শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৩৭

দেহ আর জীবন নিয়ে মানুষের এত উদ্বেগ আকুলতা কেন

এম জে আকবর

দেহ আর জীবন নিয়ে মানুষের এত উদ্বেগ আকুলতা কেন

নাস্তিকরাই শুধু মৃত্যুতে বিশ্বাসী। আস্তিকের আস্থা অনন্তে। তার কাছে অন্ত্যেষ্টি হচ্ছে রুহ বা আত্মার স্থানান্তকরণ। এত দিন যে ছিল দুনিয়ায় এখন সে নতুন প্রকৃতির বুকে ঠাঁই নিল মাত্র।

প্রতিটি ধর্মেই অবিনশ্বর ঈশ্বর তাঁর সৃষ্ট মানবকে এক অনন্ত জীবনে স্থাপনের অঙ্গীকার করে। তাই প্রশ্ন জাগে, দেহ আর জীবন নিয়ে মানুষের কেন এত উদ্বেগ? কেন তাদের সুরক্ষার জন্য এত আকুলতা? পাহারা দিয়ে দেহ কিছু দিন হয়তো রক্ষা করা যায়; জীবন কী চিরকাল রক্ষা সম্ভব? না। তা সম্ভব নয়।

মুসলমানদের বিশ্বাস এক আল্লায়। তারা ইহলোক থেকে পরলোকে যায়। পরলোকের জীবন অসীম। ইহলোকের কৃতকর্মের বিচার শেষে মহান আল্লাহ তাদের জান্নাতে অথবা দোজখে স্থাপন করবেন। পবিত্র কোরআন শরিফের ৫০ নং সুরা ‘কাফ’। এই সুরায় ইঙ্গিত আছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানুষের বদকাজ পর্যবেক্ষণ করেন। বলা হয়েছে- ‘আমিই মানুষ সৃষ্টি করেছি। আমি জানি তার নফ্স (প্রবৃত্তি) তাকে কী পরামর্শ দেয়। আমি তার ঘাড়ের চেয়েও কাছে রয়েছি।’ দেহ নিরোগ হলে মানুষ বেপরোয়া হতে চায়। সুকৃতির প্রতি মনোযোগী হয় না। পরকালে যাওয়ার দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলে আফসোস হয়- ‘হায়! ভালো কাজ করলে তো জান্নাতে ঠাঁই পেতাম!’ সুরা কাফ-এ বলা হয়েছে, ‘জীবন সায়াহ্নে সেই সত্যই তোমার সামনে উদ্ভাসিত হবে, যা থেকে তুমি সবসময় দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখতে চেয়েছ।’ পার্সি ধর্মাবলম্বীরা মৃত্যুকে ‘শহর-ই-খামোশিয়া’ বলে থাকে। শহর-ই-খামোশিয়া মানে ‘নীরব শহর।’ আল্লাহ যখন বিচার করেন তখনই ভেঙে যায় ওই নীরবতা। পবিত্র কোরআনে বলা আছে- ‘আর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে তোমরা সম্মুখীন হবে মহাবিচার দিবসের (সুরা কাফ : আয়াত ২০)।’ আল্লাহ আরও বলেন, ‘বিচারের ফয়সালার রদবদল হবে না। আর আমার কোনো বান্দার ওপরই আমি অবিচার করি না (সুরা কাফ : আয়াত ২৯)।’ রুহকে ধারণ করে দেহ। তাই দেহকে রক্ষার জন্য এত আকুলতা। রুহ যাতে দেহ ছেড়ে না যায়, সেজন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের যত চেষ্টা-গবেষণা আর উদ্ভাবন। যে ‘ভাইরাল ফিয়ার’ এখন বিশ্বকে কামড়ে ধরেছে, তার বিরুদ্ধে মানব জাতি নানাভাবে যুদ্ধ করছে। যুদ্ধজয় থেকে আসবে নিরাপদ দেহ, নিরাপদ দেহই ধরে রাখবে প্রাণ। নইলে সে চলে যাবে অনন্তের কাছে। অনন্তের যিনি নিয়ন্ত্রক তাঁর মূল আবাস কোথায়? মুসলিমদের বিশ্বাস, তিনি আছেন সাত আসমানের ওপরে। সাত আসমান থেকে বর্ষিত তাঁর রহমতই বাঁচিয়ে রাখে দেহ। ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যেই ধ্যানমগ্ন হয়ে দেহের গুরুত্ব, জীবনের সার্থকতা, মৃত্যুর অপরিহার্যতা নিয়ে ভাবছিলাম। এই সময় ২০১৯ সালে প্রকাশিত বিল ব্রাইসন রচিত ‘দি বডি’ (দেহ) বইটির কথা মনে পড়ল। এই বই পড়তে পড়তে যে প্রশ্নে আন্দোলিত হতে হয়, তা হলো : কোনটা বেশি রহস্যময়- জীবন না দেহ?

‘বডি’তে বর্ণিত যে তথ্যগুলো খুবই চিন্তা-উদ্রেককর তার মধ্যে রয়েছে : ১. প্রতিদিন আমরা নিঃশ্বাস নিই ২০,০০০ বার, এ সময় সাড়ে ১২ হাজার লিটার বাতাসের প্রক্রিয়াকরণ ঘটে যায়। বছরে ৭০ লাখ শ্বাস গ্রহণ-বর্জন করে মানুষ। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় আমাদের শরীর ২৫ সেক্সটিলিয়ন (১-এর পর একুশটি শূন্য=১ সেক্সটিলিয়ন) অক্সিজেন কণা গ্রহণ করে। ২. নাগরিক পরিবেশে একজন মানুষ তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে দৈনিক প্রায় ২০০০ কোটি দূষণযোগ্য ধুলো ও অনান্য অনুকণা গ্রহণ করতে পারে। ফুসফুস এগুলোকে পরিষ্কার করে অথবা অভ্যন্তরীণ কৌশলে পাকস্থলিতে পাঠিয়ে দেয়। পাকস্থলির হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড সেগুলোকে গলিয়ে ফেলে। ৩. চোখ ২ লাখ থেকে ৭৫ লাখ রং চিনতে পারে এবং প্রতি সেকেন্ডে গড়ে চারবার অবাঞ্ছিত বস্তু ছুড়ে ফেলতে জানে। ৪. প্রতিটি ব্যক্তি দৈনিক ৫ থেকে ১০ আউন্স পর্যন্ত চোখের পানি তৈরি করে। ‘পাংক্টা’ নামক অতি ক্ষুদ্র গর্ত আছে চোখে। উৎপাদিত পানি পাংক্টা দিয়ে বেরিয়ে যায়। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো সময় অশ্রু ঝরতে দেখা যাওয়ার কারণ উচ্চ আবেগ-অনুভূতি চোখের পানি উপচে দেয়।

৫. আমরা প্রয়োজনে এক ট্রিলিয়ন ধরনের গন্ধ শনাক্ত করতে পারি (১-এর ডানে ১২টি শূন্য দিলে ট্রিলিয়ন হয়। দুনিয়ায় এতরকম গন্ধ আছে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কিন্তু আছে)। ৬. ব্যক্তির স্বাভাবিক আয়ুষ্কালে হৃদযন্ত্র স্পন্দিত হয় ৩৫০ কোটি বার। হৃৎপিন্ডের ওজন এক পাউন্ডেরও কম। সে রোজ শোধন করে ৬২৪০ লিটার রক্ত। ৭. গলার রোগ ‘মাম্স’ দুবার হয় না। কারণ দেহের মধ্যকার টি-সেল ধারণ করে স্মৃতি, যা ৬০ থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। এর ফলে রোগটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হয়। শুধু এ কারণেই বহু রোগ  আছে যা শুধু একবার হয়। ৮. হাঁচি দিলে যে জলকণা নির্গত হয় তা ৮ মিটার পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায় এবং ১০ মিনিট পর্যন্ত টিকে থাকে। এই জলকণাই এখন গণহারে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর হাতিয়ার। ৯. মস্তিষ্কের ৭৫ শতাংশ পানি। বাদ বাকিটা মেদ ও প্রোটিন। ৩০ সেকেন্ড গভীর নীরবতার মধ্যে থাকা মস্তিষ্ক যে পরিমাণ তথ্য সুবিন্যস্ত করে, হাব্ল স্পেস টেলিস্কোপ তা করতে পারবে ৩০ বছরে। ১০. বিশ্বে ডিজিটাল পদ্ধতিতে যত বিষয় ধরে রাখা হয়েছে তার পুরোটাই গড়পড়তা একটা ব্রেইন (মস্তিষ্ক) ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। ১১. চোখ প্রতি সেকেন্ডে ব্রেইনে ১০,০০০ কোটি বার সংকেত পাঠায়। মানুষের স্নায়ু (নার্ভ) ২৭০ মাইল গতিতে ভ্রমণ করে। আমার প্রশ্ন : কেমন করে এসব ঘটছে। অবিশ্বাস্য এ ব্যাপারগুলো ঘটে চলেছে নিছক একটা দুর্ঘটনার কারণে? বিচারক তো আমাদের ব্রেইন। সে-ই বিচার করুক।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর