শিরোনাম
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর, ২০২০ ১৬:৪৬
আপডেট : ২৫ অক্টোবর, ২০২০ ১৬:৪৭

শত বছর ধরে অভাবীদের মাঝে খাবার বিতরণ করছে বগুড়ার আকবরিয়া হোটেল

আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া

শত বছর ধরে অভাবীদের মাঝে খাবার বিতরণ করছে বগুড়ার আকবরিয়া হোটেল

যখন দেশে হরতাল, অবরোধ, বন্যা হতো তখনো থেমে থাকেনি। এবার মহামারি করোনাভাইরাসের মধ্যেও থেমে থাকেনি। ঠিক নিয়ম অনুযায়ি বগুড়া শহরে মুসাফির, অভাবী, খাবারহীন, ছিন্নমূল মানুষের মুখে শতবছর ধরে একবেলা বিনামূল্যে খাবার তুলে দিয়ে যাচ্ছে আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। করোনাভাইরাসও তাদের দমিয়ে দিতে পারেনি। বরং করোনার কারণে আরো মানবিক হয়ে গোপনে অসহায়দের ঘরেও খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে বগুড়ার এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা।

বগুড়া শহরে অবস্থানরত নাম পরিচয়হীন অভাবী মানুষদের মাঝে খাবার বিতরণ করে মরহুম আকবর আলী মিঞা এক অনন্য কীর্তি স্থাপন করে গেছেন। যা শত বছরের বেশি সময় ধরে এখনও অভাবী মানুষদের মাঝে খাবার বিতরণ করে চলেছে আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আলহাজ্ব আকবর আলী মিঞা তৎকালীন ভারতের মুর্শিবাদ জেলায় জন্মগ্রহন করেন। ভাগ্য অন্বেষণে স্বপরিবারে বাংলাদেশের পাকশি, সান্তাহার এবং পরে বগুড়ায় আসেন। স্বাধীনচেতা আকবর আলী মিঞা ভাইয়ের সাথে মেকানিক এর কাজ শুরু করেন। ওই সময় বগুড়া শহরে মুসলমানদের খাবারের কোন হোটেল ছিল না। হিন্দু সম্প্রদায়ের হোটেলে আবার মুসলমানরা যেতনা। আবার হিন্দুরা তাদের হোটেলের আসবাবপত্র মুসলমানদের ছুঁতেও দিত না। এখান থেকেই তিনি হোটেল করার চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। কিন্তু হোটেল করার প্রয়োজনীয় অর্থ ছিল না। হোটেলের পূঁজির জন্য নিজে মিষ্টি তৈরী করে ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন। মিষ্টি বিক্রির কিছু পূঁজি নিয়ে ১৯১১ সালে বর্তমান শহরের চকযাদু রোডের মুখে মাসিক ৮টাকা ভাড়া দিয়ে একটি হোটেল শুরু করেন। সেখান থেকেই শুরু। বগুড়া শহরে তৎকালীন সময়ে আকবর আলীর ছোট্ট হোটেলই ছিল মুসলমানদের একমাত্র খাবার হোটেল। খুব দ্রুত হোটেলের নাম ডাক ছড়িয়ে যায়। বগুড়ায় সে সময় মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানে ক্রেতাদের স্থান সংকুলান হতো না। ক্রেতাদের কথাভেবে তিনি শহরের (বর্তমান) থানা রোডে হোটেলটি স্থানান্তর করেন। যা বর্তমানে আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল হিসেবে পরিচিতি পায়। 
চল্লিশ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত তিনি তার হোটেলে মাসিক ১৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে তিন বেলা খাবারে ব্যবস্থা করে দিতেন। সে সময় ঘী দিয়ে রান্না করা বিরিয়ানীর দাম ছিল ১টাকা প্লেট। বৃটিশ আমলে শহরে বিদ্যুৎ না থাকলেও তিনি নিজস্বভাবে জেনারেটরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে ছিলেন। এসব নানা কারনে হোটেলটির নাম ডাক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বগুড়ার সাদা সেমাইয়ের দেশব্যাপী যে কদর তার মূলেও ছিলেন আকবর আলী। সে সময় কলকাতা থেকে সেমাই আসতো বাংলাদেশে। সেমাই তৈরীর গল্প কারো জানা ছিলনা। এই অঞ্চলের মুসলমান বা সাধারণ মানুষদের অল্পদামে সেমাই খাওয়ানোর তাগিদ থেকে তিনি সেমাই তৈরী করেন এবং সফল হন। হোটেল ব্যবসায় দিন দিন ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে বলে জানাযায়। ধর্মভিরু মানুষ আকবর আলী ব্যবসায় উন্নতি এবং প্রসারে সৃষ্টিকর্তার রহমত আছে এ কথা বিশ্বাস করে যেতেন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আয়ের একটা অংশ দিয়ে প্রতিদিন রাতে গরীব, মুসাফির, ভিক্ষুক, মিসকিনদের খাওয়াতেন। তিনি সেটা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত করে গেছেন। 
১৯৭৫ সালে তিনি মৃত্যুর আগে তার পুত্রদের হোটেলের আয় থেকে মুসাফির, ভিক্ষুক, গরীবদের খাওয়ানোর কথা বলে নির্দেশ দিয়ে যান। সে কথার এতটুকু নড়চড় হয়নি আজও। পিতার শুরু করা নিয়ম মেনে তার পুত্র বা নাতিরা আজও তা পালন করে যাচ্ছেন। আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের এখন শহরেই চারটি শাখা। কবি নজরুল ইসলাম সড়কে আকবরিয়া গ্রান্ড হোটেল, ইয়াকুবিয়ার মোড়স্থ মিষ্টি মেলা, কোর্ট চত্বরে হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ও শজিমেক হাসপাতালে হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। সংযোজন করা হয়েছে, আবাসিক, বেকারী, চাইনিজ, থাই ও ফাস্ট ফুড, লাচ্ছা-সেমাই, দই, বিস্কুট। কর্মচারী রয়েছে সহস্রাধীক। আকবর আলীর সেই লাচ্ছা-সেমাই এখন বিদেশের বাজারেও বিক্রি হয়ে থাকে।
বগুড়া শহরের ভাসমান ছিন্নমুল আফাজ মিয়া (৫৬), রেহেনা (৪৮), রিক্সাচালক তোজাম উদ্দিন (৫৩) জানান, তারা বগুড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে শ্রম দিয়ে থাকে। দিনের শেষে রাতে এসে তারা আকবরিয়া হোটেলে গিয়ে খাবার খান। তাদের কেউ ২২ বছর ধরে আবার কেউ ১৮ বছর ধরে রাতের খাবার খায়।
আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে খাবার নিতে আসা ভবঘুরে বৃদ্ধ (৬৫) তিনি ভাল করে কথা বলতে না পারলেও তিনি স্মৃতি হাতড়িয়ে বলেন প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে রাতের খাবার খান। তিনি বিভিন্ন স্থানে চলে যান এবং কয়েকদিন পরপরই আকবরিয়া হোটেলের খাবার খান। 
বগুড়া স্টেশন রোডের ফুটপাতের ভিক্ষুক মোসলেমা বেওয়া জানান, সারাদিন ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে তার দিন চলে আর রাতে সে আকবরিয়া হোটেলের খাবার খেয়ে ঘুমান। রোজার সময় সে আকবরিয়া হোটেলের খাবার সেহরী হিসেবে খেয়ে রোজা রাখতেন। তিনি জানান, আকবরিয়া হোটেলে ভালমানের খাবার দিয়ে থাকেন। মাছ, মাংস, সবজি, ডাল, আলু ঘাঁটি, শাক ইত্যাদি দিয়ে ভাত দিয়ে থাকে। একেক দিন একেক ধরনের খাবার দিয়ে থাকে। তারা কোন দাম, বা শ্রমও নেন না। যত লোকই বসবে প্রত্যেককে খাবার দিয়ে থাকেন। সে খাবার কম পরে না। 
মরহুম আকবর আলী মিঞার ছোট পুত্র ও আকবরিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মোঃ হাসান আলী আলাল জানান, ১৯১১ সালে হোটেলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই হোটেলের আয় দিয়ে বাবা প্রথম দিনহীন মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বাবার সেই নিয়ম পালন করে যাওয়া হচ্ছে। এই খাবার বিতরণের জন্য প্রতিদিন এক মনেরও বেশি চাল আলাদাভাবে রান্না করে রান্নার পর বিতরণ করা হয়। রাত ১১ টা থেকে ১২টার মধ্যে হোটেলের সামনের রাস্তায় সে খাবার বিতরণ করা হয়। করোনাভাইরাস, বন্যা, হরতাল, অবরোধ বলে কোন কথা নেই। এই ছিন্নমুল মানুষগুলো আমাদের পরিবারের অংশেরমত। প্রতিদিন আমরা যা খাই তাদের জন্যও একই খাবার দেওয়া হয়। রাতে নিজের পরিবার নিয়ে খাবার মুখে দেওয়ার আগে মুসাফিরদের খাবার দেওয়া হয়েছে কিনা সে খবর নিয়ে খেতে বসেন। মূলত খাবারটি বিতরণ শুরু হয়েছিল মুসাফীরদের জন্য। কালক্রমে মুসাফীরের জায়গায় এখন দিনহীন মানুষকে খাবার দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, যে কেউ খাবার নিতে পারে।

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন


আপনার মন্তব্য