বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা
বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যনীতি

দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলেই স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন

সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী

দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলেই স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন করার আগেই চিন্তা-ভাবনা করে রেখেছিলেন স্বাধীনতার পর দেশকে কীভাবে সাজাবেন। স্বাধীন বাংলাদেশের উপযোগী স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পররাষ্ট্র, শিক্ষানীতি সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’। তার পর বঙ্গবন্ধুকে ৩২ নম্বর বাসা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়।

সবারই মনে থাকা উচিত আমাদের দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৬ মে। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে চিকিৎসক তোফাজ্জল হোসেন যিনি ডা. টি হোসেন নামে পরিচিত ছিলেন, তাকে ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরের যাত্রা শুরু হয়। তিনি বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ছিলেন। তার নার্সিং হোম থেকে আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা প্রায় সবাই চিকিৎসা নিতেন। কলকাতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক বন্ধু ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতর চালু করতে চিকিৎসা পেশায় বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে একমাত্র ডা. টি হোসেনকেই পাওয়া গিয়েছিল। সেসময় ডা. টি হোসেনের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠভাবে ছিলাম। বিভিন্ন ব্যক্তি, আওয়ামী লীগ নেতাকে চিনিয়ে দিতাম। বলা চলে জাতির পিতার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হলেও খুব কম লোকই তাকে প্রথম দিকে চিনতেন।

চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা প্রদান করতে বাংলাদেশ সরকারকে বিপুল ব্যয়ের ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল। এসব কাজ করতে সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ-সংস্থানের ব্যবস্থা করে। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়েও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখেছেন এবং এ কারণে দেশের বৃহত্তর গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। আমরা জেনে থাকব পাকিস্তান আমলে চিকিৎসকরা সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পেতেন না। বঙ্গবন্ধু চিকিৎসকদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করেছিলেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যে যে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে সচিব করা দরকার জাতির পিতাই সেই ভিত্তি সূচনা করেছিলেন। যদিও এখন কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে স্বাস্থ্য সচিব করা হয় না। শ্রীলঙ্কায় আইনই আছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে স্বাস্থ্য সচিব করতে হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে কাজ পরিচালনার জন্য কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে বাছাই করে নিযুক্ত করা হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট পদমর্যাদাও দেওয়া হয়েছিল। কর্নেল হককে ডিরেক্টর জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস চাকরি করে তিনি চাকরি ছেড়ে চলে যান।

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৬০ লাখে পৌঁছানো পর্যন্ত ডা. হোসেন পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব উদ্বাস্তু শিবিরই পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। আমি কয়েকদিন পর দেশে ফিরে আসি।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের সময় ১৯৭২ সালে সারা দেশে হাসপাতাল ছিল মাত্র ৬৭টি, যা ছিল খুবই অপ্রতুল। গরিব জনগোষ্ঠী ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারত না। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বঙ্গবন্ধু সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রতি থানায় একটি করে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু সারা দেশে ৩৭৫টি থানা কমপ্লেক্স হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলামকে ডিরেক্টর জেনারেল করে পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউটে নিয়োগ দিয়ে পিজি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। যাতে ডাক্তাররা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু হোটেল শাহবাগে যারা চাকরি করতেন তাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করেছিলেন। অর্থাৎ কারোকেই চাকরিচ্যুত করেননি। মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দিয়েছিলেন। 

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনায় এসে দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালগুলোকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেছিলেন। ফলে বিশেষত গরিব মানুষ উন্নত সেবা পেতে থাকে। বাংলাদেশে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন শুরু করেন। এখন ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে দেশের মানুষ সেবা পাচ্ছে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার এসে কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা আবারও কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেন। এটাকে ট্রাস্ট গঠন করে দিয়েছেন। চাইলেই যে কেউ আর বন্ধ করতে পারবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার যে দূরদর্শী পদক্ষেপ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই ধারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলেই স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন হয়েছে।

অনুলিখন : রফিকুল ইসলাম রনি