শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:১২

বাড়িতে টাকা ও সোনার খনি

দুই ক্যাসিনো ভাইয়ের আখড়ায় ফের অভিযান, ২৬ কোটি টাকা ও বিপুল পরিমাণ সোনা জব্দ, শেষ নেই সম্পদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাড়িতে টাকা ও সোনার খনি
পুরান ঢাকার বাড়ি থেকে গতকাল উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ টাকা -জয়ীতা রায়

এবার ক্যাসিনো ব্রাদার্স এনামুল হক এনু ও রূপন ভূঁইয়ার আরও পাঁচ সিন্দুকের খোঁজ পেয়েছে র‌্যাব। পুরান ঢাকার লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ১১৯/১ নম্বর মমতাজ ভিলার দুটি ফ্ল্যাটে থাকা ওই সিন্দুকগুলো থেকে র‌্যাব নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকা জব্দ ছাড়াও সোয়া ৫ কোটি টাকার এফডিআরের বই, ১ কেজি সোনা, ৯ হাজার ২০০ ইউএস ডলার, ১৭৪ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, ৩৫০ ভারতীয় রুপি, ১ হাজার ৫৯৫ চায়নিজ ইউয়ান, ১১ হাজার ৫৬০ থাই বাথ ও ১০০ দিরহাম জব্দ করে। ১৩ জানুয়ারি এ দুই সহোদর সিআইডির (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ) হাতে গ্রেফতারের পর তাদের দফায় দফায় সিআইডি এবং দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তবে এবার র‌্যাবই আবারও পেল ক্যাসিনো ব্রাদার্সের গুপ্তধনের  সন্ধান। র‌্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, শিগগিরই হয়তো ক্যাসিনো ব্রাদার্সের আরও গুপ্তধনের সন্ধান মিলবে। এ বিষয়ে কাজ চলছে। সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় নারিন্দা বাজারের পাশে লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ওই বাড়িতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। এতে নেতৃত্ব দেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান শেষে গতকাল বেলা ১টার দিকে র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল রকিবুল হাসান জানান, ক্যাসিনোকান্ডে জড়িত দুই ভাই এনামুল হক ও রূপন ভূঁইয়ার পুরান ঢাকার ওই বাসায় রাত সাড়ে ১২টায় র‌্যাব অভিযান শুরু করে। সরু গলির ওই বাসায় পাঁচটি সিন্দুকভর্তি টাকা ও ৫ কোটি টাকার এফডিআরের বইয়ের পাশাপাশি ক্যাসিনোর সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। বাসাটি খুব ছোট আকারের। এখানে মাত্র একটি চৌকি আছে। এটি ছয়তলা ভবনের নিচতলার একটি বাসা। ধারণা করা হচ্ছে, এ বাসায় টাকা রেখে কেউ এর পাহারায় থাকতেন। তবে এখান থেকে কাউকে আটক করা যায়নি। নারিন্দা কাঁচাবাজারে চিনি ঠিকরা জামে মসজিদের পাশের গলিপথ চলে গেছে পশ্চিমে। প্রায় ১০০ গজ যেতে হাতের বাঁয়ে আরেকটি ছোট গলি। এই গলিতে ঢোকার মুখে একটি বাড়ির পরই মমতাজ ভিলা। সরেজমিন ছয়তলা ভুতুড়ে এ ভবনের সামনে গিয়ে দেখা গেল অসংখ্য উৎসুক মানুষের ভিড়। তৃতীয় তলা থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত এনু-রূপনদের আত্মীয়স্বজনই বসবাস করেন। পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকে তাদের খালাতো ভাই শিপলুর পরিবার। এনু-রূপনের গুপ্তধনের দেখভাল করতেন শিপলু। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, শিপলুকে গ্রেফতার করতে পারলে এনু-রূপনের আরও অনেক তথ্য বের করা সম্ভব। মমতাজ ভবনের সিঁড়িকোঠার ডানেই খোঁজ মেলে এনু-রূপনের টাকার সিন্দুকের। বাসায় ঢুকতেই রান্নাঘর। এক পাশে ছোট ওয়াশরুম, আরেক পাশে গ্লাসে মোড়ানো দরজা। ভিতরে কাঠের আরেক দরজা। দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতেই এক পাশে লোহা আর লেদারের সোফা। ঘরের দুই কোণে দুটি সিন্দুক। সিন্দুকের একটি ছিল টাকাভর্তি। অপরটির একটি ড্রয়ারে থাকত শুধু এনু-রূপনের ছবি, বিভিন্ন কাগজপত্র আর সিন্দুকের চাবির থোকা। কোনটা কিসের চাবি এর নামও দেওয়া আছে। কেঁচি গেট, বন্দুক গেট, সিন্দুক গেট- এমন সব নাম দেওয়া চাবির থোকায়। পাশে আরেকটি কক্ষ। এই কক্ষের ভিতরে আরেক কক্ষের দরজা। ধারণা করা হয়, এই কক্ষে এনু-রূপনের যে কোনো একজন থাকতেন। কক্ষটি এসি লাগানো। এক কোণে বড় সিন্দুক এবং শোয়ার জন্য ছোট একটি খাট। এখানে আরও দুটি সিন্দুক ছিল। অভিযানের পর সেগুলো বের করে সিঁড়িকোঠার সামনে রাখা হয়। লাগোয়া কক্ষটিতে ছোট একটি চৌকি। আরেক পাশে ফাইল ক্যাবিনেট আর ফ্রিজ রাখা। চৌকির মাথার ওপরে দেয়ালে আটকানো আরেকটি ছোট ফাইল ক্যাবিনেট। এই কক্ষ থেকে র‌্যাব সদস্যরা ক্যাসিনোর বিভিন্ন কাগজপত্র ও ফাইলপত্র জব্দ করেন। পুরো বাসাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। অভিযানে থাকা এক সদস্য বলেন, দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ২০১২ সালের মেয়াদোত্তীর্ণ কোকাকোলা পাওয়া গেছে। এতেই বোঝা যায়, এই দুটি ফ্ল্যাটে এনু-রূপন ও শিপলু ছাড়া অন্য কারও প্রবেশাধিকার ছিল না। র‌্যাব-৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়জুল ইসলাম জানিয়েছেন, ক্যাসিনোকা-ে জড়িত দুই ভাইয়ের ঢাকায় বহু ফ্ল্যাটবাড়ি রয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের ২৪টি বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তারা পুরান ঢাকার এ বাড়ির খোঁজ পান। এর পরপরই এখানে অভিযান চালিয়ে এসব সম্পদ জব্দ করা হয়। জব্দ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার কিসের বা কোথা থেকে এলো তা তদন্ত করে বের করা হবে।

আগের জব্দ ছিল ৫ কোটি টাকা ও ৮ কেজি সোনা : গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর এনামুল ও রূপনের সূত্রাপুরের মুরগিটোলা মোড়ের বাসায় এবং তাদের দুই কর্মচারীর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই অভিযানে এনু-রূপন ও তাদের দুই সহযোগীর বাসা থেকে পাঁচটি সিন্দুকভর্তি ৫ কোটির বেশি টাকা, ৮ কেজি সোনা (৭০০ ভরি) ও ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর ও ওয়ারী থানায় মোট সাতটি মামলা হয়। মামলাগুলোর মধ্যে মানি লন্ডারিং আইনের চারটি মামলার তদন্ত শুরু করে সিআইডি। এরপরই এই দুই ভাই আলোচনায় আসেন। তবে শুরু থেকেই তারা পলাতক ছিলেন। এনামুল হক এনু ও রূপন ভূঁইয়া এখন কারাগারে। ক্যাসিনো কারবারি এই দুই ভাইকে ১৩ জানুয়ারি ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, এনু ও রূপন গত ছয় থেকে সাত বছরে পুরান ঢাকায় বাড়ি কিনেছেন কমপক্ষে ১২টি। ফ্ল্যাট কিনেছেন ছয়টি। পুরনো বাড়িসহ কেনা জমিতে গড়ে তুলেছেন নতুন নতুন ভবন। এ দুই ভাইয়ের মূল পেশা ছিল জুয়া। আর বাড়ি কেনা ছিল তাদের নেশা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০১৮ সালে এনু গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ নেন। আর রূপন পান যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের পদ। তাদের পরিবারের পাঁচ সদস্য, ঘনিষ্ঠজনসহ মোট ১৭ জন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগে পদ পান। তারা সরকারি দলের এসব পদ-পদবি জুয়া ও ক্যাসিনো কারবার নির্বিঘেœ চালানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন বলে স্থানীয় লোকজন জানান। জানা গেছে, ১৯৮৫ সাল থেকেই এনামুল ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও রূপন আরামবাগ ক্লাবে জুয়া খেলতেন। একটা সময় তারা জুয়ার বোর্ডের মালিক বনে যান। সেখান থেকে আসতে থাকে কাঁচা টাকা। সেই টাকাতেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ফ্ল্যাট ও বাড়ি কেনা শুরু করেন এনু-রূপন।

সিআইডি খোঁজ পায় ২২ জমির দলিল ও ১৩০ ফ্ল্যাট : ১৩ জানুয়ারি গ্রেফতারের সময় এনামুল হক এনু ও রূপন ভূঁইয়ার কাছ থেকে নগদ ৪০ লাখ টাকা, ১২টি মোবাইল ফোন, বাড়ির দলিলপত্র এবং ব্যাংকের কাগজপত্র জব্দ করে সিআইডি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে পাঁচটি গাড়ির কাগজ এবং ৯১টি ব্যাংক হিসাবে ১৯ কোটি টাকার কাগজপত্র পাওয়া যায়। এরপর রিমান্ডে এনে এই দুই ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও ১৩০ ফ্ল্যাটের খোঁজ পায় সিআইডি। রিমান্ডে তারা ২০০০ সালের পর থেকে ১০০ ফ্ল্যাট এবং ২২টি বাড়ির মালিক হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ঢাকাতেই তাদের ছোট ছোট মাপের ৭০টি জায়গার খোঁজ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে তাদের চার বিঘা জমিরও সন্ধান মিলেছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর