শিরোনাম
বুধবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০০:০০ টা

নিয়ত সব কাজের অঙ্কুর

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

নিয়ত সব কাজের অঙ্কুর

তপ্ত দুপুর। প্রচণ্ড তাপ। সীমাহীন পিপাসা। ঘাম ঝরানো পথ। শত বাধা। সব পেরিয়ে মদিনায় পৌঁছলেন রসুল (সা.)। সঙ্গে প্রাণপ্রিয় সাহাবি হজরত আবু বকর (রা.)। দূর থেকে শিশুরা দেখে গেয়ে উঠলেন ‘তালাআল বাদরু আলাই না, মিন ছানিয়াতিল বিদা।’ পরপর কয়েকদিন পথ চেয়ে থাকার পর অনেকটা ক্লান্ত হয়েই ঘরে ফিরে গিয়েছেন শহরের নারীরা। আশা ছেড়ে কাজে ফিরেছেন পুরুষরা। এর মধ্যেই মদিনার বিদা পাহাড়ের পাদদেশ দেখে উদয় হলো পূর্ণিমার চাঁদ রসুল মুহাম্মদ (সা.)। বলছিলাম রসুলের হিজরতের ঘটনা।

হিজরতের সহজ অর্থ দেশত্যাগ করা। যারা হিজরত করেন তাদের শরণার্থী বা মুহাজির বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের ঘটনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কেবল জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করে নেওয়ার অপরাধে একদল মর্দে মুমিনকে ভোগ করতে হয়েছে নির্মম যন্ত্রণা। অপরাধ না করেও মাথা পেতে নিতে হয়েছে সীমাহীন শাস্তি। কেউ মমতাময়ী মাকে ফেলে যোগ দিয়েছে ইসলামী কাফেলায়। কেউবা প্রিয়তমা স্ত্রীকে রেখে রওনা দিয়েছে মদিনার পথে। এমন ঘটনাও আছে, মায়ের কোল থেকে ছোট্ট শিশুকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে মুহাম্মদী দলে যোগ দেওয়ার অপরাধে। মা হারিয়ে, বাবা হারিয়ে, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান সব হারিয়ে মুসলমানদের ছোট্ট দলটি চড়ে বসেছে হিজরতের গাড়িতে। উদ্দেশ্য একটাই- মাবুদ রাব্বানার সন্তুষ্টি।

মুসলমানদের ওই কাফেলায় এক যুবকও ছিল। যে ছিল অন্য সবার চেয়ে আলাদা। সেও হিজরত করেছে। তবে তার নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি ছিল না। উম্মে কায়েস নামে এক সুন্দরী কুমারী নারীকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ তার। উম্মে কায়েস ছিলেন আল্লাহর খাঁটি বান্দা। পেয়ারা নবীকে ভালোবেসে ছেড়েছেন ঘর। যোগ দিয়েছেন নববী কাফেলায়। স্বাভাবিকভাবেই সবার মনে প্রশ্ন জেগেছে- এ যুবকের হিজরতের প্রতিদান কী? সবাই কষ্ট করেছে আল্লাহ, আল্লাহর রসুলের সন্তুষ্টির জন্য। আর এ যুবক কষ্ট করেছে এক নারীকে পেতে। সবার প্রতিদান আর এ যুবকের প্রতিদান যদি এক হয় তাহলে এটা তো ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।

প্রশ্নে ঘোড়া বেশি দূর ছুটতে পারেনি। এর আগেই নবীজি (সা.) তার ঐতিহাসিক ঘোষণা শুনিয়ে দিয়েছেন। বুখারি শরিফসহ অনেক হাদিস গ্রন্থ শুরুই হয়েছে এ হাদিসটি দিয়ে। জলিলে কদর সাহাবি হজরত ওমর (রা.) বলেছেন, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিয়ত সব কাজের অঙ্কুর। প্রতিটি কাজ মূল্যায়ন করা হবে তার নিয়ত বা অভিপ্রায় অনুযায়ী। কেউ যদি আল্লাহ ও তার রসুলের সন্তুষ্টির জন্য হিজরত করে, তবে সেভাবেই মূল্যায়িত হবে। আর যদি কেউ পার্থিব ধনসম্পত্তি বা কোনো নারীকে বিয়ের জন্য হিজরত করে, তবে তার মূল্যায়নও সেভাবেই হবে।’

বর্তমান বিজ্ঞাপন তথা প্রচার-প্রসারের এ যুগে হাদিসটি বারবার আলোচনা হওয়া জরুরি। লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের নেশায় আমরা যে কতভাবে নিজের সর্বনাশ করছি, দীনকে বিক্রি করছি তা আর খোলাসা করে বলার কিছু নেই। আল্লাহর রাস্তায় সময় দেওয়ার ছবি, নামাজে যাওয়ার আগে ছবি, মাহফিলের ছবি, কাবার সামনে থেকে সেলফি, রওজা শরিফ থেকে লাইভসহ আরও কতভাবে যে আমরা আমাদের ইবাদতের প্রচার প্রসার করে যাচ্ছি তা বলে শেষ করা যাবে না। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, ইবাদতকারীদের প্রতি শয়তানের একটি সূক্ষ্ম ধোঁকা এরকম, তারা নিজেদের ইবাদতের কথা মানুষের মাঝে প্রচার করে বেড়ায় এই নিয়তে যে, মানুষ তাদের দেখে উৎসাহ পাবে। কিন্তু এদের নিয়তে গন্ডগোল ধরা পড়ে যায় তখন যখন তাদের কেউ সালাম দেয় না কিংবা কেউ তাদের প্রতি মনোযোগী হয় না। তারা ভাবে আমি এত এত ভালো কাজ করি, ইবাদত করি আর আমাকে মানুষ সম্মান করে না। অথবা তার সামনে যদি কোনো বখাটে কিংবা আপাতদৃষ্টিতে গোনাহগার কেউ সম্মানিত হয় তাহলে সে নিজে সম্মানিত না হওয়ার কারণে কষ্ট পায়। ইমাম গাজ্জালি বলেন, এগুলো হলো নেক সুরতের শয়তানদের ধোঁকার উদাহরণ।

শেষ করছি রসুল (সা.) এর একটি চমৎকার হাদিস শুনিয়ে। জলিলে কদর সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের চেহারা অর্থাৎ বাহ্যিক অবয়ব কিংবা ধনসম্পদের দিকে তাকান না, তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর আর হিসাব নেবেন তোমাদের কাজের।’ (মুসলিম ও ইবনে মাজাহ) আল্লাহতায়ালা আমাদের খাঁটি নিয়তে ইবাদত করার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি

পীর সাহেব, আউলিয়ানগর

www.selimazadi.com

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর