শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ অক্টোবর, ২০১৫ ২৩:০৯

এবার সাজা আতঙ্কে বিএনপি

মাহমুদ আজহার

এবার সাজা আতঙ্কে বিএনপি

দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা হচ্ছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম। ইতিমধ্যে বাদীপক্ষের ১২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ১৩তম সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা হবে আজ। প্রতি সপ্তাহেই নির্ধারিত হচ্ছে মামলার নতুন তারিখ। বাদীপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরার পরই হবে যুক্তিতর্ক। এরপর ঘোষণা করা হবে রায়। একই অবস্থা দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানেরও। তার বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রায়ও দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ঘোষিত হবে।

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জিয়া পরিবারকে সাজা দিতে সরকার উঠেপড়ে লেগেছে। উদ্দেশ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এসব মামলায় ন্যায়বিচার পেলে সবই মিথ্যা প্রমাণিত হবে। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আইনিভাবেই মামলাগুলো মোকাবিলা করছি।’ জানা যায়, শুধু খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমানই নন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম-মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, মিজানুর রহমান মিনু, বরকত উল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভীসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিচারের মুখোমুখি। বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অভিযোগ, জিয়া পরিবারসহ নেতাদের আগামী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে সরকার নানা ফাঁদ তৈরি করছে। জিয়ার আদর্শকে নির্মূল করতে নেতাদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায় সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাকে ১৩ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ অন্য নেতাদের সাজা দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কিন্তু এভাবে হামলা-মামলা কিংবা সাজা দিয়ে জিয়ার আদর্শ থেকে দূরে সরানো যাবে না। জুলুম-নির্যাতন যতই আসবে, এ সরকারের পতন ততই ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করেন নেতারা। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘সরকার বিএনপিকে ব্যস্ত রাখতেই প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন মামলায় জড়াচ্ছে। রাজনৈতিক হীন উদ্দেশে চেয়ারপারসনসহ সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেওয়া হচ্ছে। যাতে জিয়া পরিবারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সেই কৌশলই নিচ্ছে সরকার। কিন্তু তাদের এ উদ্দেশ্য সফল হবে না।’

জানা যায়, খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে করা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় আজ সাক্ষীর জেরা হবে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতে। চোখের চিকিৎসায় লন্ডনে থাকা খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেই সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম চলছে। দেশে থাকা অবস্থায় আদালতে হাজির হতে হয়েছে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট, নাইকো ও গ্যাটকো দুর্নীতি মামলাসহ ২৭টি মামলার আসামি বেগম জিয়া। ওই সব মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে চলছে বলে বিএনপির আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ছাড়াও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অন্তত ৮৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি রয়েছে দুর্নীতির মামলা। তার বিরুদ্ধে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে করা দুটি মামলা চলছে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ। এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ পর্যায়ে। যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষিত হবে। বেশ কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। জানা যায়, মানহানিসহ ৮৪টি মামলা রয়েছে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলার সংখ্যা মির্জা আব্বাসের। তার বিরুদ্ধে ৪৭টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ৩৮টি, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ৩৭টি, এম কে আনোয়ার ৩৬টি, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১৬টি, আ স ম হান্নান শাহ ১৫টি, তরিকুল ইসলাম ১২টি, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ১২টি, নজরুল ইসলাম খান ৯টি এবং ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার দুটি মামলার আসামি। দায়ের হওয়া ২৫ হাজার মামলায় সারা দেশে বিএনপির অন্তত পাঁচ লাখ নেতা-কর্মী আসামি বলেও জানানো হয় কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে। এ ছাড়া বিভিন্ন মামলায় বর্তমানে বিএনপির ১০ হাজার নেতা-কর্মী এখনো কারাগারে বলে জানা গেছে। অর্থ পাচার মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে অধিকতর শুনানির জন্য ২৮ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন আদালত। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এর বিচারক আতাউর রহমান শুনানি শেষে রবিবার এই দিন ধার্য করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ড. মোশাররফ মন্ত্রী থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করে আইন পরিপন্থী কাজ করেছেন। ওই ঘটনায় ২০১৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দুদকের পরিচালক নাসিম আনোয়ার বাদী হয়ে রমনা মডেল থানায় মামলাটি করেন। ওই বছরের ১৪ আগস্ট তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বর্তমানে কারাবন্দী রয়েছেন ড. মোশাররফ। এ প্রসঙ্গে ড. মোশাররফের ছেলে ড. খন্দকার মারুফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাবার মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিন মাসের মধ্যেই মামলার কার্যক্রম শেষ করতে নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আমরা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছি, এ ধরনের কোনো নির্দেশনা নেই। মামলায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন তারিখ ধার্য করা হচ্ছে। এতে মনে হচ্ছে, দ্রুত রায় দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। সরকার চাইলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এ মামলায় সাজাও দিতে পারে। এমনটা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য মির্জা আব্বাসের আইনজীবী এ কে এম শাহজাহান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার বেশির ভাগেরই সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। সরকার ‘তড়িঘড়ি’ করে মামলার প্রক্রিয়া শেষ করতে চাইছে। এতে সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য বোঝা যায়। ন্যায়বিচার পেলে মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে কোনো মামলাই টিকবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

 

 


আপনার মন্তব্য