Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:২৭

যেখানে অনিয়ম সেখানেই অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক

যেখানে অনিয়ম সেখানেই অভিযান

চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যেখানেই অনিয়ম সেখানেই অভিযান করা হবে। কে কোন দলের, কার কী পরিচয় তা দেখা হবে না। তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কোনো অপরাধ করে, সে কোন দল করে, কী করে তা আমি দেখি না। অপরাধী অপরাধীই। শুধু ঢাকাতেই নয়, যেখানেই প্রয়োজন সেখানেই ধরব।’ গতকাল বিকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে লিখিত বক্তব্যের পাশাপাশি ঘণ্টাব্যাপী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ড  প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বুয়েটের ঘটনা শুনে আমি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম আলামত সংগ্রহ করতে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে। অপরাধীদের ধরতে। ছাত্ররা নামার আগেই আমরা তৎপরতা শুরু করি। কে ছাত্রলীগ বা কী জানি না। অপরাধী অপরাধীই, অন্যায়কারীর বিচার হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার পর সেটা আনতে দেবে না কেন? হত্যাকারীদের কেউ কি এর মধ্যে আছে যে ফুটেজ প্রকাশিত হলে তাদের পরিচয় বের হয়ে যাবে? পরে তারা ফুটেজ নিয়ে এলো এবং কর্তৃপক্ষকে একটা কপি দিয়ে এলো। তিনি বলেন, আবরার একটা বাচ্চা ছেলে, তাকে পিটিয়ে পিটিয়ে মারা হলো। কী অমানবিক। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দেখেছি, সব ইনজুরি ভিতরে। তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে আমাদের নেতা-কর্মীদের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মারা হতো এমনভাবে যাতে বাইরে থেকে বোঝা যেত না।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির ক্ষমতাকালে ছাত্রদল বুয়েটে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী সাবিকুন নাহার সনিকে হত্যা করা হয়েছিল। ওই বুয়েটে আমাদের কত নেতা-কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আমরা কারও কাছে বিচার পেয়েছি? আমরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমি চেষ্টা করেছি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকেছি। তাদের বহিষ্কার করতে বলেছি, পুলিশকে বলেছি অ্যারেস্ট করতে। ছাত্র রাজনীতিতে, এই বুয়েটে আমাদের অনেক নেতা-কর্মীকেও হত্যা করা হয়েছে। কেউ কোনো দিন বলেছে, কেউ অ্যারেস্ট হয়েছে? এটা করা হয়নি। আমরা তো ব্যবস্থা নিয়েছি। তার পরও কেন আন্দোলন? কীসের জন্য? বিচার তো হবেই। আবরার হত্যায় যতরকম উচ্চ শাস্তি হওয়া প্রয়োজন তা হবে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলগুলোয় উচ্ছৃঙ্খলতা, অনিয়ম বের করতে তল্লাশি (সার্চ) চালানোর নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে বলব, যখন এই ঘটনা একটা জায়গায় ঘটেছে সেখানে এক রুম নিয়ে বসে জমিদারি চাল চালানো, তাহলে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটি হল সব জায়গায় সার্চ করা দরকার। কোথায় কী আছে না আছে খুঁজে বের করা এবং এ ধরনের কারা মস্তানি করে বেড়ায়, কারা এ ধরনের ঘটায় সেটা দেখা।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সামান্য টাকায় সিট ভাড়ায় একেকজন রুমে থাকবে আর তারপর সেখানে বসে এ ধরনের মস্তানি করবে আর সব খরচ বহন করতে হবে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা দিয়ে, তা কখনো গ্রহণযোগ্য না। সারা দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিটি হল সব জায়গায় সার্চ করা হবে এবং দেখা হবে সেই নির্দেশ দিয়ে দেব।’ তল্লাশি চালানোর ব্যাপারে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘কোথায় অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খলতার মতো কর্মকা  কারা করছে সেগুলো জানান। আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। এতে কোনো দলটল আমি বুঝি না।’

সরকারিভাবে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সামরিক শাসকরা এসেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। আর ছাত্র রাজনীতি করেই এ পর্যন্ত এসেছি। আমি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ কেন করব? তবে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। বুয়েট চাইলে তা করতে পারে, আমরা হস্তক্ষেপ করব না।’ ছাত্রলীগের রাজনীতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছাত্রলীগ সবসময় একটা আলাদা স্বাধীন সংগঠন ছিল। শুধু কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠনই মূল দলে সম্পৃক্ত। তবে হ্যাঁ, ছাত্রলীগ যেহেতু ছাত্ররা করে, তাই তাদের গাইডলাইন দেওয়ার প্রয়োজন আছে। মূল দল ছাত্রলীগকে সেই নির্দেশনা দেয়। ছাত্রদের নষ্ট পলিটিক্স চালু করেছিলেন জিয়াউর রহমান (বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা)। ছাত্রলীগ আমাদের অঙ্গসংগঠন না। এটি একটি ছাত্র সংগঠন, আলাদা একটি সংগঠন, এখনো সেভাবেই আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি ছাত্র রাজনীতি করেই এখানে এসেছি। দেশের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তা তো সেই ছাত্রজীবন থেকেই আসে। যারা উড়ে এসে বসে, তারা ক্ষমতা ভোগ করে, তাদের দেশের চিন্তা থাকে না। কিন্তু রাজনীতি তো শিক্ষার ব্যাপার, ট্রেনিংয়ের ব্যাপার। এই শিক্ষা, এই ট্রেনিং ছাত্র রাজনীতি থেকেই গড়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের সামরিক শাসকরা ছাত্রদেরও ভোগবিলাসের পথ দেখিয়ে গেছে। যে কারণে ছাত্র রাজনীতি নষ্ট হয়ে গেছে।’

