Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:৩৮

ফিরতে চায় না রোহিঙ্গারা

প্রত্যাবাসন শুরু হলো না এবারও, শেষ কথা ‘আরা ন যাইয়ুম’, ঘরে তালা মেরে পালিয়েছেন অনেকে

জুলকার নাইন ও আয়ুবুল ইসলাম, টেকনাফ (কক্সবাজার) থেকে

ফিরতে চায় না রোহিঙ্গারা
পাঁচ দফা দাবি সম্বলিত লিফলেট বুকে নিয়ে এক রোহিঙ্গা (বামে)। আতঙ্কে অনেকে ঘরে তালা মেরে অন্যত্র সটকে পড়ে। টেকনাফের শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গতকাল তোলা ছবি -রোহেত রাজীব

ঢাকঢোল পিটিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতির পরও প্রত্যাবাসনের জন্য একজন রোহিঙ্গাকেও পাওয়া গেল না। বরং নানা মুখে নানা আঙ্গিকে বিভিন্ন ধরনের শর্তের কথা বলা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের শেষ কথা, ‘আরা ন যাইয়ুম’। টেকনাফের শালবন ক্যাম্পে যেন মুহুর্মুহ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল রোহিঙ্গাদের এই শব্দগুচ্ছ।

চীন ও মিয়ানমার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে স্বেচ্ছাপ্রত্যাবাসনের জন্য খোঁজা হলেও ক্যাম্পের বাসিন্দাদের কেউ আসেনি সেখানে। বরং তালিকায় নাম আসায় শদুয়েক রোহিঙ্গা পালিয়েছে। এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছিল। রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় তখনো কাউকেই রাখাইনে পাঠানো সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে গতকাল ৩০০ জনকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এজন্য সকাল থেকে প্রস্তুত রাখা হয় টেকনাফের কেরানতলী ও নাইক্ষ্যংছড়ি ট্রানজিট পয়েন্ট। ৫টি বাস ও ৫টি ট্রাক সকাল ৯টা থেকে রাখা হয় টেকনাফের শালবন ক্যাম্পে। উদ্দেশ্য, মিয়ানমারগামী রোহিঙ্গাদের মালপত্র বহনে এসব পরিবহন ব্যবহার। নাফ নদের কিনারে কেরানতলী প্রত্যাবাসন ঘাটে রোহিঙ্গাদের সাময়িক অবস্থানের জন্য ৩৩টি ঘর ও অন্যান্য সুবিধা প্রস্তুত রাখা হয় সকাল থেকে। মনে করা হয়, জলপথে প্রত্যাবাসন হলে এ ঘাট দিয়েই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হবে। অন্যদিকে স্থলপথে প্রত্যাবাসন হলে বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ঘাট দিয়ে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ পাঠানো হবে। শেষ হবে সকাল ৯টায়। পৌঁছে যান আরআরআরসি ও ইউএনএইচসিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও ঢাকায় চীনা দূতাবাসের দুই কূটনীতিক এবং মিয়ানমারের বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কাউন্সিলর। কিন্তু দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য কাউকে পাওয়া না যাওয়ায় স্থগিত হয় মহাযজ্ঞ। তবে তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ প্রক্রিয়া চালু রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার শুরু হওয়া সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায় গতকাল রোহিঙ্গা পরিবারগুলো ক্যাম্পের এই বিশেষ অফিসে এসেছিল। এখন পর্যন্ত গত তিন দিনে সাক্ষাৎকার দেওয়া ২৯৫ পরিবারের কেউ মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার আগ্রহ দেখায়নি। সাক্ষাৎকার দেওয়া মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, ‘আমার কাছে জানতে চাইছে, যাবা না যাবা না, বল; আমি বলেছি, নাগরিকত্ব দেওয়ার আগে কোনোভাবে যাব না। আমাদের ভিটেমাটির অধিকার দিতে হবে, যে ক্ষতি করেছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে।’

অবশ্য দুপুরে রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ফিরে না যাওয়ার বিষয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন টেকনাফ উপজেলার শালবাগান ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান বজলুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, ‘আমাদের নাগরিকত্বসহ দাবিকৃত পাঁচটি শর্ত না মানলে কিছুতেই মিয়ানমার ফিরে যাব না। আগে রাখাইনে বন্দী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাই। কারণ, মিয়ানমার সরকারকে আমরা বিশ্বাস করি না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রাখাইনে ফিরতে চাই, তবে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো রাখাইনে সৃষ্টি হয়নি। মিয়ানমার সরকার এখনো মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করছে। এ অবস্থায় রাখাইনে যাওয়া মানে পুনরায় বিপদ ডেকে আনা। তাই আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় মিয়ানমার সরকারকে চাপে ফেলে আমাদের অধিকার ও শর্তগুলো আদায় করা হোক। তাহলে আমরা মিয়ানমার ফিরে যাব।’

অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম জানান, ‘সাক্ষাৎকার দেওয়া রোহিঙ্গাদের কেউই মিয়ানমারে যাবেন না বলে জানিয়েছেন। তবে আমরা এই চলমান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখব; যাতে রোহিঙ্গারা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাদের দেশে ফিরে যান।’

তিনি আরও জানান, ‘মিয়ানমার সরকারের দেওয়া ছাড়পত্র অনুযায়ী ১ হাজার ৩৭টি পরিবারের মোট ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ফেরত নেওয়ার প্রথম তালিকাটি দেওয়া হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।’ তিনি জানান, ‘আসলে ২২ আগস্টকে টার্গেট করে প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে এ তারিখ থেকেই ফেরত পাঠানো শুরু করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। আর রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে জোর করে পাঠানো হবে না। এ ব্যাপারেও নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।’

জানা যায়, প্রত্যাবাসন তালিকায় থাকা ৩ হাজার ৪৫০ জন মূলত ১ হাজার ৩৩ পরিবারের সদস্য। তার মধ্যে যে ২৩৫ পরিবারের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়েছে, যাচাই-বাছাই করে তার মধ্য থেকে ফিরতে ইচ্ছুকদের চূড়ান্ত করার কথা ছিল।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। তাদের সঙ্গে রয়েছেন ১৯৮২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া আরও অন্তত সাড়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। সে বছরের ৬ জুন নেপিদোয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।

সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাইয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। ১৫ সদস্যের দলটি দুই দিন ধরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক করে। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তরফে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও চলাফেরায় স্বাধীনতার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর