শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ মার্চ, ২০২০ ২৩:৪৫

দুর্যোগ মোকাবিলার সাহস ও শক্তি আমাদের আছে : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার সাহস ও শক্তি বাংলাদেশের আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি সবাইকে বলব, এ অবস্থা মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষকে যেন সুরক্ষিত করতে পারি সে ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। আমরা বিজয়ী জাতি। জাতির পিতার ডাকে আমরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। আমাদের সেই সাহস, আত্মবিশ্বাস আছে। বিশ্বের অনেক দেশ আমাদের কাছ থেকে সহযোগিতা চাইছেন। আমরা তাদের সেই সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত।’ গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন তিনি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণ ও ত্রাণ তহবিলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়া আর্থিক অনুদান ও ২০ হাজার পিস পিপিই প্রদান করে বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১০ কোটি টাকার চেক তুলে দেন বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর। অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, সীমান্তরক্ষা বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ও অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে অনুদানের চেক হন্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস অনুদানের চেক গ্রহণ করেন।

গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম প্রমুখ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের কাছ থেকে করোনা সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা চায়। আমরা সেটা করব।’ অতীতের বিভিন্ন মহামারীর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শত বছর পর পর এমন একটা মহামারী পৃথিবীতে আসে। অতীতে যেহেতু প্রযুক্তির ব্যবহার এত ছিল না, কাজেই কোন দেশে, কোন অঞ্চলে, কোথায় কী ধরনের ঘটনা ঘটেছে তা জানার সুযোগ ছিল না। বর্তমানে বিশ্বটা গ্লোবাল ভিলেজ হয়ে গেছে। কোথাও একটা ঘটনা ঘটলে আমরা গণমাধ্যমের কারণে সব ঘটনাই জানতে পারি।’

তিনি বলেন, ‘চীনের উহানে যখনই এ ঘটনা ঘটেছিল তখনই আমরা সেখান থেকে আমাদের শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে এনেছি। তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল। আমরা শুধু তাদের কোয়ারেন্টাইনে রেখেই ক্ষান্ত হইনি, সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে সচেতন করা, এটা প্রতিরোধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা একটার পর একটা নিয়ে নিয়েছি। বিশেষ করে আমরা দেশের মানুষকে সচেতন রাখতে চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আমাদের উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, মানুষ যাতে আর্থিকভাবে কষ্টে না পড়ে, সেই দিকটায়ও সচেতন থেকেছি। প্রতিটি পদক্ষেপ অন্তত পরিকল্পিতভাবে, যখন যেটা প্রয়োজন হয়েছে সেটাই নিয়েছি। বলতে গেলে জানুয়ারি মাস থেকেই আমাদের পদক্ষেপগুলো চলছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা পর্যায় যখন এলো, তখন আমরা সবাইকে ছুটি দিয়েছি। কিন্তু ছুটি মানে এই না যে সবাই কাজ ছেড়ে ঘরে বসে থাকবে। যারা কাজ করতে পারবে, ঘরে বসেই কাজ করবে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কারণ এটা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়।’ তিনি বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে কিছু বিদেশি (প্রবাসী) চলে আসছিলেন। তারা আসার ফলে এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিল। কোন কোন জায়গায় দেখা দিল সে বিষয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে খোঁজ নিয়েছি। এর বিস্তার ঠেকাতে আমরা সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছি এবং তা অব্যাহত রাখছি। সবাইকে বলব, ঘর থেকে বের হয়ে ঘুরে বেড়াবেন, এটা তো হয় না।’

প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দেওয়া অনুদান সরাসরি গ্রহণ করতে না পারায় প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেন। বলেন, ‘আমি ভিডিও কনফারেন্সে আছি, আমার পক্ষ থেকে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি তা গ্রহণ করছেন। এটা আমার কাছে খারাপও লাগছে, কারণ আপনাদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা করতে পারলাম না। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে, আমি নিজেই যদি না মানি তাহলে অপরকে মানতে বলব কীভাবে? যেহেতু সবাইকে বলছি দূরত্ব বজায় রাখতে, ঘরে থাকতে।’ সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা এই সময়টাও পার করতে পারব। আমাদের শিল্প-কারখানার মালিক-শ্রমিকরা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেখানে চালাতে পারবেন। কিন্তু সেখানে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ যারা কাজ করবেন তাদের সুরক্ষিত রেখেই চালাতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কষ্টে থাকে খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর, সাধারণ নিম্নবিত্ত। অনেকেই আছেন যারা, তাদের ব্যবস্থা এমন নয় যে তারা অনেক কিছু জমিয়ে রাখতে পারবেন, দিনের পর দিন চলতে পারবেন। কর্মসংস্থান থাকার সময় তারা খেয়েপরে চলতে পারলেও বর্তমানে কিন্তু তারা সত্যি খুব কষ্টে আছেন। ইতিমধ্যে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খাদ্যশস্য আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। তা পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। পাশাপাশি ভিজিএফসহ যেসব আর্থিক সহায়তা আমরা দিয়ে থাকি তা অব্যাহত থাকবে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের কৃষকদের ফসল ফলাতে হবে। পাশাপাশি অনেকেই গ্রামে চলে গেছেন। তাদের যার যেখানে যতটুকু জমি আছে, সেটুকু জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে। যে যা পারেন ফসল ফলাবেন। কারণ বিশ্বব্যাপী যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ব্যাপকভাবে খাদ্যের অভাব দেখা দিতে পারে। আমাদের সুবিধা হলো, বাংলাদেশের মাটি উর্বর, মানুষ কর্মঠ। মাটি ও মানুষ মিলে যদি পরিশ্রম করতে পারি তাহলে আমরা নিজেদের খাদ্যের পাশাপাশি অন্যকেও সহযোগিতা করতে পারব।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানিগুলো আমরা খোলা রাখার ব্যবস্থা করেছি, যাতে ওষুধ উৎপাদনটা থাকে। পাশাপাশি পিপিই যা দরকার এর উৎপাদন শুরু হয়েছে। আরও উৎপাদন করা দরকার। আমাদের কাছ থেকে যারা সহযোগিতা চেয়েছেন তাদেরও সহযোগিতা করতে পারব। সেই সক্ষমতা আমাদের আছে। মানবিক কারণেই আমরা করব। নিজেদের পাশাপাশি অন্য দেশেরও যদি প্রয়োজন হয়, আমরা সেই দিকে দৃষ্টি দেব।’

করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর চার বার্তা : এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় পরামর্শ ও আহ্বান-সংবলিত চারটি বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সুরথ কুমার সরকার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই বার্তাগুলো প্রচারের জন্য অনুরোধ জানান।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ও বার্তাগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ : প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হবেন না। বাইরে বের হলে মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলুন। যারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে বিদেশ থেকে ফিরেছেন, তারা ১৪ দিন সম্পূর্ণ আলাদা থাকুন। ঘন ঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। হাঁচি-কাশি দিতে হলে রুমাল বা টিস্যু পেপার দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে নিন। যেখানে-সেখানে কফ-থুথু ফেলবেন না। করমর্দন বা কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন। মুসলমান ভাইয়েরা ঘরেই নামাজ আদায় করুন। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ঘরে বসে প্রার্থনা করুন। পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী এবং দেশের মানুষের জীবন রক্ষার্থে এসব পরামর্শ মেনে চলা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।

সুরক্ষা ও চিকিৎসা-সামগ্রীর ঘাটতি নেই। স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পিপিইসহ পর্যাপ্ত পরিমাণ সুরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কিট মজুদ রয়েছে। ঢাকায় চারটি স্থানে এবং চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্য ছয়টি বিভাগে করোনাভাইরাস পরীক্ষাগার স্থাপনের কাজ চলছে। কেউ গুজব ছড়াবেন না। গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রিন্স চার্লসকে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি : ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের ছেলে প্রিন্স চার্লস করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল প্রিন্স চার্লসের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব সারওয়ার-ই-আলমের পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, প্রিন্স অব ওয়েলস বাংলাদেশের একজন গভীর বন্ধু। প্রিন্স চার্লসের গতিশীল নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রিন্স চার্লসের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক  নেতৃত্বের কথাও তুলে ধরা হয় চিঠিতে। প্রধানমন্ত্রী জানান, পানি ও জলবায়ুর বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রিন্স চার্লসের প্রচারণা ও পরামর্শের জন্য তার দ্রুত আরোগ্যের অপেক্ষা করছি। চিঠিতে কভিড-১৯ এ আক্রান্ত প্রিন্স চার্লসের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী আরও লেখেন, ‘যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য আপনার দ্রুত সুস্থ হওয়া প্রয়োজন।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর