শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ মার্চ, ২০১৯ ২২:১৮

স্বপ্ন ছোঁয়া সম্ভাবনায় বাংলাদেশ

সবুজ পোশাক কারখানায় এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন

রুহুল আমিন রাসেল

সবুজ পোশাক কারখানায় এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন

গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ পোশাক কারখানা গড়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। রূপকথা নয়, অবাক চোখে বিশ্ব দেখছে- এ দেশের সবুজ শিল্প বিপ্লব। বিশ্বের নাম্বার ওয়ান সবুজ পোশাকশিল্প কারখানা কিংবা, একমাত্র সবুজ নিট পোশাক কারখানা দুটোই বাংলাদেশে। ৮২টি সবুজ কারখানা স্থাপন করে তাক লাগানো বাংলাদেশের পাইপলাইনে আছে আরও তিন শতাধিক কারখানা। বিশ্বে পোশাক পণ্য রপ্তানিতেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে বাংলাদেশের এখন অবস্থান দ্বিতীয়। প্রসঙ্গত, গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ পোশাক কারখানা মূলত জ্বালানি সাশ্রয়ী ও টেকসই উৎপাদন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এ ধরনের কারখানা প্রযুক্তিনির্ভর ও খোলামেলা নিরাপদ কর্মপরিবেশের সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পায়। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার এই কারখানা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই। জানা গেছে, বহুল আলোচিত রানা প্লাজা ভবন ধসের পর পুরো বিশ্ব সরব হয় নৈতিক পোশাকশিল্প নিয়ে। দেশীয় পোশাক কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে কড়া সমালোচনার মুখে কারখানা শ্রমিকবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে বাধ্য হন দেশীয় পোশাকশিল্প মালিকরা। তারই আলোকে একে একে গড়ে উঠছে সবুজ পোশাক কারখানা। জানা গেছে, সবুজ কারখানাগুলোতে ক্রেতাদের অর্ডার বেশি থাকে। তাই কাজের চাপও বেশি। সবুজ কারখানা স্থাপনের জন্য যে ধরনের পরামর্শক প্রয়োজন, তা বাংলাদেশে নেই। শ্রীলঙ্কা ও ভারত থেকে পরামর্শক আনতে প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়। সবুজ কারখানা অনেকটা প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায়, তা পরিচালনার জন্য দক্ষ লোক নেই।

উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, সবুজ কারখানার ক্রেতারা পণ্যমূল্য বাড়তি দেন না। আবার সবুজ পোশাক কারখানা করতে বড় ধরনের অর্থ প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে কম সুদে ঋণ প্রয়োজন। সবুজ কারখানার করপোরেট কর ২ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ নেওয়া হয়। উদ্যোক্তাদের জন্য আরও বেশি নীতি সহায়তা প্রয়োজন। বিশ্বের একমাত্র তৈরি নিট পোশাক কারখানা প্লামি ফ্যাশন লিমিটেডের কর্ণধার হলেন ফজলুল হক। তিনি বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি-বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি। ফজলুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা হ্যাপি। বাড়তি অর্থ নিতে পারছি। তবে মূল্য ক্রেতারা আগ্রহ নিয়ে বাড়ায় না। এক্ষেত্রে দরকষাকষির বাড়তি শক্তি থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাস থাকলে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সবুজ পোশাকশিল্প কারখানার ভবিষ্যৎ ভালো দেখছি। তবে যারা ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে দুর্বল, তারাই হতাশ। শুধু টাকা খরচ করে কারখানা করলেই হবে না, ভাবমূর্তিও বাড়াতে হবে। একটি সাধারণ পোশাক কারখানার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তি অর্থ খরচ হয় সবুজ কারখানায়। এতে বড় লাভ হলো, বাংলাদেশি পোশাকশিল্পের বদনাম ঘুচে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মাত্র ২ শতাংশ করপোরেট কর অবকাশ সুবিধা যথেষ্ট নয়। সরকারের আরও নীতি সহায়তা প্রয়োজন।

পোশাকশিল্পের শীর্ষ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গ্রিন কারখানা আছে। গ্রিন প্রাইস নেই। আবার কোনো ধরনের প্রণোদনাও নেই। তারপরও বিনিয়োগ হচ্ছে। ভবিষ্যতে টেকসই কারখানার সার্টিফিকেশন যাতে নিজরাই দিতে পারি, সে জন্য নিজেদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। কারণ, সার্টিফিকেশনের জন্য প্রচুর অর্থ খরচ হয়।

বিশ্বের নাম্বার ওয়ান সবুজ পোশাকশিল্প কারখানা রেমি হোল্ডিংস লিমিটেডর কর্ণধার ও বিজিএমইএ পরিচালক মিরান আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দিন শেষে পরিবেশ ও শ্রমিকবান্ধব সবুজ কারখানা। এর পরিচালন খরচ বেশি না হলেও কারখানা স্থাপনে খরচ বেশি হয়। এই কারখানা প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় ব্লিডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম লাগবে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত খরচ নেই। এখন বিনিয়োগকারীরা উপলব্ধিতে নিয়ে সবুজ কারখানা করছেন। আর সবুজ কারখানা যত বাড়বে, তত সক্ষমতা বাড়বে। বিশ্ববাজারে অর্ডার ভালো না হলেও, সবুজ কারখানায় সবাই অর্ডার দিচ্ছেন। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশে সবুজ কারখানা হবে ৪শ’। এগুলো যখন পুরোদমে উৎপাদনমুখী হবে- তখন পোশাকশিল্পে সবুজ কারখানা গড়তে সফল বিপ্লব সম্পন্ন হবে। তার মতে, গড়ে ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে তৈরি হওয়া সবুজ কারখানায় প্রায় আড়াই হাজার পোশাক শ্রমিক কাজ করছে। জানা গেছে, সবুজ পোশাকশিল্পে বিশ্বে প্রথম স্থানে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে দাপুটে অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, আয়ারল্যান্ড ও ভিয়েতনামকে পেছনে ফেলে শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। এমনকি বিশ্বের শীর্ষ ১০টি পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাকপণ্য উৎপাদনকারী কারখানাসমূহের মধ্যে ৭টিই বাংলাদেশে স্থাপিত। এখানেই শেষ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল-ইউএসজিবিসিতে নিবন্ধিত বাংলাদেশি সবুজ পোশাক কারখানার মধ্যে ৮২টি লিড সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে ২২টি প্লাটিনাম কারখানা রয়েছে। তথ্য মতে, ইউএসজিবিসিতে নিবন্ধিত আরও ৩১২টি বাংলাদেশি সবুজ পোশাক কারখানা লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডিজাইন-লিড সনদ পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। আর যে ৮২টি কারখানা এই সনদ পেয়েছে, তার মধ্যে ৯৭ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বের নাম্বার ওয়ান পোশাক কারখানার স্বীকৃতি অর্জন করেছে রেমি হোল্ডিংস লিমিটেড। ৯২ পয়েন্ট পেয়ে প্লামি ফ্যাশন লিমিটেড দ্বিতীয়, ৯০ পয়েন্ট পেয়ে ভিনট্যাগ ডেনিম স্টুডিও লিমিটেড চতুর্থ, ৮৫ পয়েন্ট পেয়ে এসকিউ সেলসিস-২ সপ্তম এবং ৮১ পয়েন্ট পেয়ে জেনেসিস ফ্যাশনস লিমিটেড দশম স্থানে রয়েছে। নানা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এ অবস্থান মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ- বাংলাদেশের মূল প্রতিযোগী দেশগুলো উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। এ অবস্থায় অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশকে বর্তমানের চেয়ে বেশি হারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এজন্য পোশাক খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে বাজার ও পণ্যে বহুমুখীকরণের ওপর নজর দেওয়ার পরামর্শ ব্যবসায়ীদের।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি- বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিশ্ব এখন প্রযুক্তিনির্ভর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ডাক দিয়েছে যা কয়েক বছর আগেই শুরু করেছে বাংলাদেশ। সবুজ পোশাকশিল্প স্থাপনে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। কিন্তু এত বেশি অর্থ খরচ করে সবুজ কারখানা প্রতিষ্ঠা করার পরও সঠিক পণ্যমূল্য দিচ্ছে না ক্রেতারা। এটা দুঃখজনক বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

বিজিএমইএর তথ্য মতে, গত সাড়ে ৫ বছরে ১ হাজার ২৫০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে নতুন এসেছে ৩০০-৩৫০ কারখানা। এসব কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর চেয়ে বেশি। বর্তমানে মোট কারখানার ১৯ শতাংশ রানা প্লাজা ধসের পর। নতুন কারখানার মধ্যে আছে ৮২টি পরিবেশবান্ধব কারখানা। এ ছাড়া ১০ বছর আগে পোশাকশিল্পে কর্মরত ছিলেন ৩৫ লাখ শ্রমিক। এখন এই শিল্পে আছেন ৪০ লাখ শ্রমিক। আবার সরকারও পোশাক খাতকে নানা ধরনের নীতি সহায়তা এবং শুল্ক ছাড় দিয়ে আসছে। সর্বশেষ রপ্তানিতে উৎসে কর দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ২৫ শতাংশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআর। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে। সবার ওপরে চীন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ছিল ১ হাজার ২৩৪ কোটি মার্কিন ডলার। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সেই রপ্তানি বেড়ে ৩ হাজার ৬১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ১০ বছরে রপ্তানি বেড়েছে ১৪৮ শতাংশ বা ২ দশমিক ৪৮ গুণ। এদিকে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রপ্তানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির শীর্ষ বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর জার্মানি সেই অবস্থান দখল করে নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এই বাজারে রপ্তানি বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। জানা গেছে- যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। নতুন নতুন ক্রেতা পোশাকের ক্রয়াদেশ নিয়ে আসছেন। পুরনো ক্রেতারাও ক্রয়াদেশ আগের চেয়ে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের রপ্তানি বাড়ছে।


আপনার মন্তব্য