ভারতে এলপিজি রপ্তানিসংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ যারা বলছে গ্যাস বিক্রি করে দিচ্ছে, বিক্রি করে দিচ্ছে, তারাই কিন্তু গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেছিল। আমরা সবসময় আমাদের নিজেদের দেশের স্বার্থটাই দেখছি। আমরা এলপিজি উৎপাদন করি না, আমরা আমদানি করা গ্যাস থেকে তাদের দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে এটা কোনো দিন হতে পারে না, এটা সবার জানা উচিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতে যে গ্যাস যাবে তা এলপিজি, প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। আমাদের দেশে উৎপাদন হয় না। রিফাইনের পর তা ব্যবহারযোগ্য হয়। এ ছাড়া আমাদের দেশে গ্যাস উত্তোলনের সময় কিছু তেল আমরা পাই, যা থেকে পেট্রোল হয়, কিছু এলপিজি হয়। দেশে এখন পাইপলাইনে গ্যাসের অভাব। এজন্য রান্নার কাজে আমদানি করে সিলিন্ডারে ভরে সরবরাহ করছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭১ সালের কথা যারা মনে রাখবেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা আমাদের একটা ঘাঁটি ছিল। সেখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করা হতো। ত্রিপুরা আমাদের শক্তি ছিল। গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে আমাদের রপ্তানি খাতে আরেকটি মাত্রা যোগ হলো।’

ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি দেওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যে পানি দিচ্ছি তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না। ভারতের রামগড়ের সাবরুম এলাকায় খাবার পানির খুব অভাব। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে। ভারতের সঙ্গে খাবার পানির চুক্তি হয়েছে। কেউ যদি পানি পান করতে চায়, আমরা যদি তা না দিই, সেটা কেমন হবে?’ তিনি বলেন, ‘ফেনী নদী খাগড়াছড়ি থেকে মাটিরাঙা হয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী নদী। ওখানকার ৪০ কিলোমিটার বাংলাদেশের অংশে, একটি অংশ সোনাগাজী হয়ে সাগরে চলে গেছে। এর বড় অংশ বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে। সীমান্তবর্তী নদীতে দুই দেশের সমান অধিকার থাকে। পদ্মা, মাতামুহুরীসহ এমন সাতটি সীমান্তবর্তী নদী আছে। আমরা আলোচনা করেছি, যৌথভাবে এসব নদী ড্রেজিং করব। আমরা এই নদী নিয়ে কাজ করছি।’

বিএনপি নেতাদের কাছে প্রশ্ন রেখে শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়া যখন ভারত গিয়েছিলেন, তখন কি তারা গঙ্গা চুক্তি করতে পেরেছিলেন? ফিরে আসার পর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেন, খালেদা জিয়া বলেছিলেন?ভুলেই গিয়েছিলাম। যে দল দেশের স্বার্থের কথা ভুলে যায়, তারা এত বড় কথা বলে কীভাবে?’ তিনি বলেন, ‘আমি জাতির পিতার কন্যা। যা কিছু করি, দেশের মানুষের কল্যাণেই করি। আমার দ্বারা দেশের মানুষের অকল্যাণ হয় এমন কোনো কাজ হবে না। কারণ এই দেশটা আমার বাবাই স্বাধীন করে দিয়েছেন।’

তিস্তা ও এনআরসি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিস্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। তিস্তা ছাড়া আরও সাতটি নদী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আসামের এনআরসি নিয়ে অসুবিধা হয়নি। এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে আমি আসামের এনআরসি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, এ পর্যন্ত অসুবিধা হয়নি, আর হওয়ারও কথা নয়। তাহলে যেখানে অসুবিধাই হয়নি, সেখানে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু দেখি না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ত্রিপুরার যোগাযোগ-সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছি। তারা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে।’

ক্যাসিনো বা জুয়ার জন্য দেশের একটি জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা প্রসঙ্গে হাসতে হাসতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা ক্যাসিনো ও জুয়া খেলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তাদের কেউ কেউ হয়তো দেশ থেকে ভেগে গেছে। এখানে সেখানে খেলার জায়গা খোঁজাখুঁজি করছে। আমি বলেছি, একটা দ্বীপমতো জায়গা খুঁজে বের কর, সে দ্বীপে আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। দরকার হলে ভাসানচর বিশাল দ্বীপ, এর একপাশে রোহিঙ্গা, আরেক পাশে এই ক্যাসিনোর ব্যবস্থা করে দেব। সবাই ওখানে চলে যাবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাস্তবতার নিরিখে বলছি, অভ্যাস যদি বদভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, এই বদভ্যাস যাবে না, বার বার খোঁজাখুঁজি করতে হবে। লাইসেন্স নিতে হবে, ট্যাক্স দিতে হবে। তারপর ওখানে গিয়ে কারা কারা করবেন করেন, আমার কোনো আপত্তি নেই।’

সাংবাদিকদের জন্য সম্প্রতি সরকার-ঘোষিত নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের ব্যাপারে সংবাদপত্র মালিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওয়েজবোর্ডের ব্যাপারে আমাদের যে দায়িত্ব ছিল তা করেছি। এখন সংবাদপত্র মালিকরা না দিলে আমরা কী করব? এটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে মালিকদেরই দায়িত্ব পালন করতে হবে। এখন এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’


আপনার মন্তব্য