শীর্ষ অভিজাত পরিবার ছিল ঠাকুর পরিবার। এ পরিবারের শিকড় ছিল বাংলাদেশে। রবিঠাকুরের পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল খুলনার রূপসার পিঠাভোগ গ্রামে। সেখানে কুশারী ছিল তাদের বংশীয় পদবি। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষরা গোঁড়া ব্রাহ্মণদের বৈরী আচরণের শিকার হয়ে পিঠাভোগ গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। স্থানীয়ভাবে তারা পরিচিত ছিল পিরালি ব্রাহ্মণ হিসেবে। বাগেরহাটের সুবিখ্যাত পীর খানজাহান আলীর ভক্ত ছিল পিরালিরা। অভিজাত মুসলমানদের মতো পোশাকও পরত তারা। পিঠাভোগ গ্রামের কুশারী পরিবার কলকাতায় গিয়ে জোড়াসাঁকোয় আস্তানা গাড়ে। ওই এলাকার জেলেরা তাদের শ্রদ্ধাভরে ডাকত ঠাকুর বলে। সেই সুবাদে কুশারীরা হয়ে যায় ঠাকুর পদবিধারী।

কলকাতায় ঠাকুররা ব্যবসার সূত্রে আবির্ভূত হয় ধনী পরিবার হিসেবে। পরে তারা জমিদারির সঙ্গে যুক্ত হয়। দুই বাংলার বড় জমিদারদের অন্যতম ছিল ঠাকুর পরিবার। বাংলাদেশের শিলাইদহ, পতিসর, শাজহাদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের জমিদারি ছিল। রবীন্দ্রনাথ পরিবারের হয়ে জমিদারি দেখাশোনার সুবাদে জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন বাংলাদেশে। সুযোগ পেলেই বজরায় চড়ে পদ্মায় যেতেন নৌভ্রমণে। বাংলাদেশের প্রকৃতি কবিগুরুর হৃদয়কে নিয়ে যেত কাব্যলোকের গহিনে। রবীন্দ্র পরিবারে আধ্যাত্মিকতার চর্চা ছিল বহু যুগ ধরে। খ্যাতনামা পীর বাগেরহাটের হজরত খানজাহান আলী (রহ)-এর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার কারণে কুশারীরা পিরালি হিসেবে পরিচিত ছিল। গোঁড়া ব্রাহ্মণদের বিরূপ মনোভাবের কারণে জন্মভূমি ছেড়ে কলকাতায় ঠাঁই নিতে বাধ্য হওয়ায় ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রকারান্তরে ঠাকুর পরিবার বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। বেদভিত্তিক একেশ্বরবাদী ধর্মমত ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের গানে ঈশ্বরপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতার প্রভাব লক্ষ্য করার মতো। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশে জমিদারি পরিচালনার সময় রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়ার মরমি সাধক লালন সাঁইয়ের আধ্যাত্মিক দর্শনে বিপুলভাবে প্রভাবিত হন। বলা যায়, যুবক বয়সেই তিনি লালন সাঁইয়ে বিমুগ্ধ হয়ে পড়েন। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির ছয় বছর পর ১৯১৯ সালে সিলেট সফরকালে কবিগুরু আরেক মরমি সাধক কবি হাসন রাজা সম্পর্কে অভিহিত হন। লালন সাঁইয়ের মতো হাসন রাজাও বাংলা বাউল সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য নাম। লালন সাঁইকে বলা হয় এ ধারার সর্বস্বীকৃত গুরু। হাসন রাজার অবস্থান লালন সাঁইয়ের পরই। এ দুই মরমি সাধককে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক গুরু বলেও ভাবা হয়।

বাউল সাহিত্যের এ দুই মরমি সাধক কবি ছিলেন বাংলা ভাষার সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক। জীবদ্দশায় লালন সাঁই ও হাসন রাজার মধ্যে কখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগ ঘটেছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে নোবেলজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁদের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ যোগাযোগের বিষয়টি সুস্পষ্ট। লালন সাঁই ও হাসন রাজা দুজনই ছিলেন বয়সে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড়। জমিদারি দেখাশোনার সুবাদে কবিগুরু মাঝেমধ্যে শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে অবস্থান করতেন। রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি থেকে ছয় মাইল দূরে ছেঁউড়িয়ায় ছিল লালন সাঁইর আখড়া। লালন সাঁইর আধ্যাত্মিক দর্শন রবীন্দ্রনাথের মননজগৎকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তিনি বাউলদের এই সর্বজনমান্য গুরুর ২৯৮টি গান সংগ্রহ করে তার মধ্যে ২০টি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। ১৩-১৪ সনে প্রবাসীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসে লালন সাঁইয়ের গান ব্যবহার করা হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের পৃষ্ঠপোষকতায় লালন সাঁই সুধীসমাজের হৃদয়রাজ্যে ঠাঁই পান। বলা হয় রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিতেও রয়েছে লালন সাঁইর পরোক্ষ প্রভাব। কবিগুরুর আধ্যাত্মিক মানস গঠনে লালন সাঁইর প্রভাবও অনস্বীকার্য। লালনের প্রভাবে একেশ্বরবাদী রবীন্দ্রনাথ মানবধর্মকে নিজের ধর্ম বলে মনে করতেন।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মরমি কবি লালন সাঁইর দেখা হয়েছিল কিনা তা রহস্যাবৃত। কবিগুরুর নিজের লেখায় তা স্পষ্ট করা হয়নি। তাঁর জীবনীকারদের লেখায়ও বিষয়টি স্পষ্ট নয়। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিঃসন্দেহে মনমানসিকতায় উদার। তার পরও তাঁর সীমাবদ্ধতা ছিল তিনি ছিলেন জমিদার। লালন সাঁইকে তিনি নিমন্ত্রণ করে তাঁর কুঠিবাড়িতে আনার চেষ্টা করেছিলেন কিনা সে সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। গবেষকের একাংশ দুই গুরুর দেখা-সাক্ষাতের কথা বললেও অন্যাংশের বক্তব্য বিপরীত। তবে রবীন্দ্রসহোদর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাঁইজির সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি লালন সাঁইর একটি স্কেচও আঁকেন।

লালন সাঁইর জাতপাত নিয়ে রয়েছে তুমুল বিতর্ক। বলা হয়, হিন্দু পরিবারে তাঁর জন্ম। সাঁইজি সম্পর্কে ব্যাপকভাবে প্রচারিত- যৌবনকালে তিনি তীর্থ ভ্রমণে বের হলে পথিমধ্যে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন। তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে ছেড়ে চলে যান। এ কঠিন অবস্থায় সিরাজ সাঁই নামে এক বাউল সাধক তাঁকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রুষায় সুস্থ করে তোলেন। ওই মুসলিম ফকিরের কাছে তিনি থেকে যান এবং বাউলতত্ত্বে দীক্ষা নেন। পরে ছেঁউড়িয়ায় আখড়া তৈরি করেন লালন সাঁই। সেখানে থাকতেন স্ত্রী ও শিষ্যদের নিয়ে।

লালন সাঁইয়ের জাত বিচার সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বসন্তকুমার পাল, অন্নদাশঙ্কর রায়, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের অভিমত- তিনি ছিলেন হিন্দু পরিবারের সন্তান। এ তত্ত্বকে অস্বীকার না করেও কবি জসীমউদ্দীন, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন প্রমুখ বলেছেন, তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন। লালন সাঁই অবশ্য নিজেকে সব সময় জাতপাতের ঊর্ধ্বে রেখেছেন। সাঁইজির মৃত্যুর পর ১৮৯০ সালের ৩০ অক্টোবর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘হিতকরী’ পত্রিকার মন্তব্যটি খুবই প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। পত্রিকাটি লিখেছে- ‘লালন নিজে কোনো সাম্প্রদায়িক ধর্মাবলম্বী ছিলেন না; অথচ সব ধর্মের লোকেই তাঁহাকে আপন বলিয়া জানিত।’

॥ দুই॥

বাউল বা মরমি কাব্যসাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ হাসন রাজা (১৮৫৪-১৯২২) সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী। হাসন রাজার পূর্বপুরুষ ছিলেন অযোধ্যাবাসী ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পরে  ইসলাম গ্রহণ করে তাঁরা প্রথমে বাংলাদেশের যশোর ও পরে সুনামগঞ্জে আসেন এবং সেখানেই বসবাস করেন।

হাসন রাজার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। ১৫ বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে হাসন রাজার ওপর। যৌবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভোগবিলাসী, কিন্তু পরিণত বয়সে জীবনের সব সম্পত্তি বিলিবণ্টন করে দরবেশ-জীবন যাপন করেন।

১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন সিলেট সফর করেন তখন হাসন রাজা ছিলেন সংসারবিবাগী। পুরোপুরিভাবে আধ্যাত্মিক জগতের বাসিন্দা। ফলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তিনি হয়তো দেখা করারও আগ্রহ প্রকাশ করেননি।

রবীন্দ্রনাথ যখন সিলেট আসেন তার ১২ বছর আগে ১৯০৭ সালে হাসন রাজার গানের বই ‘হাসন উদাস’ বেরিয়েছিল। এর একটি কপি রবীন্দ্রনাথের হাতে আসে সিলেট সফরের সময়। এ সফরের ছয় বছর পর ১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন সমিতির সভাপতির অভিভাষণে কবিগুরু হাসন উদাসের একটি গান উদ্ধৃত করে বলেন, পূর্ববঙ্গের এক গ্রাম্য কবির গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পাই সেটি এই যে,

ব্যক্তিস্বরূপের সহিত সম্বন্ধসূত্রেই বিশ্ব সত্য। তিনি গাহিলেন-

‘মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন

শরীরে করিল পয়দা শক্ত আর নরম

আর পয়দা করিয়াছে ঠান্ডা আর গরম

নাকে পয়দা করিয়াছে খুসবয় বদবয়।’

এই সাধক কবি দেখিতেছেন যে, শাশ্বত পুরুষ তাঁহারই ভিতর হইতে বাহির হইয়া তাঁহার নয়নপথে আবির্ভূত হইলেন, বৈদিক ঋষিও এমনইভাবে বলিয়াছেন যে, যে-পুরুষ তাঁহার মধ্যে তিনিই আধিত্যম-লে অধিষ্ঠিত।

‘রূপ দেখিলাম রে নয়নে, আপনার রূপ দেখিলাম রে।

আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে।’

১৯৩০ সালে অক্সফোর্ডে দেওয়া ‘The Religion of Man’ শিরোনামে ‘হিবার্ট লেকচার’-এ রবীন্দ্রনাথ হাসন রাজার ওই গানটি উদ্ধৃত করে একই বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন। হাসন রাজার গানে দর্শনের যে তত্ত্বের কথা রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন অভিভাষণে বলেছেন, তাঁর লেখা শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘আমি’ কবিতায় দর্শনের একই তত্ত্বের সন্ধান মেলে।

‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,

চুনি উঠল রাঙা হয়ে।

আমি চোখ মেললুম আকাশে,

জ্বলে উঠল আলো

পুবে পশ্চিমে।

গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম “সুন্দর”,

সুন্দর হল সে।’

                লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও রবীন্দ্রগবেষক।


আপনার মন্তব্য