Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:০৬

ভাঙা হচ্ছে বিজিএমইএ ভবন

ডিনামাইট দিয়ে ভবন উড়ানোর প্রস্তুতি, নেওয়া হবে চীনা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভাঙা হচ্ছে বিজিএমইএ ভবন
বিজিএমইএ ভবন থেকে গতকাল সরিয়ে নেওয়া হয় জিনিসপত্র। ভবন ঘিরে ফেলে পুলিশ -জয়ীতা রায়

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ভাঙা হচ্ছে আলোচিত সেই বিজিএমইএর বহুতল ভবন। এর আগে ভবন ভেঙে ফেলতে কয়েকবার সময় বেঁধে দেয় উচ্চ আদালত। তবে পোশাকশিল্পের স্বার্থ বিবেচনায় প্রতিবারই বাড়ানো হয়েছে সময়সীমা। গতকাল সকাল ৮টার দিকে ভাঙার প্রাথমিক কাজ শুরু করতে ভারী সরঞ্জামাদিসহ ভবনটির সামনে যান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কর্মকর্তারা। গত দুই দিন রাজধানীর হাতির ঝিলে অবস্থিত পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠনটির প্রধান কার্যালয়ের জিনিসপত্র সরানোর পর সেখানে যান তারা। এ সময় প্রস্তুত রাখা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য। ডিনামাইট বোমা ব্যবহার করে কন্ট্রোল ডিমোলিশন বা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ পদ্ধতিতে ভবনটি ভাঙা হবে বলেও জানানো হয়। এমনটা হলে দেশে ডিনামাইট ব্যবহার করে কোনো ভবন ভাঙার প্রথম নজির হবে এটিই। ভাঙার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভবনটি সিলগালা করে দেন রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এর আগে সকালে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বিজিএমইএর ভবনটি ভাঙতে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। তাদের সহায়তা করতে বিজিএমইএর ১৫ তলা ভবনের সামনে পুলিশসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি দিনভর লক্ষ্য করা গেছে। কড়া পাহারায় তারা মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে ৮-১০টি বুলডোজারসহ ভারী সরঞ্জামাদি নিয়ে রাজউকের কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। এ সময় ভবনের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের মালামাল সরানোর জন্য তিন দফা বাড়িয়ে গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় দেন রাজউকের কর্মকর্তারা। ভবনটির বিভিন্ন তলায় বেসরকারি ব্যাংকসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সময় চাইলে মালামাল সরাতে প্রথমে বেলা ১২টা পর্যন্ত দেওয়া হলেও তা বাড়িয়ে বিকাল ৫টা করা হয়। সর্বশেষ সময় বেঁধে দেওয়া হয় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। বেঁধে দেওয়া সময় শেষে সিলগালার আগ পর্যন্ত কোনো মালামাল আছে কি না যাচাই করতে প্রতিটি তলায় সার্চ অপারেশন শুরু করেন রাজউক কর্মকর্তারা। তবে সকালে ভাঙার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থানের পর ভবনের বিভিন্ন তলায় থাকা কার্যালয়গুলোর কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অভিযানের শুরুতে বেজমেন্টে পার্ক করে রাখা সব গাড়ি বের করে দেওয়া হয়। তখন শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়ার শর্তে কয়েকজনকে ঢুকতে দেওয়া হয়। এমনকি ব্যাংকের টাকা উত্তোলনের জন্য কেউ কেউ এলে তাদেরও ফিরিয়ে দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এরপর সকাল ১০টার দিকে বিজিএমইএ ভবনে থাকা ঢাকা ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের ভোল্টে রাখা টাকা-পয়সা সরিয়ে নিতে দুই ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এ ঘোষণার পরই ভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্রসহ লোকজন সরে যেতে শুরু করে। এর পরই ওই ভবনের সামনে জমতে থাকে উৎসুক মানুষের ভিড়। ভিড় ঠেলেই বিজিএমইএ ভবনের ভিতর থেকে মূল ফটক দিয়ে ট্রাক, পিকআপ, ভ্যানগাড়িতে করে যে যেভাবে পারেন বিভিন্ন অফিসের মালামাল দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিতে থাকেন। এদের অনেকেই অভিযোগ করেন, বিজিএমইএ ভবনে যেসব অফিস বা প্রতিষ্ঠান স্পেস ভাড়া নিয়ে কিংবা ক্রয় করে অফিস পরিচালনা করছিল, আগে থেকে তাদের কিছুই জানানো হয়নি। ব্যাংকের শাখা ছাড়াও ক্লিপটন গ্রুপ ও স্কাইলান মোটরসের অফিসও ছিল ওই ভবনে। স্কাইলান মোটরসের বারাকাত হোসেন নামে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভবন ভাঙা হবে এমন কোনো নোটিস বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ আমাদের আগে দেয়নি। হঠাৎ আজ দেখি ভবন ভাঙতে এসেছে রাজউক। আমরা আগে থেকে প্রস্তুত ছিলাম না। তবে বাধ্য হয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মালামাল সরাতে ট্রাকসহ শ্রমিকরা এসেছেন।’ রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) খন্দকার অলিউর রহমান জানান, এ ভবনের বিভিন্ন তলায় ১৯টি প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। প্রথমে এসব প্রতিষ্ঠানের মালামাল সরিয়ে নিতে বলা হয়। ভবনের অধিকাংশ মালামাল অপসারণ করা হয়েছে। আর যেসব মালামাল রয়েছে, তা নিতে হলে রাজউকে আবেদন করতে হবে। রাজউকের অনুমতি ছাড়া এখন আর এ ভবনে প্রবেশ করা যাবে না।

দুপুরে হাতির ঝিল প্রকল্পের পরিচালক রায়হানুল ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, ‘কন্ট্রোলড ডিমোলিশন বা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ পদ্ধতি ব্যবহার করেই বিজিএমইএ ভবন ভাঙা হবে। ডিনামাইট ব্যবহার করতে আমরা চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তারা ভবনটি পরিদর্শন করেছেন। সেনাবাহিনীর সহায়তা ও চীনা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ডিনামাইট দিয়েই ভবনটি ভাঙা হবে।’

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে সরকারের কাছ থেকে জমি বরাদ্দ নিয়ে হাতির ঝিলে বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ শুরু করেছিলেন দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। নির্মাণ শেষ হয় ২০০৭ সালে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন নজরে আনা হলে ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল দেয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাই কোর্ট। রায়ে ওই ভবনটিকে হাতির ঝিল প্রকল্পে ‘ক্যানসার’ বলে উল্লেখ করা হয়। এ রায় প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে ভবন ভেঙে ফেলতে নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। এর বিরুদ্ধে বিজিএমইএ আপিল করলে ২০১৬ সালের ২ জুন তা খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সর্বশেষ মুচলেকা দিয়ে এক বছরের সময় নেয় বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ। এ সময় শেষ হয় এ বছর ১২ এপ্রিল। ভাঙার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর ভবনের কার্যক্রম সরিয়ে নিতে উত্তরা তৃতীয় পর্বে ১১০ কাঠা জমির ওপর নতুন ভবন নির্মাণ শুরু করে বিজিএমইএ। ইতিমধ্যে ১৩ তলা ভবনের ছয় তলার কাজ শেষ হয়েছে। ৩ এপ্রিল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নির্মাণাধীন ভবনটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংগঠনটির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান গতকাল বিকালে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিজিএমইএ উত্তরা ভবনে আমরা কর্মকা  শুরু করেছি। পুরাতন ভবন থেকে সব মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব কিছুই করেছি আদালতের নির্দেশনা মেনে। আর যেহেতু আমরা ভবন ভাঙার কাজটি করিনি, তাই আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক এখন করণীয় নির্ধারণ করবে রাজউক।’ এদিকে ডিনামাইট দিয়ে বিজিএমইএ ভবন উড়িয়ে দিতে নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন রাজউকের নির্বাহী মাজিস্ট্রেট জেসমিন আক্তার। তিনি বলেন, ভবন থেকে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো মালামাল সরিয়ে নেয়নি তাদের কিছুটা সময় দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পরই ভবনটির গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ সব ধরনের সেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।


আপনার মন্তব্য