শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৪০

ধর্ষণের বিচারে আইনই বাধা

নিষ্পত্তির তুলনায় সাজা কম, বিদ্যমান ধারাগুলোতে রয়েছে অনেক অস্পষ্টতা, ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধারা এখনো বহাল, দ্রুত সংশোধনে আইনজ্ঞদের অভিমত

আরাফাত মুন্না

ধর্ষণের বিচারে আইনই বাধা

দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চললেও ঘৃণ্য এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের সাজার হার খুবই কম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর ধর্ষণের মামলার নিষ্পত্তি হয় চার ভাগেরও কম। দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিচার প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ আসামিই খালাস পেয়ে যায়। জঘন্য এ অপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে মূলত আইনের দুর্বলতা ও অস্পষ্টতাই দায়ী। এ ছাড়া সাক্ষ্য আইনের বিতর্কিত ধারা এখনো বহাল থাকায় ধর্ষিতাকে ‘দুশ্চরিত্রা’ বলার সুযোগও পাচ্ছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ওই ধারা বাতিল করতে আইন কমিশনের করা সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর সমাধান করতে হবে। কঠিন সাজা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অপরাধীদের মনে ভয় ঢোকাতে পারলেই ধর্ষণের ঘটনা কমবে। জানা গেছে, অপরাধের সংখ্যা ও ভিন্নতা বাড়তে থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণের অপরাধ, বিচার ও দন্ড দেওয়ার বিষয়ে সময়োপযোগী কোনো বিশেষ আইন নেই। তার পরও বিচার পাওয়ার আশায় ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন, ২০১৪ সালের ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) আইন এবং ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কয়েকটি ধারার ওপরে নির্ভর করতে হয় বিচারপ্রার্থীদের। সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা থাকলেও সেখানে ধর্ষণের শিকার যে কোনো লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতিসত্তা বা প্রতিবন্ধিতার বিচারের বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। ভুক্তভোগীর জন্য ধর্ষকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের পর্যাপ্ত ব্যাখ্যাও নেই। ধর্ষণ মামলায় ভাষা, শ্রবণ এবং বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ, ভিকটিমের বয়স ও মানসিক স্বাস্থ্য বিবেচনায় কাউন্সেলিং সুবিধা, ভিকটিমের নিরাপত্তা, ডিএনএর নমুনা সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারণ ও রিপোর্ট প্রদানকারীর সাক্ষের বিধান, বিচারক, আইনজীবী, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মীদের জন্য আইন সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণের বিধান ও গাইডলাইনের ওপর আইনে কোনো বিধান না থাকায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ আছে। এতে বিচার বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে। ধর্ষণের বিচার ও বিচার প্রক্রিয়ায় অস্পষ্টতা থাকায় বিভিন্ন মামলার সূত্র ধরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাই কোর্ট বিভাগ এ বিষয়ে বেশকিছু রায় ও আদেশ দিয়েছে। সর্বশেষ ১৯ জানুয়ারি হাই কোর্ট পৃথক দুই রিটে বেশকিছু নির্দেশনা ও রুল জারি করেছে।

ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে : মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৩২। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ, যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী। এদিকে ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী।

নামমাত্র সাজা : বেসরকারি সংস্থা ‘নারীপক্ষ’ গবেষণার অংশ হিসেবে ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ৪ হাজার ৩৭২টি ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ৮২০, জামালপুরে ৮৭২, সিরাজগঞ্জে ৯২৫, নোয়াখালীতে ৩৭৮, ঝিনাইদহে ২৪০ ও জয়পুরহাটে ১৩৭টি ধর্ষণের মামলা হয়। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মামলার মধ্যে ৯৮৯ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছে ২৮৯ জন। আর শাস্তি দেওয়া হয়েছে মাত্র পাঁচজনকে! বিচারাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৮৯টি ধর্ষণের মামলা।

সাক্ষ্য আইনের বিতর্কিত ধারা এখনো বহাল : ধর্ষণের শিকার কোনো নারী আদালতে বিচারের সময় অভিযুক্তের কৌঁসুলি তার চরিত্র নিয়ে নানা ধরনের কটূক্তিমূলক ও আপত্তিকর প্রশ্ন করেন; যা ভিকটিমকে আদালতে বিরক্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। ভিকটিমকে মানসিকভাবে হেনস্তা করতেই এমন কৌশল নেন আসামির আইনজীবীরা। ব্রিটিশ আমলে ১৮৭২ সালে প্রণীত সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারা অনুযায়ী এই ‘দুশ্চরিত্র’ শব্দটি বলা যায়। এ ধারা বাতিল করতে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। ওই সুপারিশ আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

যা বলেন বিশেষজ্ঞরা : ধর্ষণের মতো অপরাধের তীব্রতা রোধে আইনের অস্পষ্টতা দূর করতে, ধর্ষণের বিচার ও বিচার প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিধান এবং ধর্ষণসংক্রান্ত হাই কোর্টের রায় ও আদেশগুলো একত্রকরণের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। তবে ধর্ষণের অভিযোগে যেসব মামলা হয় সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি ও অভিযুক্তের যদি দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হয়তো এটা নিরোধক হিসেবে কাজে দিতে পারে। কারণ অভিযুক্তকে যে শাস্তিই দেওয়া হোক না কেন, সেটা যেন তাড়াতাড়ি দেওয়া হয়। দ্রুত শাস্তি হলে এর প্রভাব সমাজে পড়তে বাধ্য।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনে প্রচুর দুর্বলতা রয়েছে। তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের মধ্যে কোনো সমন্বয়ও নেই।’ তিনি বলেন, ‘আইনেরও অনেক অস্পষ্টতা ও দুর্বলতা আছে। আইনের দুর্বলতার কারণেই অনেক সময় বিচারে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। এ কারণে অনেক সময়ই সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনো কখনো ভিকটিম নিজেও আর বিচার চালাতে চায় না। তাই আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।’ দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই ধর্ষণের মতো জঘন্য এ অপরাধ কমবে বলে মনে করেন তিনি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর