বুধবার, ২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

ক্ষত শুকায়নি পীরগঞ্জে

সারা দেশে হামলাস্থলগুলোয় জিরো টলারেন্সে পুলিশ

নজরুল মৃধা, রংপুর

ক্ষত শুকায়নি পীরগঞ্জে

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মাঝিপাড়ায় ননী গোপালের মেয়ে বর্ষা রানী স্থানীয় হাতিবান্ধা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। রবিবার রাতে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে তাদের ঘর পুড়ে যায়। তারা আশ্রয় নিয়েছে স্থানীয় মন্দিরে। গতকাল দুপুরে তাদের বাড়িতে গেলে দেখা যায় আগুনে পোড়া স্তূপের মধ্যে বই খুঁজছে বর্ষা। আতঙ্কিত বর্ষা বলে, ‘আমার কি আর স্কুলে যাওয়া হবে না? আমি কি লেখাপড়া করতে পারব না?’ পীরগঞ্জ শাহ আবদুর রউফ কলেজের ডিগ্রি শিক্ষার্থী মুক্তা রানীও পোড়া আগুনের মধ্যে তার বই ও খাতাপত্র খুঁজছিলেন। তারও একই প্রশ্ন- এত আতঙ্ক নিয়ে কি লেখাপড়া করা যাবে? জানা যায়, স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী এক তরুণের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে দুর্বৃত্তরা রবিবার রাতে পীরগঞ্জ উপজেলার বড় করিমপুর মাঝিপাড়া গ্রামের সংখ্যালঘুদের পরিবারে হামলা চালায়। দুর্বৃত্তরা রাতের আঁধারে গ্রামের ২৮ বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ লুটপাট-ভাঙচুর করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওইসব বাড়ির ৬৬ পরিবার। ওই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লক্ষ্মী রানী গতকাল সকালে বলেন, ‘হামরা নিঃস্ব হয়্যা গেছি। থাইকপার জাগা (স্থান) নাই। এ্যালা কেমনে ঘর বানামো ভগবানে জানে।’ দুই দিন ধরে তিনি ছেলেসহ তাঁর দেবরের বাড়িতে অবস্থান করছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা আগে বাড়িত আসি জিনিসপত্র লুটা করছে। তারপর ঘরে আগুন দিয়ে সটকে পড়ে।’ ছলছল চোখে তিনি বলেন, ‘ওই সময় ভয়ে আমি বাড়ি ছাড়ি ছেলেকে নিয়া ধান খেতের ভিতর লুকিয়ে জীবন বাঁচাইচি। ভোরবেলায় ফিরে দেখি সব শেষ। শ্মশান হয়্যা গেইচে ঘরবাড়ি।’

স্থানীয় মন্দিরের বারান্দায় দুই দিন কাটিয়েছেন দুর্বৃত্তদের হামলায় আশ্রয়হীন হয়ে পড়া ভবেশ চন্দ্র, পলাশ রায়, রীতা রানীসহ অনেকে। তারা বলেন, ‘আমাদের তো সব শেষ হয়ে গেছে। সোমবার রাত থেকে বৃষ্টি পড়ায় খুব কষ্ট হয়েছে। যদিও রাতের বেলায় এক জায়গায় রান্না করে সবাইকে খাবার দেওয়া হয়েছে।’ একই ধরনের কষ্টের বর্ণনা দেন রেড ক্রিসেন্টের উদ্যোগে স্থাপিত তাঁবুতে থাকা মণীন্দ্রনাথ, সুবর্ণ চন্দ্র, রমেন চন্দ্রসহ তাঁবু ও মন্দিরের বারান্দায় থাকা লোকজন।

পীরগঞ্জের ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত - তথ্যমন্ত্রী : দুবর্ৃৃত্তের হামলার শিকার মাঝিপাড়া গতকাল সন্ধ্যায় পরিদর্শনে এসে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি বলেছেন, ‘পীরগঞ্জে হিন্দু পল্লীতে আগুন দেওয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও লুটপাটের ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। বিএনপি-জামায়াত সারা দেশে এসব ঘটিয়ে ফায়দা লুটতে চায়। বাংলাদেশ অনেক উন্নত রাষ্ট্রের থেকে জঙ্গি দমনে সফলতা দেখিয়েছে। উন্নত রাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তির পরও আমেরিকায় জঙ্গি হামলা হয়। আমাদের দেশে বিএনপি-জামায়াতের আমলে একসঙ্গে ৫০০ স্থানে হামলা হয়েছে। আমরা সে ক্ষেত্রে জঙ্গি দমনে অনেক সক্ষমতা দেখিয়েছি। সারা দেশে এসব ঘটনা যারা ঘটিয়েছে আমরা দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রতিহত করব। আমাদের দেশে কেউ সংখ্যালঘু না, এ দেশ সবার। তাই এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের সবাইকেই আইনের আওতায় আনা হবে। ঘটনার মূলে যারা রয়েছে তাদের খুঁজে বের করা হবে এবং সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’ এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত শফিক, কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া প্রমুখ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে নগদ অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন তথ্যমন্ত্রী।

ঘটনাস্থলে হাসানুল হক ইনু : বিএনপিকে ধর্মান্ধ রাজনীতির মাথার ওপর থেকে ছাতা সরানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাসদ সভাপতি সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। তিনি দুপুরে পীরগঞ্জের মাঝিপাড়ায় আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া ঘরবাড়ি পরিদর্শন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের উদ্দেশে বক্তব্যে এ কথা ব?লেন। পূজা-পরবর্তী সম?য়ে সারা দেশে ৫০টি স্থানে হামলা হলো কেন, প্রশাসনের কোনো ব্যর্থতা আছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য সরকারে প্রতি আহ্বান জানান ইনু। তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। সরকার?কে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত পুনর্বাসন করার দাবি জানান তিনি। এ সময় রংপুর জেলা জাসদ সভাপতি কুমারেশ চন্দ্র, ইউপি চেয়ারম্যান সাদেকুল ইসলাম, উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের আহ্বায়ক সুধীর চন্দ্র উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার ও স্থানীয় এমপি ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার সঞ্জীব কুমার ভাটিও ক্ষতিগ্রস্ত মাঝিপাড়া পরিদর্শন করেন।

পরিতোষের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি : রংপুরের পীরগঞ্জে সংখ্যালঘুদের বসতবাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশের দুই মামলার একটিতে আসামি পরিতোষের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিয়েছে আদালত। গতকাল বিকালে পরিতোষ রায়কে রংপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক শওকত আলী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেন। পরিতোষ ওই এলাকার প্রশান্ত রায়ের ছেলে এবং স্থানীয় হাতিবান্ধা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ফেসবুকে তার দেওয়া স্ট্যাটাস ঘিরে মাঝিপাড়ায় তান্ডব ঘটে। তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়।

৩৮ জন কারাগারে : এ ছাড়া সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়েছে ৪৯ জনকে, অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন আরও ৫০০। দুটি মামলার বাদী পীরগঞ্জ থানার এএসআই ইসমাইল হোসেন। গতকাল ৪১ আসামিকে রংপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদলতে হাজির করলে বিচারক ফজলে এলাহী ৩৮ জনের জামিন আবেদন না-মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বাকি তিনজনের বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় তাদের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

হাজীগঞ্জের মন্দিরে হামলায় আটক আরও ৩ : চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায় বুধবার রাতে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষের পর সোমবার গভীর রাতে হাজীগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। তারা হলেন রফিক আহম্মেদ রাজু (৩০), নজরুল ইসলাম (৪৫) ও মাসুদ মজুমদার (৪৫)। গতকাল দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। বুধবারের ঘটনায় চাঁদপুরে ছয়টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২ হাজারের অধিক অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। গতকালের তিনজনসহ এ পর্যন্ত ১৯ জন আটক হলেন। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কুমিল্লায় ভিডিও ভাইরাল করা ফয়েজ দুই দিনের রিমান্ডে : কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, নানুয়ার দীঘির পাড়ে মোবাইলে ভিডিও ধারণ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া ফয়েজ আহমেদকে (৪০) দুই দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। ফয়েজ কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার রঘুরামপুর গ্রামের আবদুল করিমের ছেলে। তার বিরুদ্ধে পুলিশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে।

ট্রাইব্যুনালে শাস্তি দাবি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও মহিলা পরিষদের : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনীতে বিভিন্ন মন্দির, দোকানপাট ভাঙচুরের ঘটনায় গতকাল বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পরিদর্শন করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও মহিলা পরিষদের নেতৃবৃন্দ। সেখানে বক্তব্যে তারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সেই সঙ্গে তারা মন্দির ও দোকানপাটে হামলার ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে শাস্তি দাবি করেন। পরে রাধামাধব গোপাল জিউর মন্দিরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নোয়াখালীর উদ্যোগে বিমলেন্দু মজুমদারের সভাপতিত্বে সম্প্রীতি সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণ, মুক্তিযুদ্ধের ট্রাস্টি মফিদুল হক ভুঁইয়া, নারী নেত্রী ফৌজিয়া মোসলেম, জেলা সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমদাদ হোসেন কৈশোর।

এই রকম আরও টপিক

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর