প্রকাশ : শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:৩৮

পরিবহন খাতে চাঁদা বন্ধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম

সাঈদুর রহমান রিমন

রাজধানীসহ সারা দেশের পরিবহন সেক্টরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকা চাঁদাবাজির সব দৌরাত্ম্য বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বিশেষ নোটিসে পরিবহন সংশ্লিষ্ট সব মালিক সংগঠন, পরিবহন কোম্পানি, শ্রমিক সংগঠন, মালিক-শ্রমিক গ্রুপ ও ফেডারেশনের প্রতি বিশেষভাবে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এদিকে প্রশাসনিক বিভিন্ন ইউনিটও পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধসহ এ সেক্টরে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি করা চাঁদাবাজদের তালিকা হাতে নিয়ে র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবির পৃথক কয়েকটি টিম মাঠে তৎপর হতেই চাঁদাবাজদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাজধানীর টার্মিনাল, স্ট্যান্ডগুলো দাপিয়ে বেড়ানো প্রতাপশালী চাঁদাবাজদের কোথাও দেখা যাচ্ছে না। প্রশাসনিক তৎপরতায় হঠাৎ করেই তারা গা-ঢাকা দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির নেপথ্য কাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনে পর পর কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ হতেই সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এসব প্রতিবেদনে পরিবহন খাতের শীর্ষ চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করাসহ চাঁদাবাজির প্রতিটি পয়েন্ট উল্লেখ করায় তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। পাশাপাশি পরিবহন মালিক সমিতি, শ্রমিক ফেডারেশন ও ইউনিয়নগুলো জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করে চাঁদাবাজি বন্ধে নানা উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই মালিক সমিতির উদ্যোগে সব রুট কমিটি, পরিবহন কোম্পানি, নগর ও আন্তঃনগর টার্মিনাল কমিটি, শ্রমিক সংগঠন ও ফেডারেশন নেতাদের সমন্বয়ে জরুরি বৈঠক করে চাঁদাবাজি বন্ধের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি বন্ধের কঠোর নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা তদারকির জন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমন্বয়ে চারটি ভিজিলেন্স টিমও গঠন করা হয়েছে। টিমের অন্তর্ভুক্ত ২৭ জন সদস্য বিভিন্ন রুট ও টার্মিনাল এলাকায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। চাঁদাবাজি বন্ধে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত ভিজিলেন্স টিমের অন্যতম সদস্য সামদানী খন্দকার জানান, গাড়ি ছাড়ার বা গন্তব্যে পৌঁছানোর যে কোনো একটি স্থানে দায়িত্বশীল নেতার তত্ত্বাবধানে জিপি ও শ্রমিক কল্যাণের জন্য নামকাওয়াস্তের চাঁদা গ্রহণের অনুমোদন দেওয়া রয়েছে। এর বাইরে ধাপে ধাপে চাঁদাবাজির সব দৌরাত্ম্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল গাজীপুর রুটে চলাচলকারী একাধিক পরিবহনের চালক-সুপারভাইজার জানিয়েছেন, আগে টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের করতে হলেই বিভিন্ন খাতে ১৪০০ টাকা চাঁদা পরিশোধ করতে হতো। দুই দিন ধরে ৩০০ টাকা চাঁদা দিয়েই গাড়ির চাকা ঘোরানো সম্ভব হচ্ছে। এদিকে রাষ্ট্রীয় প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও পরিবহন সেক্টরের নানা পর্যায়ে দিনে কয়েক কোটি টাকা চাঁদাবাজির তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর শতাধিক পয়েন্টে এ চাঁদাবাজি এখন অপ্রতিরোধ্য রূপ নিয়েছে, সারা দেশে চাঁদাবাজির পয়েন্ট সংখ্যা প্রায় ৯০০। একশ্রেণির পরিবহন শ্রমিক, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন মহলের আশীর্বাদপুষ্টদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই চাঁদাবাজ চক্র। তাদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে যানবাহন চালক, মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে অসহায় ২০ লাখ পরিবহন শ্রমিক। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অর্ধশতাধিক চাঁদাবাজ নেতা দৈনিক হারে চাঁদার টাকা ভাগ-বণ্টন করে নেন। চাঁদার অবশিষ্ট কয়েক কোটি টাকা মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সিন্ডিকেট সদস্যরা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য নিজেদের পকেটস্থ করে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই সরকারের উচ্চ মহল থেকে পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজিসহ সব নৈরাজ্য বন্ধে বিশেষ শুদ্ধি অভিযানের সিদ্ধান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এমন তথ্য চাউর হওয়ার পর থেকেই রাজধানী ও শহরতলির বাস টার্মিনালগুলোতে র‌্যাব-পুলিশের বিশেষ তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হতেই অজানা শঙ্কায় গা-ঢাকা দিয়েছে চিহ্নিত প্রভাবশালী চাঁদাবাজরা।


আপনার মন্তব্য