শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩১ মে, ২০২০ ২৩:২২

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যার নেপথ্যে

লাকমিনা জেসমিন সোমা

মিজদা শহরের সংগঠিত হত্যাকান্ডে  ঘটনাস্থলে মোট ৩৮ জন বাংলাদেশি জিম্মি ছিলেন। এ ছাড়া উক্ত ক্যাম্পে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের আরও শতাধিক নাগরিক বন্দী ছিলেন। এই ক্যাম্পটি মিজদার স্থানীয় একজন লিবিয়ান নাগরিকের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, যার বয়স মাত্র ৩০ বছর। লিবিয়া সরকারের তথ্যমতে, তার নামে বিভিন্ন অপরাধ ও মানব পাচারের অভিযোগ ছিল। এ ছাড়াও তার সহযোগী হিসেবে আরও কয়েকজন অস্ত্রধারী কাজ করত। তারা স্থানীয় কোনো মিলিশিয়া গ্রুপের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে। এই চক্রটি মূলত মরুভূমির মধ্য দিয়ে পাচারের সময় আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের জিম্মি করে নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করত।

আহত বাংলাদেশি ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের দেওয়া তথ্য মতে, বর্ণিত বাংলাদেশিরা করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পূর্বে ক্ষেত্র বিশেষে ৬-৭ মাস আগে মানব পাচারকারীদের সহযোগিতায় লিবিয়ার বেনগাজিতে আগমন করেন। তারা মূলত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ গমনের উদ্দেশে লিবিয়ায় এসেছেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে ইতালি যাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়ায় তারা দীর্ঘদিন ধরে বেনগাজিতে আটকে পড়েন। বর্তমানে সামার সিজন শুরু হওয়াতে পাচারকারীরা কিছু কিছু অভিবাসীদের লিবিয়ার পশ্চিম উপকূল হতে ইতালি প্রেরণ শুরু করে। যদিও তাদের বেশিরভাগ নৌকাই লিবিয়ার কোস্টগার্ডের নিকট আটক হচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক দিন আগে বাংলাদেশি দালাল কর্তৃক প্রচারিত সাগর পথে বাংলাদেশিদের ইতালি পৌঁছানোর ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। যা দেখে তারা যে কোনো উপায়ে ইতালি যাওয়ার জন্য লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আসার চেষ্টা শুরু করেন।

এই অবস্থায় বর্ণিত ৩৮ জন দুই গ্রুপে লিবিয়ার স্থানীয় বাংলাদেশি দালালদের সহযোগিতায় ১০-১৫ দিন পূর্বে মরুভূমি হয়ে বেনগাজি থেকে পশ্চিম লিবিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। লিবিয়ায় বর্তমানে যুদ্ধ ও করোনার কারণে পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলের শহরে যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় পাচারকারীরা মরুভূমির অপ্রচলিত পথ দিয়ে তাদেরকে প্রেরণ করে। পথে চেকপয়েন্ট এড়ানোর জন্য মরুভূমির মধ্যে তাদেরকে অনেক পথ ঘুরতে হয়। বেনগাজি থেকে যাত্রার দুই দিন পর তাদেরকে প্রথমে এক অপহরণকারী চক্র ধরে মরুভূমিতে এক ঘরে আটকে রাখেন। এই চক্র জিম্মিদের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার বা নির্যাতন করেনি বলে বাংলাদেশিরা জানিয়েছে। তিন দিন পর জিম্মিদেরকে সারা রাত ভ্রমণের পর মিজদার পাচারকারীদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে প্রথম গ্রুপটি অর্থের বিনিময়ে মিজদার গ্রুপের নিকট জিম্মিদের বিক্রি করেছে। মিজদায় আনার পর থেকে শুরু হয় তাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন। অপহরণকারীরা মুক্তিপণ হিসাবে প্রত্যেক জনের কাছ থেকে ১০-১২ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করতে থাকে এবং মুক্তিপণের অর্থ দুবাই প্রেরণের কথা জানান। মুক্তিপণ আদায়ে বিলম্ব হওয়ায় দিনকে দিন নির্যাতন বাড়তে থাকে।

লিবিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া এবং আহতদের দেওয়া তথ্য মতে, গত ২৭ মে ২০২০ তারিখ দিবাগত রাতে অপহরণকারীর মূলহোতা ও তার দুয়েকজন সহযোগী পুনরায় অস্ত্রসহ জিম্মি অভিবাসীদের ক্যাম্পে আসে এবং নির্যাতন শুরুর একপর্যায়ে কয়েকজন আফ্রিকার নাগরিক তার অস্ত্র কেড়ে নিতে সক্ষম হয়। যাতে কয়েকজন বাংলাদেশিও সহযোগিতা করে থাকতে পারে বলে জানা যায়। এই অবস্থায় আফ্রিকান নাগরিকের ছোড়া গুলিতে অপহরণকারী মূলহোতা নিহত হন এবং তার সহযোগী আহত হন। তবে এই খবরটি নিহত লিবিয়ানের পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের কাছে বাংলাদেশিরা তাকে হত্যা করেছে বলে পৌঁছায়। একপর্যায়ে তারা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে সশস্ত্রভাবে জিম্মি অভিবাসীদের ক্যাম্পে হামলা চালায় এবং নির্বিচারে গুলি ছোড়ে। যার ফলে এই বর্বরোচিত হতাহতের ঘটনা ঘটে। যদিও লিবিয়ার সোশ্যাল মিডিয়াতে উক্ত অপহরণকারী আফ্রিকানদের হাতে নিহত হয়েছেন বলে শুরু থেকেই প্রচার হয়েছে।

এই বিষয়ে বিভিন্ন উপায়ে মিজদার কয়েকজন লিবিয়ানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিহত লিবিয়ানের বাড়িটি একটি বিশালাকার প্রাসাদ। যার পিছনে কিছুটা আন্ডারগ্রাউন্ডে সে অভিবাসীদের জিম্মি রাখার আস্তানা তৈরি করেছিল। এই প্রাসাদের আশপাশে সবই তার আত্মীয়স্বজনের বাড়ি। কিন্তু তার আত্মীয়স্বজন ছাড়া স্থানীয়রা এইখানে অভিবাসীদের বন্দীশালার বিষয়ে কেউ জানত না। ঘটনার দিন নিহত লিবিয়ানের আত্মীয়স্বজনরা এলাকাবাসীকে কিছু টেররিস্ট গ্রুপ তাদের ছেলেকে হত্যা করেছে বলে ভুল বুঝিয়ে ক্ষিপ্ত করেছিল। স্থানীয়রা জানতোই না ভিতরে বাংলাদেশি আছেন। এমনকি নির্মম হত্যাকা-ের পরও এদেরকে  টেররিস্ট বলে প্রচার করেছিল। ঘটনার পরপরই কিছু কিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় নিহতদেরকে লিবিয়ায় যুদ্ধরত প্রতিপক্ষের ভাড়াটে সৈন্য বলেও দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু নিহতরা বাংলাদেশি হওয়ায় সকলে বিস্মিত হয়ে যায়। বর্তমানে স্থানীয় মিজদার নাগরিকরা এই ঘটনায় অনুতপ্ত বলে তারা জানিয়েছেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনার মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে সাগর পথে ইউরোপ যাওয়ার ২৬ জন বাংলাদেশির স্বপ্নের অন্তিম পরিণাম হলো। এই পথের স্বপ্নে প্রতি বছরই বাংলাদেশিরা প্রাণ দিচ্ছে। গত বছর এক নৌকাডুবির ঘটনায় ৩৭ জন ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুবরণ করেছিল, যাদের লাশও পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি লিবিয়ার কোস্টগার্ডের হাতে আটক হয়ে লিবিয়ার সফর জেলে বন্দী হচ্ছেন এবং চরম নির্যাতন সহ্যের পর খালি হাতে দেশে ফিরে যাচ্ছেন। অথচ তারপরও বাংলাদেশ থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য নতুন করে বাংলাদেশিরা অবৈধভাবে লিবিয়ায় আসছে।

কিন্তু এতসব মৃত্যুর পরও কেন বাংলাদেশিরা এই পথে পা বাড়াচ্ছে। প্রথমত : বাংলাদেশে দালালদের তৎপরতা বন্ধে সরকারের কার্যকরী উদ্যোগের অভাব এবং বছরের পর বছর ধরে চিহ্নিত পাচারকারীদের শাস্তি না হওয়া।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধুমাত্র যারা ইতালি পৌঁছায় তাদের সফলতা প্রচার হওয়া। অন্যদিকে এই পথের মৃত্যুর ঝুঁকি বা ভয়াবহতা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রচারণার অভাব। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ এবং আইনের বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

লেখক : সাংবাদিক।


আপনার মন্তব্য