শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৪৯

রমজানে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

রমজানে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

পৃথিবীর মানুষ আজ করোনার আক্রমণে বিপর্যস্ত, পর্যুদস্ত ও দিশাহারা। এরই মধ্যে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের বার্তা নিয়ে পবিত্র রমজান মাস চলছে।

এ মাসের পবিত্রতা, মাহাত্ম্য ও মহিমা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, “রমজান এমন এক মহিমাময় ও গৌরবান্বিত মাস, যে মাসে কালাম-এ-পাক কোরআন নাজিল হয়েছে” (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)। আল্লাহতায়ালা আরও ইরশাদ করেন, “হে মুমিনগণ তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি, যাতে তোমরা আল্লাহ ভীরু হতে পার” (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। করোনা অতি মহামারীর মধ্যে আগত হলো পবিত্র রমজান। এ মাস সংযমের, কথা ও কাজে মিতব্যয়ী হওয়ার এবং জাগতিক সব বিষয়ে সংযত জীবন ধারণের মাস। বরাবরই দেখা যায়, আমাদের দেশে রমজান মাস এলেই খাওয়া-দাওয়ার ধুম পড়ে যায়। মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে কী খাবে, কী খাবে না। আসলে পৃথিবীতে মুসলমানরা ইসলামের বিধান অনুযায়ী একই নিয়মে রোজা পালন করেন। বিভিন্ন দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং বিভিন্ন রকম খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। তাই স্থান কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন রকম খাওয়া-দাওয়ারও তারতম্য রয়েছে। আমাদের দেশের মানুষের যে ধরনের খাদ্যাভ্যাস রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করব। ঐতিহ্যগতভাবে আমরা সাহরি ও ইফতারে যেসব খাবার গ্রহণ করি সেগুলোর সবই যে যথাযথ তা কিন্তু নয়। এসব খাবারের মধ্যে কিছু খাবার রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। আবার কিছু খাবার আছে যেগুলো স্বাস্থ্যসম্মত কিংবা পুষ্টিকর খাবার হলেও সময়োচিত নয়। রোজায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোজাদাররা অসুস্থ হয়ে পড়েন যথাযথ খাবার গ্রহণ না করার কারণে। রোজা পালনের জন্য প্রয়োজন সঠিক ডায়েট নির্বাচন, শারীরিক সুস্থতা, মানসিক শক্তি এবং অদম্য ইচ্ছা ও আনুগত্য।

অতিভোজন থেকেও বিরত থাকুন। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খান, যা হজমে সহায়ক হবে। ইফতার ও সাহরি সময়ের মধ্যে অন্ততপক্ষে আট গ্লাস পানি পান করুন। প্রচুর সবুজ শাকসবজি, ফলমূল আহার করুন

ইফতারিতে কী কী খাবেন : রমজান মাস এলে বিকাল বেলা থেকেই ইফতারের জন্য নানা খাবার তৈরি ও বিক্রির হিড়িক পড়ে। হরেক রকম ইফতারির পসরা সাজিয়ে দোকানিরা রাস্তার ধারে, ফুটপাথে, অলিতে-গলিতে, হাটে-বাজারে সাজিয়ে রাখে। এসব ইফতারির মধ্যে রয়েছে ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনি, ডালবড়া, সবজি বরা, আলুর চপ, খোলা খেজুর, হালিম, জালি কাবাব, জিলাপি, বুন্দিয়া ইত্যাদি। আরও রয়েছে বিভিন্ন ফল ও ফলের রস, আখের গুড়ের শরবত, নানা রং মিশ্রিত বাহারি শরবত। তাছাড়া মুখরোচক বিরিয়ানি ও তেহারি তো আছেই।

প্রশ্ন হলো, এসব মুখরোচক খাবার স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তৈরি করা হয়েছে কি না। ভেজাল বেসন ও কৃত্রিম রং মেশানো হয়েছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। যে তেলে ভাজা হয়, সেই তেল একবারের বেশি ব্যবহার উচিত নয়। কারণ একই তেল বারবার আগুনে ফুটালে কয়েক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি হয়, যেমন পলি-নিউক্লিয়ার হাইড্রোকার্বন, যার মধ্যে বেনজাপাইরিন নামক ক্যান্সার হতে পারে এমন পদার্থের মাত্রা বেশি থাকে। তা ছাড়া অপরিষ্কারভাবে ইফতারি তৈরি করলে পেটের পীড়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুস্থভাবে বাঁচার জন্য যত্রতত্র খোলা খাবার না খাওয়াই উচিত। একজন রোজাদার ইফতারে কী খাবেন তা নির্ভর করবে তার স্বাস্থ্যের অবস্থা ও বয়সের ওপর। সুস্থ, স্বাস্থ্যবান রোজাদারের জন্য ইফতারিতে খেজুর বা খুরমা, ঘরের তৈরি বিশুদ্ধ শরবত, কচি শসা, পিঁয়াজু, বুট, একটা ডিম, ফরমালিন অথবা ক্যালসিয়াম কার্বাইডমুক্ত মৌসুমি ফল থাকা ভালো। কারণ ফলে ভিটামিন ও মিনারেল পাওয়া যায়। ফল খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় এবং সহজে তা হজম হয়। রুচি অনুযায়ী বাসার রান্না করা নুডুলসও খেতে পারেন। বেশি ভাজি ভুনা তেহারি, হালিম না খাওয়াই ভালো। কারণ এতে বদহজম হতে পারে।  

কী খাবেন সাহরিতে : রমজানে স্বাভাবিক নিয়ম পরিবর্তন করে সুবহে সাদিকের আগে ঘুম থেকে উঠে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিতে হয়। সকালের নাস্তার পরিবর্তে খুব ভোরে সারা দিনের উপবাসের সময় চলার মতো খাওয়ার প্রয়োজন হয়। শরীরটাকে সুস্থ রাখার জন্য সাহরি খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, সাহরির খাবার মুখরোচক, সহজ পাচ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া প্রয়োজন। অধিক তেল, অধিক ঝাল, অধিক চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া একদম উচিত নয়। ভাতের সঙ্গে মিশ্র সবজি, মাছ অথবা মাংস খাবেন। অনেকেই মনে করেন যেহেতু সারা দিন না খেয়ে থাকতে হবে, তাই সাহরির সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেশি বেশি খাবার খেতে হবে। তা মোটেই ঠিক নয়, কারণ চার পাঁচ ঘণ্টা পার হলেই খাদ্যগুলো পাকস্থলি থেকে অন্ত্রে গিয়ে হজম হয়ে যায়। তাই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি না খাওয়াই ভালো, বরং মাত্রাতিরিক্ত খেলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। পিপাসা নিবারণ হয়, সেই পরিমাণ পানি নিজের অভ্যাস অনুযায়ী পান করতে হবে। দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং পানিশূন্যতার কারণে শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়। তাই ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে অন্তত দেড় থেকে দুই লিটার পানি পান করবেন। অনেকে পানির পরিবর্তে লেমন অথবা রোজ ওয়াটার, ফ্রুট ওয়াটার, নানা ধরনের শরবত, ভিটামিন ওয়াটাসহ নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত পানীয় পান করেন। আসলে রোজাদারদের শুধুমাত্র বিশুদ্ধ পানি পান করাই উচিত। ইফতার ও সাহরিতে চা কফি পরিহার করা কম পান করা ভালো। মনে রাখতে হবে, রোজাদারদের প্রচুর সবুজ শাকসবজি, ফলমূল আহার করা উচিত।

রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সহজেই তার স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে, যদি ঠিক ডায়েট অনুসরণ করা হয়। অতিভোজন থেকেও বিরত থাকুন। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খান, যা আপনার হজমে সহায়ক হবে। ইফতার ও সাহরি সময়ের মধ্যে অন্তত পক্ষে আট গ্লাস পানি পান করুন। গ্লাস গুনে পানি খেতে অসুবিধা হলে, সমপরিমাণ পানি বোতলে ভরে রাখুন এবং ইফতার থেকে সাহরির সময়ের মধ্যে তার পুরোটা পান করুন।  এ ছাড়া মনে রাখবেন অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের কারণেই অসুস্থতা দেখা দিয়ে থাকে। 

লেখক : ইউজিসি অধ্যাপক এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক।