শিরোনাম
প্রকাশ : ২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৭:২৪

শেরপুরে নার্সারি বদলে দিয়েছে হাজারো মানুষের ভাগ্য

মাসুদ হাসান বাদল, শেরপুর :

শেরপুরে নার্সারি বদলে দিয়েছে হাজারো মানুষের ভাগ্য
নার্সারিতে সবুজের সমারোহ

শেরপুর জেলা উপজেলার ভাতশালা ইউনিয়নে প্রত্যন্ত এক গ্রামের নাম বয়ড়া পরাণপুর। এই গ্রামের যে দিকে তাকানো যায় শতশত একর জমি জুড়ে ছোট-বড় অসংখ্য সবুজ গাছের মিতালি চোখে পড়ার মত। চারদিকে শুধু সবুজের সমারোহ। এখানের মানুষের বাড়িঘরগুলোও নার্সারি ঘেরা। যার সামান্য পতিত জমি আছে তিনিও ছোট্ট একটি নার্সারির মালিক। এলাকার শ’খানেক নার্সারিতে গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এসব নার্সারিতে এখন গ্রামের নারীরাই বেশি কাজ করে থাকেন। পড়ার অবসরে শিক্ষার্থীরা পড়ে থাকে নার্সারিতে। ক্ষেত তৈরি, গাছের চারা রোপন ও গাছ বিক্রিতেই সময় কাটে এখানের মানুষের। গাছের চারা বিক্রিত অর্থ দিয়ে চলে এদের জীবন-জীবিকা। 

বয়ড়া পরাণপুর গ্রামটি এখন নার্সারি গ্রাম হিসেবে ব্যাপক প্রসিদ্ধ। এখানে নার্সারির সূচনা করেন ইন্তাজ আলী(৫৫) নামে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করা এক দিনমজুর। ইন্তাজ আলীর দেখানো পথেই গ্রামের অসংখ্য মানুষ গড়ে তুলেছেন নার্সারি।  

জানা গেছে, ওই গ্রামের ইন্তাজ আলীর কিশোর বয়সেই বাবা মারা যায়। সংসারের অভাব অনটনের তাগিদে ১৯৯২ সালে তিনি গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটে একজন দৈনিক শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানের সামান্য উপার্জনে সংসারের অভাব অনটন বাড়তেই থাকে। স্ত্রী-সন্তানসহ পাঁচজনের সংসার কোনভাবেই চালাতে পারছিলেন না। এক বছর চাকরি করার পর অভাব-অনটনে বিপর্যস্ত ইন্তাজ চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন। সিদ্ধান্ত নেন পেশা পরিবর্তনের। ১৯৯৪ সালে অতি কষ্ঠে জমানো চার হাজার ৫শ’ টাকা স্বামী ইন্তাজ আলীর হাতে তুলে দেন তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম। স্ত্রীর এই টাকা দিয়েই ইন্তাজ আলীর নতুন পথ খোঁজা শুরু হয়। ওই চার হাজার টাকা দিয়ে তার বসতবাড়ির জমিতে ছোট্ট পরিসরে একটি নার্সারি গড়ে তুলেন এবং পাঁচ হাজার চারা উৎপাদন করেন। নিজের নার্সারিতে উৎপাদিত চারা গাছ নিজেই ভ্যানে ফেরি করে বাজারে-বাজারে, বাড়িতে-বাড়িতে বিক্রি শুরু করেন। এভাবে গাছ বিক্রেতা হিসেবে ইন্তাজ আলীর ব্যাপক পরিচিতি বাড়তে থাকে। তিনি অসংখ্য মানুষকে গাছ লাগানের নিয়ম কৌশল সময় ও সুফল সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করেন। প্রথম বছর খরচ বাদে তার ১৫ হাজার টাকা লাভ হয়। এখান থেকেই ইন্তাজ আলীর এ পথ চলা। এরপর গ্রামের এক প্রতিবেশীর ২৫ শতাংশ জমি বন্দক নিয়ে নার্সারির পরিধি বাড়ান। নার্সারি ব্যবসায় পরিচিতি লাভ করার জন্য তার নার্সারির নাম দেন ‘সিদ্দিক নার্সারি’। দিনে দিনে তার পরিচিতি বাড়ে। প্রসার হয় তার নার্সারি ব্যবসার। এরপর ইন্তাজ আলীকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আর এভাবেই বয়ড়া পরাণপুর গ্রামে শুরু হয় নার্সারি ব্যবসার বিপ্লব। আর তিনি হয়ে ওঠেছেন নার্সারির মডেল। 

বয়ড়াপরাণপুর গ্রামে ইন্তাজ আলীর নার্সারিটি প্রায় দুই একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে চার শতাধিক প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধি এবং ফুলের দুই লাখের বেশি চারা রয়েছে। চারা বিক্রি করে ইন্তাজ মাসে গড়ে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করেন। অর্থনৈতিকভাবে তিনি এখন স্বাবলম্বী। ১৫ শতাংশ জমিতে টিনের বড় ঘর দিয়েছেন।  স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখানে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করছেন। ইন্তাজ আলীর নার্সারি ব্যবসার সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বয়ড়া পরাণপুর গ্রামের কয়েক শ’ মানুষ এখন এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।  

ইন্তাজের অর্জন : ইন্তাজের হাত ধরে প্রতি বছর জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত বৃক্ষ মেলা, ফলদ বৃক্ষ মেলা ও কৃষিপ্রযুক্তি মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।  ২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জেলা পর্যায়ের বৃক্ষ মেলায় তিনি টানা ১৫ বছর প্রথম পুরস্কার অর্জন করেছেন। ২০১০ সালে বৃক্ষরোপণে কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে তাকে প্রথম পুরস্কার প্রদান করা হয়।  

নার্সারি ব্যবসার সফল উদ্যোক্তা ইন্তাজ আলী বয়ড়া পরাণপুর গ্রামের সব নার্সারির মালিকদের নিয়ে জেলা নার্সারি মালিক সমিতি নামে একটি সমিতি গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘদিন তিনি এ সমিতির সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে জেলা কৃষি পণ্য উৎপাদক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

বিডি-প্রতিদিন/শফিক


আপনার মন্তব্য