শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৩২

পথিকৃৎ সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী

চপল বাশার

পথিকৃৎ সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ সংবাদপত্র জগতের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব জহুর হোসেন চৌধুরীর ৪০তম প্রয়াণবার্ষিকী আজ। ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে তাঁর কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। ২৩ বছর বয়সে ১৯৪৫ সালে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু। ’৮০ সালের নভেম্বরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত তাঁর সাংবাদিকতা অব্যাহত ছিল। অসুস্থ শরীরেও তিনি একটানা প্রায় পাঁচ বছর লিখে গেছেন তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’।

জহুর হোসেন চৌধুরীর জন্ম ১৯২২ সালের ২৭ জুন ফেনীর দাগনভুঁইয়া উপজেলার রামনগর গ্রামে। তাঁর বাবা সাদাত হোসেন চৌধুরী ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কর্মস্থল ছিল সিরাজগঞ্জ। সেখানেই এক উচ্চবিদ্যালয়ে জহুর হোসেন চৌধুরী শিক্ষা গ্রহণ করেন ও ’৩৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ’৪০ সালে আইএ ও ’৪২ সালে ইতিহাসে অনার্সসহ বিএ পাস করেন।

জহুর হোসেন চৌধুরীর সাংবাদিক জীবনের সূচনা হয় হাবীবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত ‘বুলবুল’ পত্রিকায় ’৪৫ সালে। এরপর তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেটসম্যান’, ‘কমরেড’ ও ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায়। ’৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং কিছুকাল সরকারি চাকরি করেন। পরে আবার সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন এবং ‘উপাত্ত’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা ও ইংরেজি দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজারভার’-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন। ’৫১ সালে দৈনিক ‘সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। ’৫৪ সালে তিনি এ পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ’৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা শুরু হওয়ার পর বংশাল রোডে ‘সংবাদ’ কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পত্রিকার প্রকাশনা ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। পত্রিকা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আজীবন ‘সংবাদ’-এর অন্যতম পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ‘সংবাদ’-এর সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি নেন এবং এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ‘কাউন্টার পয়েন্ট’ নামে একটি ইংরেজি সাময়িকীর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ’৭৫ সালের শেষ দিকে তিনি ‘সংবাদ’-এ তাঁর বিখ্যাত কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’ লিখতে শুরু করেন। কলামটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, ফলে পাঠকদের কাছে পত্রিকার চাহিদা বৃদ্ধি পায়। প্রথম দিকে কলামটি সপ্তাহে একবার প্রকাশিত হতো, পরে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে জহুর হোসেন চৌধুরী সপ্তাহে দুই দিন কলামটি লিখতেন এবং শেষ পর্যন্ত তাই লিখে গেছেন। এ কলামে তিনি জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন। তাঁর সংবাদ বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও মন্তব্য পাঠকদের মুগ্ধ করত। তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে যে কোনো বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও মন্তব্য প্রকাশ করতেন। এর মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছিল। মৃত্যুর বছরখানেক আগে তাঁর কোনো একটি নিবন্ধের কারণে তৎকালীন সরকার অসন্তুষ্ট হয় এবং তাঁকে গ্রেফতার করে। রমনা থানার পুলিশ রাত ১২টায় তাঁকে ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করে থানায় এনে বসিয়ে রাখে এবং পরদিন সকালে মুক্তি দেওয়া হয়। অসুস্থ জহুর হোসেন চৌধুরী এ ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন এবং তাঁর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটে।

জহুর হোসেন চৌধুরী ’৫৪ থেকে ’৭১- প্রায় ১৭ বছর সংবাদের সম্পাদক ছিলেন। এ সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের খবর পত্রিকার পাতায় গুরুত্বসহকারে ছাপা হতো। সে কারণে পত্রিকাটি রাজনৈতিক মহলে ও জনগণের কাছে প্রিয় ছিল। ’৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পুরোটাই সংবাদের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। খবরটির শিরোনাম ছিল, ‘এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এ শিরোনাম আর কোনো পত্রিকা দেয়নি। এ সাহসী শিরোনাম সাহসী সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীর কারণেই সম্ভব হয়েছিল। সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জহুর হোসেন চৌধুরী অবিস্মরণীয়।


আপনার মন্তব্য