শিরোনাম
মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

জয় হোক জনকের স্বপ্নবাহু এমন কন্যার

ড. আতিউর রহমান

জয় হোক জনকের স্বপ্নবাহু এমন কন্যার

আশাজাগানিয়া নেতৃত্ব আর উন্নয়ন গায়ে গায়ে লাগানো দুটো বিষয়। জাতির দীর্ঘমেয়াদি আশা-আকাক্সক্ষাকে মূর্তভাবে ধারণ করতে পারেন এমন নেতৃত্ব ছাড়া আসলেই একটি দেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কেননা উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মনের পরিবর্তনের বিষয়। আমরা পারি এবং আমরা পারব এই আশাবাদী মনকে জাতির মনোজগতে স্থাপন করা নেতৃত্বের এক বড় গুণ। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন- ‘...আমাদের জীবনে সুস্পষ্টতা নাই। আমরা যে কী করিতে পারি, কতদূর আশা করিতে পারি, তাহা বেশ মোটা লাইনে বড়ো রেখায় দেশের কোথাও আঁকা নাই। আশা করিবার অধিকারই মানুষের শক্তিকে প্রবল করিয়া তোলে।... আশা করিবার ক্ষেত্র বড়ো হইলেই মানুষের শক্তিও বড়ো হইয়া বাড়িয়া ওঠে।... কোনো সমাজ সকলের চেয়ে বড়ো জিনিস যাহা মানুষকে দিতে পারে তাহা সকলের চেয়ে বড়ো আশা। সেই আশার পূর্ণ সফলতা সমাজের প্রত্যেক লোকেই যে পায় তাহা নহে; কিন্তু নিজের গোচরে এবং অগোচরে সেই আশার অভিমুখে সর্বদাই একটা তাগিদ থাকে বলিয়াই প্রত্যেকের শক্তি তাহার সাধ্যের শেষ পর্যন্ত অগ্রসর হইতে পারে।’ (রবীন্দ্র রচনাবলী, ত্রয়োদশ খন্ড, ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’, পৃ.৬৯৯)

রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা অনুসারে জাতির মধ্যে আশাবাদ জাগিয়ে তোলার মতো নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছিল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বাঙালির বহুকালের বঞ্চনার ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটানোর সংগ্রামে তিনিই জাতিকে দিয়েছিলেন সুস্পষ্ট নির্দেশনা। দুঃখের দিনে এক হওয়ার মন্ত্র তিনিই তাঁর অসামান্য নেতৃত্বের মাধ্যমে বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন। চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলা ও বাঙালিকে তিনি স্বকীয় অস্তিত্বের এক অসাধারণ অনুভবের সন্ধান দিয়েছিলেন। সেটিই ছিল তাঁর মতো করে গড়ে তোলা বাঙালি জাতীয়তাবাদ। যার ভিত্তিতেই তিনি জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই শুরু করেছিলেন আর্থসামাজিক মুক্তির এক অনন্য সংগ্রাম। অপশক্তি তাঁকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট আমাদের কাছ থেকে শারীরিকভাবে ছিনিয়ে নিলেও তাঁর অবিনাশী চিন্তা, কর্ম ও দর্শন আমাদের ভিতরে প্রোথিত থেকে গিয়েছিল। তাই যেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অভিযাত্রা শুরু করেন সেদিন আমরা আবার নতুন করে বাঁচার জিয়নকাঠির সন্ধান পেয়েছিলাম। আবার বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে হাঁটার আশায় উদ্বেলিত হয়েছিলাম। তাঁর দেশে ফেরায় যেন মেহনতি মানুষের আর্থসামাজিক মুক্তির স্বপ্নগুলো নতুন জীবন পেয়েছিল। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর যথার্থই কবিতায় লিখেছিলেন-

‘সেই বৃষ্টি সেই অশ্রু আপনার সেই ফিরে আসা

নিমজ্জিত নৌকোটিকে রক্ত থেকে টেনে তুলবেন,

মানুষের দেশে ফের মানুষের সংসার দেবেন

ফিরেছেন বুকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশা।

সেদিনই হয় জন্মলাভ প্রকৃত অর্থেই,

আপনার জন্মদিন আমাদের কাছে সেই দিন,

যেদিন ফেরেন ঘরে আমাদের হৃদয়ে আসীন,

যেদিন স্বর্গের ফুল ফুটে ওঠে মাটির মর্ত্যইে।’

(‘শেখ হাসিনার জন্মদিন’, সৈয়দ শামসুল হক)

আজ সেই ‘স্বর্গের ফুল মাটিতে ফোটানো’র মতো আশা-সঞ্চারি নেতা শেখ হাসিনার জন্মদিন। দুর্গম গিরি পেরিয়ে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আমাদের কান্ডারি হয়ে আশার স্বপন বুনে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে। তাই আজকের এদিন অনন্য। অসামান্য। দেশে ফিরেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে দেশকে দ্রুত ধাবিত করেছিলেন। ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে সে অভিযাত্রায় আবার ছেদ পড়ে। শুধু তাই নয়, দেশবিরোধী গোষ্ঠীগুলো তাঁকে বারবার হত্যা করতে পর্যন্ত উদ্যত হয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে ২০০৪ সালের একুশে আগস্টের পরের দিনগুলোর কথা। গ্রেনেড মেরে তাঁকে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল মানবতার শত্রুরা। নিজের নিরাপত্তাকর্মী মাহবুবকে চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে চলে যেতে দেখেছেন তিনি। দেখেছেন প্রিয় নেত্রী আইভি রহমানসহ কত নেতা-কর্মীর আত্মদান। নিজেও আহত হয়েছেন। কিন্তু তিনি দিক হারাননি। আবার ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়িয়েছেন। জেল খেটেছেন। কিন্তু মাথা নোয়াননি। এমন সংকট পাড়ি দিয়ে বন্দীশালায় বসে স্বপ্ন দেখেছেন সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের। গণতন্ত্রের মানসকন্যা তাই জাতিকে উপহার দিতে পেরেছিলেন ‘দিনবদলের সনদ’। সে সময়টায় খুব কাছে থেকে তাঁকে দেখেছি। মুখে নেই ক্লান্তি। নেই অন্যায়ভাবে তাঁকে জেলে আটকে রাখার কোনো খেদ। দেখেছি শুধু স্বপ্নভরা এক মুখ। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে সোনার বাংলায় পৌঁছে যাওয়ার অনাবিল আকুতি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ বিপুল ভোটে তাঁকে এবং তাঁর দলের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। এরপর আর তাঁকে পেছনে তাকাতে হয়নি। দিনবদলের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নেতৃত্ব তিনি দিয়ে চলেছেন দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক নিঃশঙ্কচিত্তে।

আজ তাঁর জন্মদিনে বিশেষ করে স্মরণ করতে চাই গত এক যুগ ধরে দেশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের পথে তিনি কী করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সে উপাখ্যানটি। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নীতি ভাবনায় যেমন সাধারণ মানুষের কল্যাণ ছিল কেন্দ্রে, তেমনি তাঁর কন্যার উন্নয়ন কৌশলেরও মূলে রয়েছে তাদের সামগ্রিক কল্যাণ। বঙ্গবন্ধুকন্যাও একজন আশাবাদী দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। বহুদূরের বিষয়গুলো তিনি ঠিক ঠিক দেখতে পান বর্তমানে দাঁড়িয়েই। তাই যতই দিন যাচ্ছে নানামুখী তাৎপর্যপূর্ণ নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ বঙ্গবন্ধুকন্যার শাসনামলের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। তিনি যে একজন ‘ভিশনারি’ রাষ্ট্রনায়ক তার প্রমাণ তিনি সমকালীন এই করোনা সংকটকালে বেশ ভালোভাবেই রাখছেন। বর্তমানের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে দাঁড়িয়েও তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারেন। এমন সংকটকালেও তিনি বাজেটে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ সেøাগান যুক্ত করতে পারেন। পারেন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে। পারেন ২০৪১ সাল নাগাদ পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনার সূচনা করতে। আরও পারেন শতবর্ষী ব-দ্বীপ পরিকল্পনার আলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঝুঁকিকে বাগে এনে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখতে। ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’ সে রকমই দূরদর্শী তাঁর আরেক উদ্যোগ। শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সব দেশকেই তিনি ভয়কে জয় করে এমন আগামীর পথনকশা তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন। এ সবই তিনি করছেন ব-দ্বীপ পরিকল্পনার কাঠামোর মধ্যেই। উল্লেখ্য, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে জর্জরিত বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এক পরিকল্পনা। এর মাধ্যমে নদী ভাঙন, নদীশাসন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি একটি মাটি, মানুষ ও পানির সুব্যবহারের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। যেন প্যারিস জলবায়ু বিশ্ব সম্মেলনে দেওয়া তাঁর সবুজ অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। ৩ লাখ কোটি টাকার এ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফলে বছরে আরও দেড় শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে আশা করা হচ্ছে।

গত এক দশকে দূরদর্শী শেখ হাসিনা দুটো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। এখন তিনি তৃতীয় পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করছেন। অস্বীকার করার তো উপায় নেই যে অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থসামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তিনি এরই মধ্যে সুদৃঢ়ভাবে স্থাপন করে ফেলেছেন। আর তাঁর এ নয়া ধাঁচের উন্নয়ন কৌশলের মূল কথাই হচ্ছে : (১) দ্রুত প্রবৃদ্ধি, তবে তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক; (২) ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তবে প্রযুক্তিকে জানাতে হবে স্বাগত; (৩) স্বয়ম্ভর তবে অন্য খাতের সঙ্গে গড়তে হবে অংশীদারি। এ কৌশলেই তিনি ২০১০-২০২১ সালের প্রথম পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা, ২০২১-৪১ সালের দ্বিতীয় পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা, ২০১১ সাল থেকে পরপর তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং ২০১৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

জনগণ ও সরকারের উদ্ভাবনী শক্তি, রাষ্ট্রবহির্ভূত নানা খাতের অংশগ্রহণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধ উন্নয়নের এক সুদূরপ্রসারিত শক্ত পাটাতন এই ১২ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিকই গড়ে তুলেছেন। আমাদের রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন ডলারের ওপর। আমাদের বিদেশি দায়-দেনা জিডিপির মাত্র ১৩.৪ শতাংশ। আমাদের মোট দেনা জিডিপির ৩৫ শতাংশ। ভিয়েতনামের ৫৭ শতাংশ। ভারতের ৭৯ শতাংশ। জাপানের ২৩৪ শতাংশ। আর তাই আমরা বড় বড় প্রকল্প হাতে নিতে ভয় পাই না। আমরা আশান্বিত এ কারণে যে এ ধারার উন্নয়নের সুফল আমরা এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছি। কভিড-১৯ আক্রমণের আগ নাগাদ বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছিল। রপ্তানিসহ আমাদের অর্থনীতির নানা সূচকের পুনরুদ্ধারের ধারা এখন দেখার মতো। আমাদের গড় জীবনের আয়ু ৭৩ বছরের কাছাকাছি। মাছে-ভাতে বাঙালি আরও বেশি স্বস্তিতে আছে। খাদ্য উৎপাদনের সব উপ খাতেই বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। অর্থনীতির এ শক্তিশালী পাটাতনের ওপর ভর করেই গড়ে উঠবে আগামীর বাংলাদেশ। ওই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু যেমনটি বলেছিলেন, ‘মায়েরা হাসবে, শিশুরা খেলবে।’ এরই মধ্যে বাংলাদেশে কৃষি অসাধ্য সাধন করেছে। আবাদি জমি কমলেও দ্রুত যন্ত্রের ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। কৃষিতে বহুমুখীকরণ ঘটেছে। মাছ, সবজি, চাল উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। ৯৫ শতাংশ জমি এখন যন্ত্রে চাষ হয়। তরুণ, শিক্ষিত কৃষক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আধুনিক মূল্য সংযোজিত কৃষি।

প্রবাসীদের আয় এ করোনাকালেও চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। নয়া কৃষিতে এ আয়ের বড় অংশ যুক্ত হচ্ছে। প্রাণিসম্পদের ব্যাপক উন্নতি চোখে পড়ার মতো। গ্রামে গ্রামে গরুর খামার গড়ে উঠেছে। এমন দুঃসময়েও সার্বিক কৃষি ৫ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে। মাছে-ভাতে বাঙালির সামনে অপার সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির চাঙাভাবের কারণে গ্রামীণ মজুরিও বাড়ছে। অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। তাই গ্রামে দারিদ্র্য কমে গেছে। করোনাকালে শহরে দারিদ্র্য খানিকটা বাড়লেও এখন আবার কমতে শুরু করেছে। আধুনিক কৃষিতে বর্গা চাষিদের অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে। গ্রামে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি বেশি স্কুল-কলেজে পড়ছে। তারা ভালো খাচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা পাচ্ছে। এ সংকটকালে গ্রাম বাংলা কর্মহীন শহরের অনেক মানুষকে কাজের সুযোগ করে দিয়েছে। এ ১২ বছরে বস্ত্র, চামড়া, সিরামিক, ওষুধ, পাট শিল্পের আশানুরূপ অগ্রগতি ঘটেছে। বিশেষ করে পাটপণ্য আমাদের অর্থনীতির নয়া শক্তিমত্তার ইঙ্গিত করছে। পরপর তিনবার ক্ষমতায় থাকার কারণে শেখ হাসিনার সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপ্লব সাধন করেছে। বিগত ১০০ বছরে যেখানে মাত্র ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে গত মাত্র ১২ বছরে এর চার গুণের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষের ঘরে এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। যেখানে গ্রিডের বিদ্যুৎ যেতে পারছে না সেখানে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছে যাচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।

একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় বস্ত্র খাতকে সবুজায়নসহ শিল্প খাতের ব্যাপক উন্নতি করা গেছে। এ প্রক্রিয়া আরও জোরদার হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আমাদের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি খাতকে আরও বেশি সবুজায়ন, রপ্তানি খাতকে বহুমুখী করা ও ইউরোপ-মার্কিন বলয়ের বাইরে নিয়ে যাওয়া, ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষি উৎপাদন দ্বিগুণ করা, দেশি বাজার আরও প্রসারিত করা, খেলাপি ঋণের দুর্বিষহ বোঝা লাঘব করে আর্থিক খাতকে স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল রাখা, ই-কমার্স/এফ-কমার্সসহ ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজার সম্প্রসারণ, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের নিয়মনীতি সহজ করা, জলবায়ু-সহনীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরও জোরদার করে কভিড-উত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে গতিময় করা। সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখার যে সংস্কৃতির ভিত্তি জাতির পিতা গড়ে দিয়ে গেছেন তাকে সম্বল করেই আমাদের বর্তমান ও আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখতে হবে।

