শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ মার্চ, ২০২০ ২৩:৩২

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে পুকুরচুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে পুকুরচুরি

লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বড়পুকুরিয়ায় কয়লা চুরির ঘটনা ‘পুকুরচুরি’ ছাড়া আর কিছুই না। কয়লা লুণ্ঠনকারীদের আমরা দায়মুক্তি দিতে পারি না। দুর্নীতি ও জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের এ এক বড় উদাহরণ। এই চুরির ঘটনায় গোঁজামিল দিয়ে মানুষকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি  মিলনায়তনে বাংলাদেশ কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ আবুল মকসুদ এসব কথা বলেন।

ক্যাবের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অভিযোগ অনুসন্ধান ও গবেষণা কমিশন বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির কয়লা চুরির অভিযোগটি স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করে। গতকাল সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে কমিশনের সভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আমরা কমিটির পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি। সরকারও কমিটি গঠন করেছে। আমাদের কমিটি সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। যদিও রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা মজুদ রাখার কথা ছিল। কিন্তু তা মজুদ না রেখে খোলাবাজারে বিক্রি অধিক গুরুত্ব পায়। কয়লা পাচার ও জালিয়াতি হতে পারে জেনেও কখনো তা মজুদ করা হয়নি। বরং কয়লা ঘাটতিকে সিস্টেম লস গণ্য করে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লি. (বিসিএমসিএল), পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ চুরির অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়। কমিশন এ উদ্যোগকে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে করে। সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের ছয় সদস্যের কমিটির অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক এম শামসুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক বদরুল ইমাম, সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সুশান্ত কুমার দাস, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ। ক্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টন কয়লা আত্মসাৎ করা হয়েছে। আর এ কয়লা ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আত্মসাৎ করা হয়। কয়লা আত্মসাতের জন্য বিসিএমসিএল-এর সাতজন এমডিসহ ২৩ জন কর্মকর্তাই যে দায়ী তা নয়, এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডের সদস্যবৃন্দ, এর শেয়ারহোল্ডারবৃন্দ এবং পেট্রোবাংলাসহ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দের দায়িত্বে অবহেলার কারণও জড়িত। কমিশনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, উৎপাদনের শুরু থেকে ১৯ জুলাই ২০১৮ পর্যন্ত বিসিএমসিএল চুক্তিতে গ্রহণযোগ্য ৫ দশমিক ১ শতাংশ ময়েশ্চার ধরে ১০১ দশমিক ৬৬ লাখ টন কয়লার বিল পরিশোধ করে এবং এই পরিমাণ কয়লা চীনা কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে প্রাপ্ত কয়লার পরিমাণ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে কয়লায় গড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ ময়েশ্চার ছিল। এর অর্থ বিসিএমসিএল কর্তৃক গৃহীত কয়লার পরিমাণ ১০১ দশমিক ৬৬ লাখ টনের বেশি। কিন্তু ১০ দশমিক ৫ শতাংশ ময়েশ্চারে গৃহীত এই কয়লার পরিমাণের কোনো রেকর্ড নেই। কমিশনের হিসাবে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ ময়েশ্চারে বিসিএমসিএল কর্তৃক প্রাপ্ত কয়লার পরিমাণ ১০৭ দশমিক ৩১ লাখ টন। যা বিসিএমসিএল কর্তৃক রেকর্ডকৃত কয়লার চেয়ে বেশি। এ ছাড়াও সংস্থাটি কয়লা ব্যবহার ও বিক্রি করে ১০০ দশমিক ২২ লাখ মেট্রিক টন। সে অনুযায়ী ঘাটতি দেখায় ১.৪৪ লাখ টন। কিন্তু কমিশনের হিসাবে এ ঘাটতি ৭.০৯ লাখ টন। আর পেট্রোবাংলার প্রস্তাব মতে কয়লা সরবরাহে সিস্টেম লস গড়ে এক দশমিক ৫ শতাংশ অর্থাৎ এক দশমিক ৬১ লাখ টন ধরে নিলেও কয়লা ঘাটতি বা আত্মসাৎ হয়েছে পাঁচ দশমিক ৪৮ লাখ টন। আবার বিসিএমসিএলের রেকর্ড মতে বিক্রয়কৃত কয়লায় সম্পৃক্ত ময়েশ্চারের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১০ শতাংশ। অথচ সে কয়লায় ময়েশ্চার থাকে ১৫ শতাংশ। ফলে ৫ শতাংশ ময়েশ্চার হিসাবের বাইরে রেখে ভোক্তার কাছে থেকে ৫ দশমিক শূন্য ২ লাখ মেট্রিক টন কয়লার বাড়তি বিল আদায় করা হয়। ফলে ভোক্তা প্রতারিত হয়। প্রকৃতপক্ষে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লার সম্পৃক্ত ময়েশ্চারের মাত্রা ২ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু সংস্থাটি চীনা কনসোর্টিয়ামের কাছে থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশ ময়েশ্চারে কয়লা ক্রয় করে। ফলে ২ দশমিক ৮ শতাংশ অগ্রহণযোগ্য বাড়তি ময়েশ্চার কয়লায় সম্পৃক্ত থাকায় বিসিএমসিএল কনসোর্টিয়ামকে ২ দশমিক ৮৫ লাখ মেট্রিক টন কয়লার বিল বেশি দেয়। তাছাড়া কমিশনের বিবেচনায় কয়লা ক্রয় ও বিক্রয় মূল্যহার ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়।


আপনার মন্তব্য