শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:২৭

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও পূর্বাপর ঘটনা

ওয়াহিদা আক্তার

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও পূর্বাপর ঘটনা

বাংলাদেশ ভাষা বৈচিত্র্যে ভরা একটি দেশ। মাতৃভাষার দাবিতে রক্ত দেওয়া জাতি আমরা। ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২০২২-৩২ সময়কে আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পৃথিবীর বিপন্নপ্রায় নৃতাত্ত্বিক ভাষাগুলোর সংরক্ষণ, প্রসার ও উন্নয়ন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১৯ সাল ছিল আন্তর্জাতিক ভাষাবর্ষ। বিপন্ন ভাষাগুলো টিকিয়ে রাখা, তাদের জাতিসত্তার সম্মান সমুন্নত রাখা ও তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের স্বাতন্ত্র্য সমুন্নত রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশে আনুমানিক ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পাহাড়ি ও সমতলের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছে।

সম্প্রতি আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাই। সেখানে মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে গৃহহীনদের গৃহ প্রদানের উৎসব চলছিল। হিজড়া সম্প্রদায় ও সমতলের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কোল সম্প্রদায়ের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণে গেলে তারা নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি দিয়ে স্বাগত জানায়। কোল ভাষায় ধন-ধান্য পুষ্প ভরা গানটি খুব আবেগভরে গেয়ে শোনায়। কোল ভাষার পাশাপাশি তারা সবাই বাংলা ভাষা জানে। কিন্তু কোল ভাষাকে তারা নিজেদের মধ্যে ধরে রেখেছে। শিশুরা বড় হয় মায়ের মুখে কোল ভাষা শুনে শুনে। এভাবে বাংলাদেশে ৫০টি আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব মাতৃভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি সাজ-পোশাকে বাংলাদেশকে এক ভাষাবর্ণে বৈচিত্র্যে ভরপুর দেশ করে রেখেছে। একটি বাগানে একরকম ফুলের চেয়ে বহুবর্ণে বিচিত্র ফুল বাগানকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে, তেমনি বিভিন্ন ধর্ম জাতি গোষ্ঠীর বর্ণিল ভাষা ও সংস্কৃতিতে দেশ সমৃদ্ধ ও সুন্দর হয়। শিশু মায়ের মুখের ভাষা শুনে শুনে কথা বলতে শেখে। এই ভাষার সঙ্গে থাকে তার নাড়ির টান। মাতৃভাষার মাধ্যমেই মানুষ জ্ঞানচর্চা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হলে সে শিক্ষা প্রকৃতভাবে সম্পূর্ণ হয় না। ভাব প্রকাশের স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না। এ জন্য কোনো মানুষকে মানসিকভাবে অবদমন করতে চাইলে তাকে ভাব প্রকাশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়ে থাকে। বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি শিক্ষা নেওয়াও এখন জরুরি।

কোনো ইতিহাস না জেনে আমরা শিশু বয়স থেকে ২১-কে ভালোবেসেছি। ভোরের অন্ধকার থাকতে বেশির ভাগ সময়ে অন্যের বাগানের ফুল তুলে নিয়ে খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে যায়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস জেনে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরিতে ভাষাশহীদদের স্মরণ করেছি। রফিক, সালাম, বরকতের জন্য গান গেয়েছি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ ১৯৯৬ সালে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে বিপিএটিসির একজন প্রশিক্ষক তাঁর ভাষা আন্দোলনের ওপর লিখিত প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম না রাখায় নিরীহ একটি প্রশ্ন করাতে তিনি বিব্রত হয়েছিলেন। একই গ্রুপের ক্লাসে পাবনার আমিনুল ইসলাম বাদশার ছেলে সাবিরুল ইসলাম দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলনে জেলখানায় অনশন ও পরবর্তীতে মুক্তি বিষয়ে সবাইকে অবহিত করলে প্রশিক্ষক মহোদয় আরও একবার বিব্রত হন। আসলে আমরা সেই প্রজন্মের সন্তান যাদের একুশ বছর ধরে বিকৃত ইতিহাস জানানো হয়েছিল। এক মিথ্যাকে বারবার উচ্চারণ করে সত্য বানানো হতো। মিথ্যা ইতিহাস শুনিয়ে আত্মমর্যাদাহীন আত্মবিস্মৃত একটি বেবোধ জাতিতে পরিণত করা হয়েছিল, যে জাতি আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে, মূল্যবোধকে পা মাড়িয়ে চলে। পিতৃহত্যার সাফাই গান শুনেছি ২১ বছর ধরে। আমরা সেই অর্বাচীন সময়ের সন্তান। মানুষের স্বভাবজাত অভিপ্রায়, চেতনা, অনুভূতি স্বতঃস্ফূর্ত। ভারসাম্যপূর্ণ স্ফুরণ মানুষকে প্রকৃত মানুষের মর্যাদায় বিকশিত করে। মাতৃভাষা প্রকৃত মনুষ্যত্ব বিকাশের গোড়ায় পানি দিয়ে সজীব রাখে। এই স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ স্বাধীনতাবোধের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। মানুষের যখন রোগ হয় তার শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হলেই সে অসুস্থবোধ করে। সেই একইভাবে রাষ্ট্র, সমাজ বা সর্বজনীন রীতির স্বাভাবিকতার দাবি এসে যায়। এ দাবিকে অস্বীকার করে নানা পদক্ষেপ গৃহীত হওয়ার ফলে অপতৎপরতার শিকড় বিস্তৃত হয়। স্বাধীনতা শব্দটির সঙ্গে আত্মবিশ্বাস কথাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জোরজবরদস্তি, ক্ষমতাশালীর নিপীড়ন, নির্যাতন বা নিরীহদের সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করা কোনোটাই মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে না। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের জাঁতাকলে পিষ্ট বাঙালি জাতি যখন ক্ষতবিক্ষত তখনই এগিয়ে আসেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ তিনি তাঁর বিশাল বুকে বাংলার দুঃখী মানুষের অনুভূতি ধারণ করতেন।

ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রশ্নেই প্রথম পূর্ব বাংলার মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়। বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ করে এ দেশের মানুষের অনুভূতির প্রতি প্রথম আঘাত আনা হয়। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন হয়। ওই সম্মেলনে তদানীন্তন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রস্তাব উত্থাপন করেন ‘মাতৃভাষা হবে শিক্ষার বাহন এবং পূর্ববঙ্গের আইন-আদালতের ভাষা হবে বাংলা।’ ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তমুদ্দুন মজলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। আরও কয়েকটি সংগঠন পরে যুক্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা হয়। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পরপরই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষার দাবিতে প্রথম সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট সফল করার জন্য সচিবালয়ের প্রথম গেটে পিকেটিং চলাকালে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় ৩০০ ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের সঙ্গে আট দফা চুক্তির ফলে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য ছাত্রনেতা ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় মুক্তি পান। মুক্তিলাভের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে গিয়ে আট দফা চুক্তি পরীক্ষা করে ঘোষণা করেন, যেহেতু এ আট দফা চুক্তিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকৃত হয়নি সেহেতু এ চুক্তি তিনি মানেন না। ১৬ মার্চ আট দফা চুক্তির বিরুদ্ধে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় তিনি এক সভা আহ্বান করেন। এ সভায় বঙ্গবন্ধু একমাত্র বক্তা ছিলেন এবং তিনিই সভাপতিত্ব করেন। সভাপতির বক্তৃতাকালে তিনি আট দফার চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলে মিছিলসহকারে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ ভবন ঘেরাও করেন এবং দাবি উত্থাপন করেন যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে না পারলে গণপরিষদ থেকে পূর্ববঙ্গের সব সদস্যকে পদত্যাগ করতে হবে। সেদিন ১৬ মার্চ এ মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য ছাত্রনেতার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ২১ মার্চ ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে লক্ষাধিক লোকের বিশাল সমাবেশ এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেনশনে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়ার ঘোষণা প্রদান করলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওই সমাবেশে অন্যান্য ছাত্রনেতাকে সঙ্গে নিয়ে তার তীব্র প্রতিবাদ জানান। এখান থেকেই ভাষা আন্দোলন নতুন রূপ ধারণ করে। এর চরম বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার জন্য জীবন দেন সালাম, বরকত, জব্বার, রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকে। ২১ ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে স্বাধীনতা আন্দোলনের মাইলফলক। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনকালে বঙ্গবন্ধু কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় ভাষা আন্দোলনের নেতা জনাব গাজীউল হক, জনাব জিল্লুর রহমান, ডা. গোলাম মওলা এবং সামসুল হক চৌধুরীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং আন্দোলন সম্পর্কে পরামর্শ দিতেন। এ সময় তিনি রাজবন্দীদের মুক্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জেলে অনশন ধর্মঘট পালন করেছিলেন।

২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট এবং মিছিল করে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করার পরামর্শ তিনিই দিয়েছিলেন। তখন থেকেই ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ও ‘বাংলা ভাষায় রাষ্ট্র চাই’ সমার্থক হয়ে গিয়েছিল।

জ্ঞানচর্চার সর্বোত্তম মাধ্যম মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করলে খুব সহজে তার প্রয়োগ করা যায়। দেশ ও জাতির কল্যাণে তা ব্যবহার করা যায়। পাকিস্তানি শাসকদের কাছে এ সময় বাংলা ভাষা ধর্মহীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। বলা হয়, ‘বাংলা হিন্দুয়ানি ভাষা, মুসলমানদের বাংলা চর্চা করা ইসলামের পক্ষে অকল্যাণকর।’

তাদের এ ষড়যন্ত্রের স্বরূপ বঙ্গবন্ধু পুরোপুরি উপলব্ধি করেছিলেন। তাই বলেছিলেন, ‘আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি, পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিসনদ একুশ দফা দাবি, যুক্ত নির্বাচন প্রথার দাবি, ছাত্র-তরুণদের সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষালাভের দাবি, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার দাবি ইত্যাদি সব দাবির মধ্যে এই শোষক দল ও তাদের দালালরা ইসলাম ও পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছে।’ বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আঞ্চলিক পরিবেশ ও জনগণের ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতেই সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারে। ১৯৭১ সালের ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সম্মানে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পীসমাজ আয়োজিত ভাষণে তিনি বলেন, ‘ধর্মের নামে ভাড়াটিয়া সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া মানুষের আত্মার স্পন্দনকে পিষে মারার শামিল।’ ইসলামবিরোধী অপবাদ দিয়ে যারা বাংলাকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন তাদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘একটি জাতিকে পঙ্গু ও পদানত করে রাখার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করা। বাংলার মানুষ মুসলমান নয়, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নেই এ ধরনের অভিযোগ দিয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে ২৩ বছর ধরে তাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র চলছে।’

পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ইংরেজি এবং উর্দুতে কার্যবিবরণী লেখা হতো। ১৯৫৫ সালের ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত আইন পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু স্পিকারের আপত্তি উপেক্ষা করে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন ‘Honorable Deputy Speaker, Sir, I have to Speak in Bengali and I am very sorry that you do not understand it but still I have to SpeakÕ.  প্রচন্ড আপত্তি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। তবে কার্যবিবরণীতে তা ইংরেজিতে রেকর্ড করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর পরই পশ্চিম পাকিস্তানের পীর আলী মোহাম্মদ রাশদি সিন্ধি ভাষায় বক্তব্য প্রদানের অনুমতি চাইলে কোনো তরফ থেকে প্রতিবাদ বা নিরুৎসাহের আভাস আসার আগেই বঙ্গবন্ধু বলে ওঠেন ‘ Yes, if you Please. (Karachi Wednesday, The 9th November, 1955)’

ভাষা আন্দোলনের ফলে সরকার অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে বাংলা, উর্দু ও ইংরেজিকে স্বীকৃতি দিলেও গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় বক্তব্য দেওয়াকে নিরুৎসাহ করা হতো। ১৯৫৫ সালের ৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর বাংলায় দেওয়া বক্তব্যকে ইংরেজি ভাষায় রেকর্ড এবং বাংলা ভাষায় কার্যদিবসের রেকর্ড সংরক্ষণ না করায় পরবর্তী অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। Sir, in the Rules of Procedure of the Constituent Assembly of Pakistan under Rule 29, the Official Languages of the Assembly have clearly been mentioned as three; English, Bengali and Urdu. But as you Know, Sir, the order of the day is Circulated in English and Urdu and not in Bengali. Why It has been done and Why Bengali has been excluded (17th January 1956).পাকিস্তানিরা ভাষার দাবিতে বাঙালিদের তেজোদ্দীপ্ত জয়ের পরও বাংলাকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করেনি। সংবিধানের খসড়ায় উর্দুকে ইসলামী ভাষা আখ্যায়িত করে বাংলার ওপর তার মর্যাদা রাখা হয়। রাষ্ট্রভাষা প্রাদেশিক ভাষা, জাতীয় ভাষা ইত্যাদি ভেদ সৃষ্টি করে বাংলা ভাষা নিয়ে সে সময় গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছিল। সে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার লক্ষ্যে ১৯৫৬ সালের ২১ জানুয়ারি পাকিস্তান আইন পরিষদের অধিবেশনে খসড়া সংবিধানের ওপর আলোচনায় বঙ্গবন্ধু ইসলামী ভাষার নামে কূপমন্ডুকতার জবাব দিয়েছিলেন। ‘ What is the Language of Islam Sir, Arabic, Urdu, persian or Bengli. What is the Language of the Mussalmans, Who will Judge it? My friend says Urdu, I would say Bengali, persian Will say Persian. Turks will say Turkish. Indonesians will say Indonesian. Other will say their own Language’.১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে। যুক্তফ্রন্ট বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ’৫৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শাসনতন্ত্র গঠন করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার হটিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে। শেখ মুজিব পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদে নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৫ থেকে ’৫৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মুজিব দাবি করেছিলেন যে বাঙালি জাতির জাতিগত পরিচয়কে সম্মান করা উচিত এবং সরকারি ভাষার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘আরও পরিষ্কারভাবে বলছি, আমরা আদৌ উর্দুর বিপক্ষে নই। আমরা উর্দু ভাষা শিখতে আগ্রহী। এই সঙ্গে আমরা আশা করি সাড়ে চার কোটি মানুষের ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।’ ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি ভাষণে বলেন, ‘Sir, you will see that they want phrase ÔEast PakistanÕ instead of ÔEast BengalÕ. We have determined many times that you should use Bengal instead of East Pakistan. The Word has a history and tradition of its own. You can change it only after the people have been consulted. If you want change it. We have to back to Bengal and ask them whether they are ready to accept it’.বাংলাদেশের অর্জন সব আওয়ামী লীগের হাতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে মাত্র সাড়ে তিন বছর বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে সুযোগ পেয়েছিলেন। আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশের উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপে দেখা যায় ভিত্তি তিনি গড়ে রেখে গেছেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর ২১ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে তাঁর নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলা ভাষার আন্দোলনে তাঁর এসব অবদানকে অস্বীকার করে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করে ইতিহাসভিত্তিক বই প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়। একটি প্রজন্ম দীর্ঘ ২১ বছর ধরে অবিরাম মিথ্যাচার শুনেছে।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার এসে আওয়ামী লীগ ভাষা শহীদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়। কানাডাপ্রবাসী সালাম ও রফিক ভালোবাসি মাতৃভাষা সংগঠনের মাধ্যমে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের ইউনেস্কোতে মাতৃভাষার সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রস্তাব দেয়। সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সমর্থন এ স্বীকৃতি এনে দেয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে সব মাতৃভাষা, বর্ণমালা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেখ হাসিনা প্রায়ই বলেন, যারা নিজেদের মাতৃভাষাকে ভালোবাসে না, তারা অন্যের মাতৃভাষাকে সম্মান করবে না সেটাই স্বাভাবিক। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা সরকারপ্রধান হিসেবে যতবার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন তা বাংলাতেই দিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও বিশ্বে বাংলা ভাষা যেন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

পরিশেষে শেখ রেহানা আপার তখনকার দিনে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরি নিয়ে স্মৃতিকথা দিয়ে শেষ করছি। একদিন দুই বোন গণভবনের দোতলায় ভিতরের বারান্দায় বসা ছিলেন। আমার জরুরি কোনো একটা বিষয় নিয়ে কিছু বলার তাগিদ ছিল। সাহস করে ভিতরে আসার অনুমতি চাইলে ইশারায় অনুমতি পেয়ে কাছে যাই। দেখি দুজনের আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে, এখন বাংলাদেশে বাহারি সব ফুলের চাষ হচ্ছে। যে কোনো অনুষ্ঠানে ফুলের ছড়াছড়ি। আমাদের ছোট সময়ে ছিল না এত সব ফুল। কথা বলতে বলতে রেহানা আপা বললেন, ‘আগে তো ফুল বলতে ওই গাঁদা। শলা কাঠি ঢুকিয়ে তোড়া বানানো। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিতে গেলে ওই গাঁদাই ভরসা ছিল। আমরা ভোররাতে তাজউদ্দীন চাচির বাগানে হানা দিতাম। চাচি.. ই.. ই উঠেন... ন বলে ডাকতাম আর ফুল ছিঁড়তাম।’

আমার মনে হয়, বাংলাদেশের এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না যার জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার বা প্রভাতফেরির স্মৃতি নেই। কারণ আমরা বাঙালি, ভালোবাসি বাংলা ভাষাকে, ভালোবাসি বাংলাদেশকে। তাই তো শিল্পী আবদুল লতিফের লেখা, সুর করা এবং গাওয়া এ গানটি এখানে স্মরণীয়-

দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা কারো দানে পাওয়া নয়

দাম দিছি প্রাণ লক্ষকোটি জানা আছে জগৎময়।।

বাহান্নতে মুখের ভাষা কিনছি বুকের খুনে রে

বরকতেরা রক্ত দিছে বিশ্ব অবাক শুনে রে,

দিছি রক্ত জন্মাবধি সাগর-সাগর নদী-নদী

রক্তে বাংলা লাল কইরাছি- এই কথা তো মিথ্যা নয়।।

 

লেখক : অতিরিক্ত সচিব।


আপনার মন্তব্য