আশার কথা, আমাদের দূরদর্শী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়নসহ আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণে এরই মধ্যে বাস্তব পরিকল্পনা গ্রহণ করে সেসব বাস্তবায়নে মনোযোগী হয়েছেন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়াসহ অবকাঠামো উন্নয়নে অভূতপূর্ব কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। এর অনেকটিই এখন দৃশ্যমান। আগামী বছর পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেল ও গাড়ি চলবে। তখন দক্ষিণ বাংলার চেহারাই বদলে যাবে। শুধু পদ্মা সেতুর কারণেই বাংলাদেশের জিডিপিতে এক থেকে দেড় শতাংশ যোগ হবে। মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্প পার্ক, সারা দেশের হাইটেক পার্কসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আমাদের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের হাবে পরিণত হতে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি-কৌশল গ্রহণে বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকার সদা-তৎপর। নিঃসন্দেহে অপরিকল্পিত নগরায়ণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা মোটেও সহজ কাজ নয়। তবে দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী গ্রামগুলোয় পরিকল্পিত আবাসস্থল গড়ে তোলা, ঢাকার আশপাশে স্মার্ট উপনগর গড়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ১০টি জেলার ১০টি গ্রামে বঙ্গবন্ধু মডেল ভিলেজ ও সমন্বিত সমবায় গড়ে তোলার যে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে তা থেকে কী করে গ্রামেও শহরের সুবিধে তৈরি করা যায় তার বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। আমরা যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সামাজিক শান্তি অক্ষুণ্ণ রেখে উপরোল্লিখিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে একাগ্রচিত্তে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যেতে পারি তাহলে নিশ্চয় ২০৪১ সাল নাগাদ সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হব।

সার্বিক জনকল্যাণের স্বার্থে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ ছাড়াও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পমূল্যে খোলা বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রয় এবং স্বল্প আয়ের পরিবারকে শুভেচ্ছা মূল্যে খাদ্যসহায়তা দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বেশ কিছু কর্মসূচি সচল রেখেছে। এর পাশাপাশি দারিদ্র্য ও আয় বৈষম্য কমানোর জন্য অতিদারিদ্র্য, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সমাজের সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অংশের দিকে লক্ষ্য রেখে গত এক দশক ধরেই নানা মাত্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা হচ্ছে। অসচ্ছল যুদ্ধাহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা, বয়স্কভাতা, স্বামীপরিত্যক্তা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, চা শ্রমিক, দরিদ্র মা, গরিব গর্ভবতী মায়েদের জন্য নানা ধরনের ভাতা ও সমর্থন দশক ধরে প্রতি বছরই বাড়ানো হয়েছে। সে কারণেই গ্রামীণ অতিদারিদ্র্যের হার কমে ১০ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে দেখেন। তিনি জানেন সমাজের নিচের তলার মানুষগুলোর আয়-রোজগার বাড়লে পুরো অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ে। বাড়ে ভোগ। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর। সে কারণেই তিনি করোনা সংকট শুরু হওয়ার পরপরই ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। মোট জিডিপির ৪.৬ শতাংশ পরিমাণের এ প্রণোদনা অর্থনীতিকে ঝিমিয়ে পড়তে দেয়নি। বরং আশপাশ দেশের চেয়ে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বেশি। কৃষি, প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি খাত আমাদের অর্থনীতির তিন সবল খুঁটি। বঙ্গবন্ধুকন্যা এ তিন খুঁটিকে আরও সংহত করতে সদা তৎপর। এসব খাতে প্রণোদনা দিতে তিনি উদার হস্ত। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো সংস্কার করার পক্ষপাতী। আর জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে তিনি বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। সিভিএফ বা ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভাপতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা লেনদেনের পক্ষে সদা সোচ্চার। ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’-এর মাধ্যমে তিনি জলবায়ুর ঝুঁকি থেকে মুক্ত হয়ে সমৃদ্ধির পথে হাঁটতে চান। সবুজ উন্নয়নের এ ‘বাংলাদেশ মডেল’কে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে এবং বিশ্বে নেতৃত্বের এক উচ্চ আসনে আসীন। করোনার পরিবেশে তাঁর এবারের জন্মদিনেও আমরা হয়তো আগের মতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে পারব না। তবে মানবতার এই নেত্রীর মানবিক চেতনার অংশীদার হতে তো বাধা নেই। তাই আসুন সৈয়দ হকের কথা ধার করে বলে উঠি- ‘জয় হোক জনকের স্বপ্নবাহু এমন কন্যার।’

 

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

সর্বশেষ খবর