শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ মার্চ, ২০২১ ২৩:২৬

টিকা-বিরোধিতা মানে বিজ্ঞান-বিরোধিতা

তসলিমা নাসরিন

টিকা-বিরোধিতা মানে বিজ্ঞান-বিরোধিতা

গতকাল আমি আস্ট্রাজেনেকা-অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির টিকা নিলাম। কিন্তু চেনা অচেনা মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করেছি, টিকা না নেওয়ার পক্ষেই সংখ্যা ভারী। খবরে এবং সোশ্যাল মিডিয়াতেও দেখছি অনেকে টিকার বিরোধিতা করছে। বিশ্বজুড়ে টিকা-বিরোধী লোক দল পাকাচ্ছে। বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, ইউক্রেইন, রাশিয়া, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া- কোথায় টিকা-বিরোধী নেই? ভারতে লক্ষ্য করেছি, মোদিবিরোধী লোকেরা টিকা-বিরোধী। বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা তো প্রকাশ্যেই বলছেন মোদির টিকা তাঁরা নেবেন না, কেউ কেউ বলছেন মোদির টিকা নিলে তাঁরা নপুংসক হয়ে যাবেন। কেউ বলছেন, জনসংখ্যা কমানোর উদ্দেশে জনগণকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। ওদিকে বাংলাদেশে বিরোধী দল বিএনপির কেউ কেউ বলছেন, এই টিকা বিএনপির লোকদের মেরে ফেলার জন্য দিচ্ছে সরকার। অস্ট্রেলিয়ার টিকা-বিরোধীরা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন টিকা তৈরি করতে যেখানে ১০ বছর লাগে, সেখানে ১ বছরে কী করে টিকা তৈরি হলো? আরও নানা রকম অদ্ভুত প্রশ্ন এবং মন্তব্য টিকা-বিরোধীদের কাছ থেকে আসছে। আমি অবাক হই, এতগুলো মানুষের যুক্তি বুদ্ধি কী করে হঠাৎ লোপ পেয়ে গেল! কভিড শুরু হওয়ার শুরু থেকেই আমরা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে জানতে পারছিলাম করোনাভাইরাসের নাড়ি নক্ষত্র, এর গতি-প্রকৃতি। সংক্রামক ব্যাধির বিশেষজ্ঞরা আমাদের প্রতিনিয়ত জানাচ্ছিলেন করোনাবিষয়ক প্রতিটি তথ্য। এমন কী ঘটেছে যে মানুষ সব ভুলে গেছে? ১০ বছরের জায়গায় ১ বছরে টিকা তৈরি করতে, কত বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, কত হাজারো বিজ্ঞানী দিন-রাত পরিশ্রম করে গেছেন, এখনও করছেন, সে কথাও টিকা-বিরোধীরা ভুলে গেছে। টিকা তৈরির শুরু থেকে কোম্পানিগুলো আমজনতাকে জানাচ্ছে কীভাবে টিকা বানিয়েছে, কত মানুষের ওপর ট্রায়াল হলো, ট্রায়ালের কী ফল হলো, সব। রোগ এবং রোগমুক্তির যাবতীয় তথ্য এত নিখুঁতভাবে মানবজাতি, আমার মনে হয় না, এর আগে পেয়েছে। আজ যে প্রশ্নগুলো মানুষ করছে টিকা না নেওয়ার পক্ষে, প্রতিটির উত্তর সংক্রামক ব্যাধির বিশেষজ্ঞরা আগেই দিয়েছেন, টিকা-বিজ্ঞানীরাও দিয়েছেন। টিকা-বিরোধিতা আসছে ব্যক্তিগত সংশয় থেকে; একজনের দ্বিধা আরেকজনের মধ্যে সংক্রামিত হচ্ছে, তা থেকে; আসছে ষড়যন্ত্র থিওরির কবলে পড়া কিছু লোকের কাছ থেকে, আসছে যুক্তি বুদ্ধি না খাটিয়ে বিদ্রোহী হওয়ার আনন্দে মেতে থাকা থেকে, আসছে সরকার-বিরোধিতা থেকে।

করোনাভাইরাসে বিশ্বের ১২ কোটি লোক সংক্রামিত হয়েছে, ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে-তারপরও টিকা-বিরোধীরা বলছে এ ভাইরাস মারাত্মক নয়, অন্য ভাইরাস এর চেয়েও মারাত্মক, অন্যান্য রোগে এর চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। অন্যান্য রোগে বেশি মানুষ মারা যায় তাই বলে কি এই ভাইরাস থেকে আমাদের মৃত্যু বন্ধ করতে হবে না? ইবোলা, ডেংগি ইত্যাদিতে মানুষের মৃত্যুর হার বেশি, তাই বলে এই করোনাভাইরাসকে, অতিমারীর এই ভয়াবহতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে হবে? এইডসের টিকা আজও আবিষ্কার করা যায়নি বলে করোনার টিকাও আবিষ্কার করা যাবে না, এটিও বড় সরলীকরণ। আমরা কি জানি না কোনও রোগের চিকিৎসা নেই, কোনও রোগের আছে! আমাদের চিকিৎসা-বিজ্ঞান আপাতত আমাদের এটুকুই দিতে পেরেছে। আমরা বেশ কিছু অসুখ-বিসুখ থেকে একশ’ভাগ আরোগ্য লাভ করার চিকিৎসা পাইনি, কিন্তু গত ১০০ বছরে যা পেয়েছি, তার কি তুলনা হয়? এককালের দুরারোগ্য ব্যাধিও আজকাল কী দ্রুত সেরে যাচ্ছে! রোগ শোকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর আমাদের ভরসা করতেই হবে। চিকিৎসা-বিজ্ঞান আমাদের যতটা সুস্বাস্থ্য দেবে, ততটা আর কেউ দিতে পারবে না। টিকা-বিরোধিতা করা মানে বিজ্ঞানের বিরোধিতা করা। মূর্খ এবং ধর্মান্ধরা সমস্ত ভালো কিছুর বিরোধিতা করে। আমি এতে আর অবাক হই না। কিন্তু মানবজাতির এই দুঃসময়ে শুধু ধর্মান্ধ এবং মূর্খই নয়, কিছু বিজ্ঞানে বিশ্বাসী লোকও মানবতার ক্ষতি করতে নেমেছে। এখন প্রশ্ন হলো, আসলেই ওরা কি বিজ্ঞানে বিশ্বাসী? হয়তো ওরা কখনও বিশ্বাস করে, কখনও আবার করে না। লক্ষ্য করেছি, ট্রাম্পের আদর্শে যে মাস্ক-বিরোধী একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল, ওরা সগৌরবে টিকার বিরোধিতা করছে। ট্রাম্প কিন্তু টিকা নিয়েছেন। টিকা নিচ্ছেন না ট্রাম্পের ভক্তকুলের অনেকেই। নেতারা জনতাকে বিভ্রান্ত করেন, ফলে জনতা নিজেদের ক্ষতি করতে সংকোচ করে না। কিন্তু নেতাদের কোনও ক্ষতি নেতারাই হতে দেন না। নেতাদের চরিত্র অনেকটা মুসলমানদের পীর, আর হিন্দুদের বাবার মতো। নিজেরা আমোদ স্ফুর্তি আখের গোছানো সবই করছেন, ওদিকে শিষ্যদের সর্বস্বান্ত করছেন, বিভ্রান্ত করছেন। আমরা তো জানিই ভক্তরা কীভাবে বিশ্বাসের আফিমে বুঁদ হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার ইমাম সুফিয়ান খলিফা তাঁর অনুসারীদের বলে দিয়েছেন তারা যেন টিকা না নেয়, তারা যেন পয়গম্বরকে অনুসরণ করে, তারা যেন বিশ্বাস করে যে ইসলাম টিকার বিপক্ষে। এইসব ধর্মগুরু কিন্তু গোপনে ঠিকই টিকা নেবেন, অসুস্থ হলে ঠিকই হাসপাতালে যাবেন। শুধু মুসলিম ধর্মগুরুই নন, গির্জার বিশপরাও টিকার বিরোধী।

গুটিবসন্তের সময়ও এমনভাবে টিকার বিরোধিতা করেছিল মানুষ। ব্যঙ্গ করে টিকা-বিরোধী লেখা লিখেছিল, কার্টুন এঁকেছিল। ১৩৫ বছর আগে কানাডায় যে ভাষায় টিকার বিরোধিতা করেছিল টিকা-বিরোধীরা, আজও সেই একই ভাষা ব্যবহার করছে তাদের উত্তরসূরিরা। ওই বিরোধীদের গুরুত্ব না দিয়ে গুটিবসন্তের টিকা সবাইকে দেওয়া হয়েছিল বলেই আজ মানুষ ওই রোগ থেকে বেঁচেছে। প্রতিটি সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে শুধু কানাডায় নয়, পৃথিবীর সর্বত্র এ-ই হয়েছে।

আসলে আমি কল্পনা করতে পারিনি মানুষ কখনও কভিডের টিকার বিরোধিতা করবে। এ অনেকটা নিজের জীবনের বিরোধিতা করার মতো। মৃত্যুর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। তারপরও এটিকে ‘কিছুই না’ যারা বলে বেড়াচ্ছে, তারা মানবজাতির কতটা ক্ষতি করছে, তারা নিজেরাও জানে না। টিকা-বিরোধীরা টিকা নিতে দ্বিধা করছে, কারণ তারা মনে করছে টিকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তারা কি বলতে চাইছে টিকা নিলে তাদের যত ক্ষতি হবে, কভিড তার চেয়ে কম ক্ষতি করবে? সত্য তথ্য হলো, কভিড তোমাকে মৃত্যু দেবে, টিকা তোমাকে জীবন দেবে। টিকায় কারও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি দেখা দেয়, কারও কম দেখা দেয়, কারও আবার দেখাই দেয় না। সব টিকার ক্ষেত্রেই এ-ই হয়। যে কোনও ওষুধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, তাই বলে কি আমরা সেইসব ওষুধ সেবন করি না? করি, করি কারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চেয়ে রোগ মারাত্মক।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পোলিও, ডিপথেরিয়া, গুটিবসন্তে প্রতি বছর ৬০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যেত আমেরিকায়। ২০১৬-তে দেখা গেছে, আমেরিকায় একটি মানুষও পোলিও, ডিপথেরিয়া, আর গুটিবসন্তে মারা যায়নি। কারণ কী এর? কারণ টিকা। সারা বিশ্বে পোলিও, ডিপথেরিয়া, গুটিবসন্ত তো আছেই, হাম, রুবেলা, টিটেনাসে ৩০ লাখ লোক মারা যেত, সেইসব এখন প্রতি বছর নিয়ন্ত্রণে আসছে। কারণ কী? কারণ বিশ্বময় টিকাদান কর্মসূচি। টিকা মানবজাতিকে ভয়ঙ্কর ভাইরাসের ছোবল থেকে বাঁচিয়েছে। একে তুড়ি মেরে উড়িয়ে যারা দিতে চাইছে, তারা ইতিহাস অস্বীকার করছে।

যারা টিকা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা মূলত ভুল তথ্যের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের দায়িত্ব মানুষকে ভুল তথ্যের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। ভুল তথ্য বারবার বললে মানুষের মস্তিষ্কে ঢুকে যায় সেই তথ্য, তবে ‘ভুল তথ্য’ হিসেবে নয়, স্মৃতিতে গাঁথা থাকে ‘তথ্য’ হিসেবে। একটা ছোট উদাহরণ দিই, আমার জীবন থেকেই দিই, আমার সম্পর্কে যা কিছু অপপ্রচার হয়েছে, যেমন আমি মেয়েদের দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করার পরামর্শ দিয়েছি, যেমন আমি সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কোরআনের পাতা উল্টেছি, যেমন আমি বোরখা পরে দেশ থেকে বেরিয়েছি,-সবই ভিত্তিহীন, মিথ্যে। আমি লক্ষ করেছি মানুষের মস্তিষ্কে আমার সম্পর্কে নানা ‘ভুল তথ্য’ অবস্থান করছে। কেউ অপপ্রচার করার উদ্দেশে এসব কখনও বলেছিল বা লিখেছিল, আর মানুষের মস্তিষ্কে তথ্য হিসেবে এসব প্রবেশ করেছে। আমার নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোকের মস্তিষ্কের স্মৃতিতে রাখা এই অপপ্রচারগুলো তথ্য হিসেবে বেরিয়ে আসে। যারা এসব বলে তারা কিন্তু কোনও প্রমাণ দেখাতে পারবে না। টিকা সম্পর্কে অপপ্রচারও আগুনের মতো ছড়িয়ে গেছে বিশ্বময়, কেউ প্রমাণ দেখাতে পারছে না, কেউ প্রমাণ দেখতেও চাইছে না। অপপ্রচার ঠিক এমনই হয়।

করোনার প্রকোপ ধীরে ধীরে কমছে, এর পিছনে আমাদের লকডাউন, আমাদের মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা এবং বিশ্বজুড়ে এর চিকিৎসা কাজে দিয়েছে। ৮০ ভাগ মানুষের টিকা নেওয়া হয়ে গেলে শুধু ব্যক্তির নয়, গোটা সমাজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে। করোনা পরাজিত হবে। এভাবেই আমরা প্রচুর মারণ ভাইরাসের কামড় থেকে বেঁচেছি।

বিজ্ঞানীরা টিকা না-ও বানাতে পারতেন। আমরা এভাবেই পড়ে থাকতে পারতাম প্রতিরোধহীন। টিকা বানানো হয়েছে এ আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া। টিকা শতভাগ কাজ করবে না, কিন্তু ৭০ থেকে ৯০/৯৫ ভাগ কাজও যদি করে, তা-ই তো অনেক। অন্তত ০ থেকে তো ভালো। আগে বিজ্ঞানীরা যা পারতেন না, এখনকার বিজ্ঞানীরা তা পারছেন। বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্যই এ সম্ভব হয়েছে। আগে বিজ্ঞানীরা চাঁদে রকেট পাঠাতেই কত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, এখন বিজ্ঞানীরা মঙ্গলগ্রহে দিব্যি রকেট পাঠাচ্ছেন। আগে ব্যাক্টেরিয়ায় আক্রান্ত হলে বিজ্ঞানীরা তার চিকিৎসা জানতেন না। আজ এসব ডাল ভাত। একসময় হয়তো এমন দিন আসবে, টিকা বানাতে আমাদের আর ১ বছর লাগবে না, ১ দিনে টিকা আবিষ্কার হয়ে যাবে। সেদিন আমাকে এক বন্ধু বললো যে তার করোনা হয়েছিল, কিন্তু সামান্য একটু জ্বর ছিল একদিন, তারপর সেরে গেছে, যদিও টেস্টে দেখা গেছে তার কভিড পজিটিভ। বললো, সুতরাং সে বিশ্বাস করে না করোনা কোনও খারাপ ভাইরাস। কভিডকে রোগ বলেই ধরছে না সে। তো আমি বললাম ‘তুমি কি শুধু তোমার কথাই ভাববে, ২৬ লাখ লোক যে এই রোগে মারা গেল তাদের কথা ভাববে না? তুমি তো এত স্বার্থপর, জানতাম না। তোমার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো, তাই তুমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়নি। কিন্তু সবার তো তোমার মতো প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। তাদের রক্ষা করার জন্যই তো টিকা নেবে। ‘মানুষ শুধু নিজের গ-িটা দেখে, নিজের গ-িটা ভালো থাকলেই মনে করে সব ভালো। সারা পৃথিবীতে গণকবর কতগুলো খোঁড়া হয়েছে, সে হিসাব কেউ রাখতে চায় না।

মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, বিজ্ঞান-বিরোধিতা বন্ধ হোক। সকলে টিকা নিক। আমাদের পদে পদে মৃত্যু ওঁত পেতে থাকে। আমরা সব মৃত্যু থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি না। কিন্তু যে মৃত্যু থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি, যে ক্ষমতা আমাদের হাতে আছে, সেটিকে হেলায় উপেক্ষা করা বোকামো। আর এই বোকামোর খেসারত যে কত মানুষকে মরে গিয়ে দিতে হবে, কে জানে।

            লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।