শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ জুলাই, ২০২০ ২৩:৩৯

ঈদ সামনে রেখে শুধুই ঝুঁকি

পশুর হাট, পরিবহনে বাড়ি ফেরা, ফেরিঘাট সবখানে সংক্রমণ বৃদ্ধির শঙ্কা

মাহমুদ আজহার

ঈদ সামনে রেখে শুধুই ঝুঁকি
গাবতলীতে গতকাল বাড়িফেরা মানুষের ভিড় -বাংলাদেশ প্রতিদিন

আর মাত্র এক দিন পরই ঈদুল আজহা। উৎসবের ঈদে আছে প্রাণঘাতী করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির শঙ্কাও। এবারও ঈদে বাস, লঞ্চ, ট্রেন, আকাশপথসহ সব ধরনের গণপরিবহন খোলা রয়েছে। এরই মধ্যে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত ঢাকা ছাড়বে মানুষ।

এবার অতিরিক্ত সরকারি ছুটি না থাকায় ঈদের পরপরই আবারও শুরু হবে ঢাকা ফেরার প্রস্তুতি। পশু কোরবানির পাশাপাশি ঘরমুখো মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মানা নিয়ে সংশয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ঈদ ঘিরে করোনা সংক্রমণ কিছুটা বাড়তে পারে। এটা পুরোপুরি কমানো সম্ভব না হলেও সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। এ ছাড়া ঈদের পর দীর্ঘ সময় বড় কোনো উৎসব নেই। এ সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেখানে প্রয়োজন ‘মানবিক লকডাউন’ কার্যকর করতে হবে। এতে একপর্যায়ে করোনা সংক্রমণ কমতে থাকবে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও গত ২৫ জুলাই তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে এবারের ঈদুল আজহায় জনসমাগম বাতিল বা সীমিত আকারে নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ঈদে কোরবানি, যাতায়াত, ঈদগাহে নামাজ আদায়সহ জনসমাগমের বিষয়ে সংস্থাটি পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া ঈদে করোনার ঝুঁকি এড়াতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সবাইকে অনুরোধ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা। গতকাল অনলাইন ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘কোরবানির ঈদে সর্বোচ্চ সাবধান থাকুন। মৃদু উপসর্গ থাকলে করোনা পরীক্ষা করান। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে কোরবানির ঈদের ছুটিতে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গণপরিবহন খোলা থাকায় এ নির্দেশ কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গণপরিবহন খোলা থাকলে মানুষ আসা-যাওয়া বন্ধ হবে না। এতে সংক্রমণ বৃদ্ধি ঠেকানো যাবে না। ঢাকাছাড়া মানুষের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও করেন তারা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি স্বাস্থ্যবিধি জনগণকে মানাতে পারে তাহলে কিছুটা হলেও করোনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অবশ্য সরকারও ঈদযাত্রায় স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে জনসাধারণকে সতর্ক করে যাচ্ছে। কিন্তু ঘরমুখো মানুষের চাপ সামলে স্বাস্থ্যবিধির ঠিক কতটুকু রক্ষা করা যাবে, সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। করোনা সংক্রমণের আরেকটি বড় ঝুঁকি পশুর হাটের ব্যাপারেও সরকার অনুমতি দিয়েছে। অধিকাংশ পশুর হাটই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। গায়ের সঙ্গে গা মিলিয়ে মানুষ পশুর হাটে যাচ্ছে। সবাই মাস্ক ব্যবহার, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। হাট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর আরও নজরদারি বাড়ানো উচিত। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়-বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য ও জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কোরবানির পশুর কোনো কোনো হাট পরিচ্ছন্ন। বেশির ভাগ হাটই আগের মতোই স্বাভাবিক। এতে সংক্রমণ কিছুটা বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ঈদ তো আর থামিয়ে রাখা যাবে না। এখানে ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত। যেহেতু আমরা পুরোপুরি স্বাস্থ্যসচেতন নই তাই স্বাভাবিকভাবেই ঈদ ঘিরে সংক্রমণ বাড়তে পারে।’ বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক এই চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘ঈদের পর দীর্ঘ সময় বড় কোনো উৎসব নেই। এ সময় “মানবিক” লকডাউন করে করোনার সংক্রমণ কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু কোনোভাবেই শাস্তিমূলক লকডাউন কাম্য নয়। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাট, গণপরিবহন চালু থাকলে করোনা সংক্রমণ কমতে পারে। গণপরিবহনে আমরা শুরুতে দেখলাম উৎসাহের সঙ্গে তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে। এখন আগের মতোই স্বাভাবিক।’ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিএসএমএমইউর সাবেক উপপরিচালক ডা. মুখলেসুজ্জামান হিরো বলেন, ‘করোনার এ সময়ে আমরা ঈদুল আজহা উদ্যাপন করতে যাচ্ছি। এ সময়ে পশুর হাট, বাস, লঞ্চ, ট্রেনসহ গণপরিবহনে বাড়ি ফেরা ও আসায় করোনা বৃদ্ধির যথেষ্ট শঙ্কা আছে। বিশেষ করে পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিটি করপোরেশন, ইজারাদারসহ ক্রেতা-বিক্রেতাদের পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। একটি পশু থেকে আরেকটি পশুর দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। একটি গরু কেনার জন্য বেশি লোকসমাগম ঠিক হবে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে আমরা করোনা সংক্রমণ কিছুটা কমাতে পারব। একইভাবে গণপরিবহনের ক্ষেত্রে এক সিট খালি রেখে বসাতে হবে। প্রতিটি যানবাহনই যথাসম্ভব জীবাণুমক্ত করতে হবে। ওঠানামার ক্ষেত্রে যাত্রীদের মুখে মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’ জানা যায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের মানুষ যেন ঈদে অন্য জেলায় ভ্রমণ করতে না পারে সেজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর পরও গণপরিবহন চালু রাখায় ঈদে মানুষের চলাচল ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৩৫০টির বেশি যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করত বাংলাদেশ রেলওয়ে। করোনা পরিস্থিতিতে ট্রেনের সংখ্যা নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র ১৭টিতে। এসব ট্রেনে অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখা হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে রেলওয়ে প্রতিদিন যত যাত্রী পরিবহন করত, বতর্মানে তার চেয়ে পরিবহন করা হচ্ছে কয়েক গুণ কম যাত্রী। রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন, ঈদের সময়ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে না। বাড়তি কোনো ট্রেন যোগ হবে না। এদিকে বাস পরিবহন মালিকদের দাবি, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন দেশে যত বাস চলত, বর্তমানে চলছে তার মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ। এমন অবস্থায় ঈদে যাত্রীদের চাহিদার ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন তারা। বাংলাদেশ বাস-ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি ও শ্যামলী পরিবহনের মালিক রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, তারা এবার বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করছেন না। বর্তমান সময়ের মতো ঈদেও বাসের অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখা হবে। যাত্রী ও চালকদের বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলছে বাস। এ ছাড়া আকাশপথে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে এক সিট খালি রেখে ঈদযাত্রা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক মনে করেন, এবার ঈদে অন্যবারের তুলনায় সব পথেই যাত্রীর সংখ্যা কম। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা হয়তো তুলনামূলক কম সংখ্যায় বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোয় বিপুলসংখ্যক কারখানা শ্রমিক কাজ করেন, যারা ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছাড়ার চেষ্টা করছেন। এদের একটা বড় অংশ যাচ্ছেন বাসে গাদাগাদি করে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাস পরিচালনার ক্ষেত্রে এ চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এদিকে প্রতি বছর নৌপথে বাড়ি ফেরেন একটা বড় অংশ। এবারও দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মূল ভরসা নৌপথ। বর্তমান করোনাকালে লঞ্চ-স্টিমার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে গতকাল বিকালের দিকে যাত্রীর কিছুটা চাপ বাড়ে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে। তীব্র স্রোতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হলেও দৌলতদিয়া প্রান্তে যানজট দেখা যায়নি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দৌলতদিয়া প্রান্তে আসা যাত্রীরা বলেন, তীব্র স্রোত থাকায় পদ্মায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়া ছাড়া ভোগান্তি হয়নি।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশন-বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক মো. আবু আবদুল্লাহ রনি জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ১৫টি ফেরি ও ১৬টি লঞ্চ চলছে। করোনার প্রভাবে সেভাবে যাত্রীর চাপ দেখা যায়নি। তবে আগামীকাল (আজ) বিকাল ও শুক্রবার মাঝরাত পর্যন্ত দৌলতদিয়া ঘাটে যাত্রীর চাপ থাকতে পারে। রাজবাড়ী পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঈদে যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে শতাধিক পুলিশ সদস্য ঘাট এলাকায় কাজ করছেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর