শিরোনাম
সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

ভারত কর্তৃক কূটনৈতিক স্বীকৃতির তাৎপর্য

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

ভারত কর্তৃক কূটনৈতিক স্বীকৃতির তাৎপর্য

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত এবং ভুটান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান যে কত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, তা এই প্রজন্মের মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন। কিন্তু সেটি যে কত অপরিহার্য ছিল এবং আমাদের বিজয় অর্জনে এর প্রভাব কত ব্যাপক ছিল তা জেনে নেওয়া অতি আবশ্যক।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চে বাংলাদেশে পাকিস্তান কর্তৃক গণহত্যা শুরু হওয়ার পরপরই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি গোটা ভারতব্যাপী প্রবল হয়ে ওঠে। সে বছর ২৭ মার্চেই ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষ অর্থাৎ লোকসভা এবং রাজ্যসভায় বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতা নিয়ে বিষদ আলোচনাকালে পাকিস্তানিদের পৈশাচিকতার নিন্দা করে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীসহ সব দলের সদস্যরা। সেদিনই সংসদে দাবি ওঠে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের। সে দাবি ভারতীয় জনগণ এবং রাজনীতিবিদদের মনোজগতে বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন এবং পদক্ষেপের বার্তা বহন করলেও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তা ভারত কেন, কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। একটি ভূখন্ডকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদানের জন্য যা দরকার তা তখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সেই সময়ে ভারতীয় স্বীকৃতি হিতে বিপরীতই হতো।

অতঃপর সে বছরের ৩১ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী ভারতের লোকসভায় উদ্বেগ এবং নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করলে সেটিও গৃহীত হয়। সে প্রস্তাবে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশে গণহত্যার কঠোর নিন্দা ছাড়াও পূর্ববাংলার মানুষের ন্যায্য সংগ্রামে বিজয়ের আশা ব্যক্ত করা হয়। সেদিনও সংসদে জোর দাবি উঠেছিল বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদানের। মে মাসের ৮ তারিখ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় বিধান সভায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি সংবলিত প্রস্তাব তুললে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। আলোচনাকালে শ্রী জ্যোতি বসু জোরালো বক্তব্যে বলেন, দ্বিজাতি তত্ত্ব ধুয়েমুছে গেছে। ড. জয়নাল আবেদিন নামক এক সদস্য বলেন, ‘এই বিতর্ক, আলোচনার সঙ্গে আমাদের জীবন মরণ সমস্যা জড়িত, শুধু ওপার বাংলার মানুষের নয়, আমাদেরও।’ স্পিকারের অনুরোধে সব সদস্য ২ মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতার মাধ্যমে শহীদদের প্রতি সম্মান জানান।

একই বছর ৭ মে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলে সেখানেও বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের দাবি ওঠে। মুসলিম লিগ নেতা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেছিলেন, ‘সরকার এ ব্যাপারে যে কোনো ব্যবস্থাই নেন না কেন, তার প্রতি তাদের দলের সমর্থন থাকবে।’ স্বীকৃতির দাবি জানান সিপিএম, সিপিআই, ডিএমকে, আদি কংগ্রেস, পিএসপি, এমএসপি, ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপির সদস্যরা। সভায় শ্রীমতী গান্ধী বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি ভারত পূর্ণ সমর্থন জানাবে, কিন্তু বাংলাদেশকে এখনই কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া সেই দেশেরই স্বার্থের পরিপন্থী হবে।’ ৯ আগস্ট নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া গেটের জনসভায় শ্রীমতী গান্ধী বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানিরা যা ঘটাচ্ছে তা সারা বিশ্বকে মর্মাহত করেছে। তিনি বলেন, আমরা এমন সিদ্ধান্ত নেব যা বাংলাদেশের মানুষের জন্য মঙ্গলকর হবে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী একাত্তর সালের নভেম্বর মাসে লন্ডনে বাংলাদেশি এবং ভারতীয়দের এক বিরাট সভায় বক্তৃতাদানকালে বলেছিলেন, তিনি এক আগ্নেয়গিরির ওপরে বসে আছেন এবং বাংলাদেশের সমস্যা অচিরেই সমাধান প্রয়োজন। তাঁর সেই ভাষণে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদানের ইঙ্গিত ছিল। এর কিছু সময় আগে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণদানকালেও তিনি আশু স্বীকৃতির আভাস দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিব তাঁর চেয়েও অনেক বেশি জনপ্রিয়। 

আন্তর্জাতিক আইনে একটি ভূখন্ড তখনই আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিগণিত হয় যখন এটি অন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করে। স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ড, জনসংখ্যা এবং সরকার। তাই ভারত এবং ভুটানের স্বীকৃতিই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ কর্তৃক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব লাভের জন্য প্রথম অর্জন ছিল। ভারত এবং ভুটানের স্বীকৃতির সময়ও বাংলাদেশ পাকিস্তানিদের দখলমুক্ত হয়নি। তবে এই স্বীকৃতির ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে কটি বিশেষ সুবিধা পাওয়া গেছে তার মধ্যে ছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির জন্য পাকিস্তানের জন্য সুবিধাজনক মার্কিন প্রস্তাবকে সোভিয়েত ভেটোর মাধ্যমে নস্যাৎ করা, মার্কিন সপ্তম নৌবহরের আগ্রাসন রোধ করা এবং সর্বোপরি পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধ করা।

সে বছর ডিসেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব গৃহীত হলে সেটি আমাদের মুক্তির পথে পর্বততুল্য বাধা হয়ে দাঁড়াত। আর সোভিয়েত ইউনিয়নও সেদিন বলিষ্ঠভাবে মার্কিন প্রস্তাব রোধকল্পে ভেটো দিতে পেরেছিল এ জন্য যে, তখন বাংলাদেশ অন্তত দুটি দেশের স্বীকৃতি পেয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধুর বিচারের কথা ইয়াহিয়া খান আগস্ট মাসে ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হয়নি, সব প্রস্তুতিও নিয়েছিল। কিন্তু ভারত এবং ভুটানের স্বীকৃতির পর আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্ন উঠল, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভের পর বঙ্গবন্ধুকে আর পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই বিধায় পাকিস্তানে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের বিচার হতে পারে না। ভারত এবং ভুটানের স্বীকৃতি অন্যান্য দেশের স্বীকৃতি দেওয়ার দ্বার খুলে দেয়। আন্তর্জাতিক আইনে de-facto (বাস্তব) এবং de-jure (আইনি) দুই ধরনের স্বীকৃতিরই বিধান রয়েছে। তবে de-jure স্বীকৃতি না পেলে কোনো ভূখন্ড আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের মর্যাদা পায় না। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারত ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান প্রভৃতি দেশে নিশ্চিতভাবে de-facto স্বীকৃতি বিরাজ করছিল বলে সেসব দেশে বসবাসরত বাঙালিরা আন্দোলন করতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশের মিশন খুলতে পেরেছিলেন। কিন্তু de-jure স্বীকৃতি ছিল অপরিহার্য আর এটা প্রদানের ব্যাপারে ইচ্ছুক বহু দেশই অন্য দেশ কর্তৃক স্বীকৃতি দেখার অপেক্ষায় ছিল। ভারত-ভুটানের পরপরই বেশকটি দেশ স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব লাভের পাল্লা ভারী করে দেয়। এসব দেশের মধ্যে ছিল বার্মা, মঙ্গোলিয়া, পোল্যান্ড প্রভৃতি দেশ। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বীকৃতি শুধু আমাদের আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব অর্জনের দাবি জোরালোই করেনি, বরং জাতিসংঘে, কমনওয়েলথে এবং অন্যান্য বিশ্ব সংস্থায় আমাদের সদস্য পদ পাওয়ার দ্বার উন্মুক্ত করেছিল। ভারত-ভুটানের স্বীকৃতির সবচেয়ে মূল্যবান দিক ছিল এই যে, ডিসেম্বর মাসেই ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের মুক্তি সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রত্যক্ষ সমরে নেমে যায়। ভারতের স্বীকৃতি না থাকলে বিশ্ববাসী এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভারতের আগ্রাসন হিসেবেই বিবেচনা করতে পারত, যা আমাদের স্বার্থেরও পরিপন্থী হতো। কিন্তু স্বীকৃতির কারণে ভারতের পক্ষে বলা সম্ভব হয়েছে যে, সে অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য সে দেশের সৈন্যদের সঙ্গেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে গ্রহণযোগ্য। ভারতের স্বীকৃতি ছিল বলেই সে বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করানো সম্ভব হয়েছিল, আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন বিধান মতে, বিশেষ করে জেনেভা কনভেনশন মতে। স্বীকৃতি প্রদানের পূর্বে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ইউরোপ এবং আমেরিকায় বহু দেশ ভ্রমণ করে স্বীকৃতির পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টি করেন, যাতে স্বীকৃতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মন্ডলে কোনো বৈরী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়।  একই উদ্দেশ্যে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ২৫ বছরের বন্ধুত্ব চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী, ভারতের জনতা, রাজনীতিবিদ এবং সশস্র বাহিনীর অবদান ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।  সেই অর্থে ৬ ডিসেম্বর আমাদের ইতিহাসে একটি সুবর্ণ দিন হিসেবেই বেঁচে থাকবে। সেদিন ভারত এবং ভুটানের স্বীকৃতির গুরুত্ব অনুধাবন করলে এই দুই দেশের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধও বেড়ে ওঠে।

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

সর্বশেষ খবর