শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:০৮

ভালো নেই পোশাকশিল্প

নিয়ন্ত্রণহীন করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা, রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, চীনের মতো সস্তায় পণ্য আমদানির বিকল্প বাজার নেই

রুহুল আমিন রাসেল

ভালো নেই পোশাকশিল্প

চীনের করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। ব্যাপক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। জানা গেছে, ভয়াবহ চাপে পড়েছেন বাংলাদেশের পোশাকশিল্প মালিকরা। তারা সস্তায় পণ্য আমদানির বিকল্প বাজার খুঁজে পাচ্ছেন না। শুরু হয়েছে মন্দা। নিয়ন্ত্রণহীন করোনাভাইরাসে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। নতুন রপ্তানি আদেশ পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন পোশাকশিল্প মালিকরা। জানা গেছে, তৈরি পোশাকশিল্পে এখন ভয়াবহ বিপর্যয় চলছে। অসম প্রতিযোগিতায় অসহায় হয়ে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। বিশ্বব্যাপী চলছে ব্যাপক মূল্যযুদ্ধ। ক্রেতারাও যখন অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন, তখনি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনে করোনাভাইরাসের ব্যাপক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে পোশাকশিল্পে। ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এতে সরকারও উদ্বিগ্ন।

জানা গেছে, দেশের মোট আমদানির প্রায় ২৬ শতাংশই আসে চীন থেকে। রপ্তানিও কম নয়। চলমান পরিস্থিতিতে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প। এই খাতে অন্যতম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রেজা গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে শাহিদ রেজা গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত ১৫ দিন ধরে চীনে ফেব্রিক্স অর্ডার করা যাচ্ছে না। প্রতি বছরের মতো চীনের স্বাভাবিক বার্ষিক ছুটির কথা বিবেচনা করে আগেভাগেই কিছু প্রস্তুতি রাখা হয়েছিল। কিন্তু আগামী সপ্তাহে বিপদ বাড়বে চীননির্ভর পোশাকশিল্পে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করছে বাংলাদেশ। এখন সেই আমদানি কমায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন পোশাকশিল্প মালিকরা। আবার আমদানির অভাবে পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তথ্যমতে, গত ৮ বছরে চীন থেকে আমদানি বেড়েছে ৭৪৪ কোটি ডলার। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি বেড়েছে ৪৩ কোটি ডলার। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮৩ কোটি ১২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানির বিপরীতে আমদানি করা হয়েছে ১ হাজার ৩৮৫ কোটি ১১ লাখ ডলারের পণ্য। এর মধ্যে বস্ত্র খাতের সুতা ও কাপড় আমদানি হয়েছে ৪৩০ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের। আর মেশিনারি ও ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে ৩৬১ কোটি ১৪ লাখ ডলারের। পোশাক তৈরির অধিকাংশ কাঁচামাল আনা হয় চীন থেকে। তাই করোনাভাইরাসের কারণে পোশাকশিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে দেশের শীর্ষ পোশাক পণ্য রপ্তানিকারক হা-মীম গ্রুপের কর্ণধার ও ব্যবসায়ী নেতা এ কে আজাদ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চীনের করোনাভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোয় অচল অবস্থা তৈরি ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পোশাক কারখানাগুলোতে এখনই ফেব্রিক্স নেই বললেই চলে। মার্চে অনেক কারখানা রপ্তানিতে বড় ধাক্কা খাবে। অনেক ক্রেতার অর্ডার বাতিলেরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন-এফবিসিসিআইর সাবেক এই সভাপতি। এ প্রসঙ্গে মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি-বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পোশাকশিল্প ভালো যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারও ভালো না। পাকিস্তান, তুরস্ক ও প্রতিবেশী ভারত সমানতালে পোশাক পণ্যের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যেই করোনাভাইরাসের প্রভাবে আমদানিতে মন্দা শুরু হয়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এটা পোশাকশিল্পের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ চীন আমাদের কাঁচামালের বড় উৎস। ফলে সংকট অব্যাহত থাকলে আমাদের কারখানাগুলোতে কাঁচামাল সরবরাহে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে। করোনাভাইরাসের অচলাবস্থা যদি দীর্ঘায়িত হয় তাতে আমাদের গার্মেন্ট খাতের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কয়েকজন পোশাকশিল্প মালিক আলাপকালে জানিয়েছেন, ব?্যাংক ঋণে উচ্চ সুদ ও অসহযোগিতার কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে গত বছরেই বন্ধ হয়েছে অর্ধশতাধিক কারখানা। অনেক কারখানা মালিকরা ঠিকভাবে দরকষাকষি করতে পারছেন না পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে। অনেকে আবার অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে আসছে। ফলে বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতে চরম দুরবস্থা চলছে। একের পর এক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটা কিন্তু আমরা সামলাতে পারছি না।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে রপ্তানি আয়ের ধস আরও বড় হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ১ হাজার ৯৩০ কোটি ২১ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমেছে ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি দেশের তৈরি পোশাক খাত। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। একই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কমেছে ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

ইপিবির প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাত থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানি আয় এসেছিল ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক খাতে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় অর্জিত হয়েছে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় এসেছিল ১ হাজার ৭০৮ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। সে হিসাবে এ খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি তৈরি পোশাক খাত। লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় এসেছে ৮২০ কোটি ৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ কম। একই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৭৮১ কোটি ৮২ লাখ ডলার, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ কম। পাশাপাশি ১৬ দশমিক ৯২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা কমেছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর