Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ মে, ২০১৯ ২৩:২৮

ছাত্রলীগে হচ্ছেটা কী

কমিটিতে বিতর্কিতদের নিয়ে প্রশ্ন, ক্ষুব্ধ বঞ্চিতরা, সমালোচনায় সাবেক নেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছাত্রলীগে হচ্ছেটা কী

ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই ছাত্রলীগে। কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। পদবঞ্চিতদের সংবাদ সম্মেলনে নজিরবিহীনভাবে হামলা চালানো হয়। এতে গুরুতর আহত হন ছাত্রলীগের কয়েকজন নারী নেত্রী। বিতর্কিত বেশ কয়েকজনের নাম আসার পাশাপাশি নারী নেত্রীদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ খোদ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই মধ্যে তিনি বিতর্কিতদের বাদ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে। প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশের আট ঘণ্টা পর বুধবার মধ্যরাতে সংবাদ সম্মেলন করে পদ পাওয়া ১৭ অভিযুক্তের নাম ঘোষণা করেন ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। অবশ্য বিতর্কিতদের নির্দোষ প্রমাণে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিতর্কিতদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে। এ সময় কমিটি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে থাকা নেতাদের প্রতিও হুঁশিয়ারি দেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু কাজ হয়নি। এতে পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। ছাত্রলীগের প্রকাশিত তালিকার সঙ্গে মিল রেখে পদবঞ্চিতরা আরও ৮২ জনের নামের বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তালিকা প্রকাশ করেছেন। তারা দাবি করছেন, ‘শুধু ১৭ নয়, বিতর্কিতদের তালিকা ৯৯ হবে।’ ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, সংখ্যায় ৯৯ জনকেই ‘বিতর্কিত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ওই কমিটির পদবঞ্চিতরা। আবার কমিটি গঠনে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইনকে দোষারোপ করে বললেন, তাদের অসহযোগিতায় কমিটি গঠনে দেরি হয়েছে। সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ করলেন, আমরা বার বার তাগাদা দিলেও তারা সময় দেয়নি। কমিটি গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতারা বিষয়টি অবগত। একই সঙ্গে কমিটি গঠনে তারা কোনো তালিকা দেননি বলে দাবি করেছেন। কমিটি নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং আলটিমেটাম সবকিছু মিলে ছাত্রলীগে হচ্ছে কী? এমন প্রশ্ন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী, আওয়ামী লীগসহ সব মহলে। এদিকে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা নিয়েই নয়, সারা দেশে ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে বেসামাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নিজেদের মধ্যে মারামারি, ডাক্তারদের ধর্ষণের হুমকি, নকল ধরার অপরাধে শিক্ষককে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনায় বিতর্কিত কর্মকাে র কারণে সমালোচনার ঝড় উঠছে সারা দেশে। তৃণমূলে ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড। সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. নাজিফা আনজুম নিশাতকে ধর্ষণ ও ছোরা দেখিয়ে হুমকি দিয়ে সমালোচনার ঝড় তোলেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সারোয়ার হোসেন চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে মামলা করা হলে গ্রেফতারের দেড় ঘণ্টা পরই জামিনে মুক্তি পান তিনি। ৬ মে এইচএসসি পরীক্ষায় নকলে বাধা দেওয়ায় পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মাসুদুর রহমানকে পিটিয়েছেন কলেজ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনার একটি ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীর অভিযোগ, গঠনতন্ত্রের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক খেয়ালখুশিমতো তুচ্ছ কারণে বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি ভেঙে দিচ্ছেন। ২ হাজার কোটি টাকার টেন্ডারের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আলোচনা করতে রাজি না হওয়ায় ভেঙে দেওয়া হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি- এ অভিযোগ ওই সংগঠনের সাবেক নেতাদের। আবার উপজেলা কমিটি গঠনে জেলা অনুমোদন দেওয়ার বিধান থাকলেও বর্তমান দুই নেতা উপজেলা কমিটি গঠনে বেশ মনোযোগী। গত ১৭ এপ্রিল নড়াইলে নারাগাতী উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি অনুমোদন দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এ কমিটিতে সভাপতি করা হয় বিবাহিত রিয়াজুল ইসলাম খান রিয়াজকে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের সখীপুরেও কমিটি অনুমোদন দেন কেন্দ্রীয় সভাপতি। এদিকে কমিটি গঠনের ব্যাপারে সাবেক নেতাদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ করেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। কমিটি গঠন করতে এক বছর সময় পার হলো কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রাব্বানী বলেন, ‘আমরা জাতীয় সংসদ ও ডাকসু নির্বাচন করলাম। তা ছাড়া সদ্যসাবেক নেতারা কমিটি গঠনে কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি। যে কারণে কমিটি গঠনের কাজ পিছিয়ে গেছে।’ এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা বার বার তাদের বলেছি সমন্বয় করে কমিটি গঠন করতে। কিন্তু আমাদের ডাকে সাড়া দেয়নি। যখন ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী কমিটি গঠনে আলটিমেটাম দিলেন, তখন তারা আমাদের সঙ্গে বসতে চাইলেন। আমরা তাদের সময় দিতে বলি, তারা একাধিকবার সময় দিয়েও আসেনি। কমিটি গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের চার নেতার সঙ্গে আমরা ধানমন্ডিতে দলীয় সভানেত্রীর কার্যালয়ে বসে থাকলেও তারা আসেনি। আবার এলেও চার-পাঁচ ঘণ্টা পর এসেছে। আর আমরা কোনো তালিকা জমা দিইনি। সুতরাং আমাদের সহযোগিতা পায়নি- অভিযোগটি সঠিক নয়।’ সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেন, ‘আমরা যতবার তাদের ডেকেছি, তারাই আমাদের সঙ্গে বসতে চায়নি। এককভাবে কখনো বসেনি, কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে কয়েক দফা বৈঠক করলেও তারা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর বৈঠকে হাজির হয়েছে। আমরা কোনো তালিকা দিইনি, সমন্বয় করে কমিটি করলে বিতর্কিত নামগুলো আসত না।’ এদিকে কমিটি গঠনে পদবঞ্চিত ও দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে আগের কমিটির নেতারা সকাল সকাল মধুর ক্যান্টিনে যেতেন। আবার সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। আর বর্তমান দুই নেতা বেলা ২টার পর মধুর ক্যান্টিনে যান। সে কারণে অনেক পদপ্রত্যাশী নেতা তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান না। সে কারণে পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আবার তারা কারও ফোন রিসিভ করেন না। তারা যে বাসায় থাকেন, সেখানেও নির্ধারিত কয়েকজন ছাড়া সাধারণ নেতা-কর্মীর প্রবেশ নিষেধ।

আমাদের বিশ^বিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, ছাত্রলীগের সদ্যঘোষিত ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির তিন ভাগের এক ভাগ নেতাকে ‘বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে তাদের তালিকা প্রকাশ করেছেন নতুন কমিটিতে পদবঞ্চিত নেতারা। গতকাল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মধুর ক্যন্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিতর্কিত ৯৯ জন নেতার তালিকা প্রকাশ করেন তারা। এর আগে বুধবার মধ্যরাতে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দেন, ছাত্রলীগের কমিটিতে ১৭ জন ‘বিতর্কিত’ পাওয়া গেছে। কিন্তু পদবঞ্চিতদের দাবি, এ কমিটিতে শতাধিক নেতা আছেন যারা ‘বিতর্কিত’। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সাবেক প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু বলেন, ‘৩০১ সদস্যের যে কমিটি করা হয়েছে সেখানে শতাধিক বিতর্কিত লোকের জায়গা হওয়া সত্ত্বেও আমরা দেখেছি ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মাত্র ১৭ জনের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা এদের সংগঠন থেকে বিতাড়িত করার দাবি জানাই। এরা ছাত্রলীগের টিউমার, একসময় যারা ক্যান্সারে পরিণত হবে। কোনো দাগি আসামি, মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী ও গঠনতন্ত্রবহির্ভূত ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের হতে পারে না।’ এ সময় তিনি মধুর ক্যান্টিনে হামলাকারীদের সংগঠন থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিও জানান। সংবাদ সম্মেলনে বিতর্কিতদের বাদ দিতে নির্দেশ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে কবি জসীমউদ্দীন হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাহেদ খান বলেন, ‘আমাদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত কমিটি থেকে বিতর্কিতদের সরিয়ে যোগ্যদের স্থান করে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গণমাধ্যমে ১৭ জনের নাম প্রকাশ করে তাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কর্মসূচি ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন, সুফিয়া কামাল হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফাত জাহান এশা, তানভীর হাসান সৈকত প্রমুখ।


আপনার মন্তব্য