শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ জুন, ২০২০ ০০:১৬

দ্রুত অ্যান্টিবডি টেস্টিংয়ে যেতে হবে

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন

দ্রুত অ্যান্টিবডি টেস্টিংয়ে যেতে হবে

 

চলমান সংক্রমণ শনাক্তকরণে ব্যবহার করা না গেলেও ভিন্ন আঙ্গিকে এটি করোনা সংক্রমণের শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে

 

বিশ্বময় করোনা মহামারীর প্রলয়কান্ড চলছেই। গত ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে যাত্রা শুরু করে দুনিয়ার প্রতিটি কন্দরে তার ভয়ঙ্কর থাবা ছড়িয়ে দিয়েছে। এ অদৃশ্য দানব। মাত্র পাঁচ মাস সময়ের ব্যবধানে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ বনি আদম, ঝরে গেছে পৌনে চার লাখ অমূল্য প্রাণ। এ যেন এক সর্বগ্রাসী প্লাবন, যা পুরো দুনিয়াকে গ্রাস করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দিনের পর দিন এই প্লাবনে ডুবে যাচ্ছে নিত্যনতুন এলাকা। বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকাল অবস্থার যখন দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি, ইতালি ও স্পেনের মতো চরম ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের বেহাল দশা যখন সবেমাত্র তিথিয়ে আসছে, করোনা তখন নতুন করে তার জোরালো থাবা বসাতে শুরু করেছে ব্রাজিল ও রাশিয়ায়। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। করোনা মহামারীর এই যে ক্ষিপ্রগতিতে অপ্রতিরোধ্য বিস্তার তার মূলে রয়েছে এর ভয়ানক ছোঁয়াচে প্রকৃতি। আক্রান্ত ব্যক্তি ভালো মতো বুঝে উঠার আগেই তার সংস্পর্শজন থেকে বহুজনে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই আবার আক্রান্ত হচ্ছেন তেমন কোনো উপসর্গ দেখা দেওয়া ছাড়াই। নীরবে সেরেও উঠছেন, কিন্তু এই ফাঁকে আক্রান্ত থাকাকালে তার সংস্পর্শে আসা লোকদের মধ্যে তার অজান্তেই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে এ মহামারী মোকাবিলায় বিশ্বের প্রায় সব দেশই উপদ্রুত এলাকায় লকডাউন আরোপ করেছে। উদ্দেশ্য, সংক্রমণ যেন উপদ্রুত এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, আক্রান্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইসোলেট/কোয়ারেন্টিন করা যায় এবং প্রয়োজন মাফিক চিকিৎসা/পরিচর্যা দেওয়া যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিগত দুই মাসাধিক কাল ধরে সারা দেশ একরকম লকডাউনে ছিল। সীমিত পরিসরে কিছু জরুরি সেবা চালু থাকলেও বন্ধ ছিল বেশির ভাগ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকান্ড, চলেনি কোনো গণপরিবহন। এরই মধ্যে দেশময় এক ধরনের অসহিষ্ণু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন নিম্নবিত্তের দিন আনে দিন খায় এমন খেটে খাওয়া মানুষ। অবশেষে সরকার ৩০ জুনের পর থেকে  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব ধরনের অফিস-আদালত খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সীমিত পরিসরে গণপরিবহনও চালু হবে বলে জানা গেছে। আসলে এমন অবস্থা তো আর অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। আজ হোক কাল, এখান থেকে বেরিয়ে আসতেই হতো। প্রশ্ন আসতে পারে, ‘লকডাউন’ প্রত্যাহারের জন্য এটিই যথার্থ সময় ছিল কিনা? এতে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলো কিনা? পরিস্থিতির যাতে আরও অবনতি না হয় এবং নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায় তার জন্য কী কর্মপরিকল্পনা হতে পারে? বিশ্বের অনেক দেশই এর মধ্যে লকডাউন শিথিল করেছে, তবে তা করেছে করোনা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আসার পরই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পরিস্থিতি যাই হোক, লকডাউন তুলে দেওয়ার জন্য একরকম গোঁ ধরেছেন, যদিও তার দেশের স্বাস্থ্যবিদরা এ ব্যাপারে তড়িঘড়ির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছেন। পাশের দেশ ভারতে লকডাউন শিথিল করার পর সংক্রমণের হার বাড়তে দেখা গেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও লকডাউন শিথিলের পর সংক্রমণের আরেকটি ঢেউ আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় করোনা পরিস্থিতি দ্রুত আয়ত্তে নিয়ে আসতে কি করণীয় আছে, তা নির্মোহভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। করোনা মহামারী মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) শুরু থেকেই যে মৌলিক কর্মপরিকল্পনা দিয়ে এসেছে তা হলো : Test, Test & Test। অর্থাৎ যত বেশি পারুন, পরীক্ষা করুন, আক্রান্তদের খুঁজে বের করুন। কেবল এভাবেই সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে, জনসংখ্যার একটি বড় অংশে? যা বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে হতে পারে ২০-৮০%? সংক্রমণের তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। বিজ্ঞানীদের জোরালো বিশ্বাস, সংক্রমণ চলাকালে নিজেদের মধ্যে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা না গেলেও এরা অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে সক্ষম। আপনি যদি সংক্রমণের বিস্তার রোধ করতে চান, নিয়ন্ত্রণে আনতে চান, তাহলে এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার একটি উপায় বের করতেই হবে। কেবল অসুস্থ বোধ করছে, এমন লোকদের পরীক্ষা করে এসব নীরব করোনাবাহীকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। আপনাকে পরীক্ষার আওতা আরও আরও বাড়াতে হবে। কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে হোক কিংবা দৈবচয়নের ভিত্তিতে, আপনাকে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ লোকদেরও পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। অনেকেই মনে করে বসে আছেন, করোনা সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে একটি শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছার পর আপনা আপনি স্থির হয়ে আসবে, তারপর কমতে শুরু করবে। এমনটি কেবল তখনই ঘটতে পারে, যদি ইতোমধ্যে যেসব লোক সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের দ্রুত ব্যাপক ভিত্তিতে শনাক্ত করে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানোর সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাউথ কোরিয়ার মতো যেসব দেশ সংক্রমিতদের ব্যাপক ভিত্তিক শনাক্তকরণের ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভালো সাফল্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি কিংবা স্পেনের মতো যেসব দেশ দেরিতে তৎপর হয়েছে, সেখানে সংক্রমণ সমাজের ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে, তারা পরবর্তীতে শনাক্তকরণের সংখ্যা বিপুলভাবে বাড়িয়েও সংক্রমণের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না। এ কারণে বিশ্বময় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ এবং সেই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা করোনা শনাক্তকরণের এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন যা খুব দ্রুত সুনির্দিষ্টভাবে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হবে।

ইতিপূর্বেকার করোনা গোত্রীয় সার্স/মার্স এসব মহামারী মোকাবিলা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনার আলোকে বিশ্বময় সব দেশই করোনা শনাক্তকরণে আরটি-পিসিআর পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে আসছিল। বাংলাদেশেও এখন পর্যন্ত করোনা শনাক্তকরণে এ পদ্ধতিটিই অনুসৃত হচ্ছে। শুরুর দিকে টেস্টিং সামর্থ্য খুব সীমিত থাকলেও এখন বিভিন্ন হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি মিলিয়ে ৪৮টি ল্যাবে আরটি-পিসিআর টেস্ট চলছে এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ হাজার পরীক্ষা সম্পন্ন হচ্ছে। আমরা এখনো অন্য কোনো পদ্ধতি বিবেচনায় নিইনি। আরটি-পিসিআর পদ্ধতিটি খুবই সুনির্দিষ্ট (specific) এবং সংবেদনশীল (sensitive), করোনা শনাক্তকরণে এখন পর্যন্ত আর কোনো পদ্ধতিই এর চেয়ে ভালো কাজ করে বলে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে টেস্টিংয়ের আওতায় আনতে হলে শুধু এই একটি পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা চলবে কিনা। আমেরিকা, ইউরোপ, এমনকি পাশের দেশ ভারতের দিকেও যদি তাকান, আপনি দেখতে পাবেন, তারা অনেক আগেই বিকল্প পদ্ধতির দিকে হাত বাড়িয়েছে। খোদ মার্কিন মুলুকে অনেক চেষ্টা করেও আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষার সংখ্যা দৈনিক দুই থেকে আড়াই লাখের উপরে উঠানো যাচ্ছিল না। আর ওদিকে স্বাস্থ্যবিদরা চেঁচিয়ে যাচ্ছিলেন, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরায় চালু করার আগে প্রত্যেককে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে, দৈনিক টেস্টের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে উন্নীত করতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে বিকল্প হিসেবে যেসব পরীক্ষা পদ্ধতি বিবেচনায় এসেছে, তা নতুন কিছু নয়। এর আগে সার্স/মার্সের মতো ভাইরাসজনিত রোগেও এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। এসব পরীক্ষায় রোগীর কাছ থেকে সংগৃহীত নমুনায় করোনাভাইরাস দেহের কোনো এন্টিজেনিক প্রোটিন কিংবা এর বিরুদ্ধে মানবদেহে যেসব এন্টিবডি তৈরি হয়, তা শনাক্তকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাধারণভাবে এসব পরীক্ষা পদ্ধতিকে immunoassay নামে আখ্যায়িত করা হয়। আরটি-পিসিআরের ক্ষেত্রে যেখানে একটি টেস্ট রান করাতে কয়েক ঘন্টা লেগে যায়, সেখানে এ সব টেস্ট এমনভাবে ডিজাইন করা সম্ভব যাতে আপনি মিনিট পনেরোর মধ্যেই রেজাল্ট পেয়ে যাবেন। টেস্টগুলো খুবই সহজ প্রকৃতির, পয়েন্ট অব কেয়ার (POC) অর্থাৎ রোগীর বাসা, অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তারের চেম্বার, ক্লিনিক কিংবা হাসপাতাল? যখন যেখানে রোগীর পরীক্ষা করা হচ্ছে সরাসরি সেখানেই? পরীক্ষার ফল পাওয়া সম্ভব। নমুনা সংগ্রহ করে আলাদা কোনো ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো লাগে না। এছাড়া, আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে মেশিনের দাম, বিশেষ ধরনের ল্যাব সেট-আপ এবং নমুনা সংগ্রহ, প্রসেসিং ও পরীক্ষা পরিচালনার জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ানের প্রয়োজনীয়তা? এসব মিলিয়ে পরীক্ষা প্রতি খরচটাও অনেক পড়ে যায়।

এন্টিবডি টেস্টিং আপনার কাছে অধিকতর আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কারণ, এখানে নমুনা হিসেবে দরকার কেবল অল্প একটু রক্ত, যা এমনকি সুঁই দিয়ে আঙ্গুল ফুঁটো করে রোগী নিজেই দিতে পারেন। পিসিআর টেস্টের জন্য সোয়াব ব্যবহার করে যে প্রক্রিয়ায় নাসারন্ধ্রের পেছনে ফ্যারিংস (pharynx) থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হয়, তার জন্য দক্ষ হাতের প্রয়োজন তো আছেই, রোগীর জন্যও তা আরামপ্রদ নয়। তবে এন্টিবডি টেস্টের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এ পদ্ধতিতে সরাসরি ভাইরাস বা ভাইরাসের কোনো উপাদান নয়, ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শরীর যে সব এন্টিবডি তৈরি করে তা শনাক্ত করা হয়। সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে যখন সবে শরীরে করোনাবিরোধী এন্টিবডিসমূহ তৈরি হচ্ছে, তখন এসব এন্টিবডি শনাক্তকরণ পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে।  এ কারণে এন্টিবডি টেস্ট চলমান সংক্রমণ (current infection) শনাক্তকরণের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ নেই। [EUA Authorized Serology Test Performance FDA, 26 May 2020] বিপরীতে, এন্টিজেন টেস্টে পিসিআরের ন্যায় ন্যাসাল/ওরাল সোয়াব নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে জেনেটিক মেটেরিয়াল (RNA)-এর পরিবর্তে এখানে ভাইরাসের প্রোটিন শনাক্ত করা হয়। দেখা গেছে, এ ধরনের পরীক্ষা আরটি-পিসিআরের প্রায় সমপর্যায়ের স্পেসিফিসিটি দেখাতে সক্ষম, কিন্তু সেনসিটিভিটি তুলনামূলকভাবে কম। এর কারণ, আরটি-পিসিআর ভাইরাসের জেনেটিক মেটেরিয়ালকে বিবর্ধিত (amplify) করে, ফলে সংগৃহীত নমুনায় ভাইরাস পরিমাণে নগণ্য হলেও শনাক্ত করতে পারে। এন্টিজেন টেস্টে ভাইরাসের প্রোটিনকে বিবর্ধিত করার সেরূপ কোনো ব্যবস্থা নেই, ফলে নমুনায় ভাইরাসের পরিমাণ কম হলে এটি আর শনাক্ত করতে পারে না। কাজেই, এ টেস্টে রেজাল্ট যদি পজিটিভ আসে তা নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়, তবে নেগেটিভ হলে তা ‘False -Ve’-ও হতে পারে। কাজেই, রোগীর যদি সুস্পষ্ট করোনা উপসর্গ থাকে, রেজাল্ট নেগেটিভ হলে RT-PCR দিয়ে তার নমুনা পুনরায় পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সেনসিটিভিটির মানদন্ডে আরটি-পিসিআরের চেয়ে কিছুটা নিম্নমার্গের হলেও এ পরীক্ষাতে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় যে বিপুল গতি সঞ্চারের সম্ভাবনা নিহিত, তার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে এ পদ্ধতির ব্যাপারে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক ও বিশেষজ্ঞের মন্তব্য উদ্ধৃত করা হলো। গত এপ্রিলে হোয়াইট হাউস করোনাভাইরাস টাস্কফোর্সের প্রধান ডা. দেবোরাহ বার্ক্স এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘নিউক্লিয়িক এসিড টেস্টের মাধ্যমে দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন পরীক্ষা করা কিংবা কাজে বা স্কুলে ফেরার আগে প্রতিটি ব্যক্তিকে পরীক্ষার আওতায় আনার সামর্থ্য অর্জন কখনই সম্ভবপর হবে না। তবে এন্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে এটা সম্ভবপর হতে পারে।’ [CBS News, 09 May 2020] করোনা শনাক্তকরণের জন্য প্রথম কোনো এন্টিজেন টেস্টিং কিট হিসেবে কুইডেল করপোরেশনের Sofia 2 SARS Antigen FIA নামীয় কিটের ইউএস এফডিএ কর্তৃক জরুরি অনুমোদন (EUA) দেওয়া প্রসঙ্গে এক প্রতিক্রিয়ায় হার্ভার্ড গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. আশিস ঝা বলেন, ‘এন্টিজেন টেস্টিংয়ের ব্যাপারে আমি খুবই উচ্ছ্বসিত, কারণ এ পদ্ধতিতে দৈনিক টেস্টের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে উন্নীত করার সামর্থ্য রয়েছে। তাছাড়া এতে অনেক দ্রুতগতিতে কাজ হবে। আমরা অনেকেই এ মুহূর্তটির প্রতীক্ষায় ছিলাম।’

[The New York Times, 09 May 2020] এফডিএ-এর সাবেক প্রধান স্কট গটলিয়েভ এ ঘটনাকে ‘সত্যিকারের গেম-চেঞ্জার’ বলে অভিহিত করেন। এন্টিবডি টেস্টিং করোনার চলমান সংক্রমণ শনাক্তকরণে ব্যবহার করা না গেলেও ভিন্ন আঙ্গিকে এটি করোনা সংক্রমণের শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো ব্যক্তি আগে সংক্রমিত হয়েছিল কিনা এই টেস্টের মাধ্যমে আমরা তা নির্ধারণ করতে পারি। এ বিষয়টির দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। প্রথমত: এন্টিবডি তৈরি মূলত অণুজীবের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়ার একটি অংশ। কাজেই, কোনো ব্যক্তির শরীরে করোনাবিরোধী এন্টিবডি শনাক্ত হলে আপনি ধরে নিতে পারেন তার মধ্যে একরকম প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে যা তাকে পুনঃসংক্রমণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে। এ বিষয়টি একজন ব্যক্তিকে নির্ভয়ে তার কাজে ফিরতে উৎসাহ জোগাতে পারে। এটি ডাক্তার, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তাদের সব সময় রোগী নিয়ে কাজ করতে হয় বলে তারা অনেক বেশি সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকেন। তবে সাধারণভাবে বিষয়টি সত্য হলেও এন্টিবডি তৈরির ফলে পুনরায় করোনা সংক্রমণের বিরুদ্ধে কতটুকু প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হয় এবং তা কতদিন স্থায়ী হতে পারে এ বিষয়ে এখনো সম্যক ধারণা পাওয়া যায়নি। কিছু দেশ যেসব লোকের দেহে করোনাবিরোধী এন্টিবডি পাওয়া গেছে তাদের ‘immunity passport’ ev ‘risk-free certificate’ ইস্যুর কথা ভাবছিল, যাতে তারা এখানে সেখানে যেতে পারেন কিংবা কাজে ফিরতে পারেন।

২৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক সায়েন্টিফিক ব্রিফে এ প্রসঙ্গে সতর্কবাণী দিয়ে বলে, ‘এখন পর্যন্ত যেসব লোক Covid-19 থেকে সেরে উঠেছেন এবং শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়েছে, তারা পুনঃ সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকবেন এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ এখানে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, যেহেতু এন্টিবডি টেস্টিংয়ের মাধ্যমে, উপসর্গ দেখা দিয়ে থাকুক বা না থাকুক, অতীতে সংক্রমিত হয়েছে এমন সবাইকে শনাক্ত করা সম্ভব, দৈবচয়নের ভিত্তিতে বাছাই করে জনসাধারণের অংশবিশেষের ওপর পরীক্ষা (serosurvey) চালিয়ে কোনো একটি জায়গায় সংক্রমণের ব্যাপ্তির সঠিক চিত্র পাওয়া সম্ভব। এতে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণের ব্যাপকতার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে এবং সে মোতাবেক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যার জন্য সক্রিয় পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা যাবে। বিশেষ করে সংক্রমণের ‘হট স্পটগুলো’ চিহ্নিত করা গেলে প্রাধিকার ভিত্তিতে আপনার মনোযোগ ওখানে নিবদ্ধ করা সম্ভবপর হবে। এখানে এন্টিবডি টেস্টের আরেকটি সম্ভাব্য দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা সমীচীন হবে। এই টেস্ট ভুলক্রমে সমগোত্রীয় অন্য কোনো করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সৃষ্ট এন্টিবডিকে নভেল করোনার এন্টিবডি হিসেবে শনাক্ত করতে পারে (false+ve)। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যায়, বিশ্ববাজার এরকম বহু ত্রুটিপূর্ণ কিটে সয়লাব হয়ে গেছে। এ কারণে টেস্টিং কিটটি যথেষ্ট স্পেসিফিক কিনা তা ভালোভাবে পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি।


আপনার মন্তব্য