শিরোনাম
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০১:০০

কারবালার হত্যাকাণ্ড

আজিমউদ্দিন আহমেদ

কারবালার হত্যাকাণ্ড

উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া হজরত হাসান (রা.)-এর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে নিজপুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেন। মক্কা ও মদিনার মুসলমানরা আগে থেকেই উমাইয়া শাসকগোষ্ঠীর কর্মকান্ডে ক্ষুব্ধ ছিল। ইয়াজিদের ক্ষমতা গ্রহণ তাদের ক্ষোভ বৃদ্ধি করে। তারা খলিফা হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাতি ইমাম হোসাইনকে সমর্থন জানায়। ফলে পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের সঙ্গে হজরত হোসাইন (রা.)-এর সংঘাত দানা বেঁধে ওঠে। 

কুফার অধিবাসীরা ইয়াজিদি শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। হজরত হোসাইন (রা.)-কে তারা কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। তিনি তার পরিবার-পরিজনসহ কুফার উদ্দেশে রওনা করলে ফোরাত নদের তীরে কারবালায় ইয়াজিদ বাহিনী তাদের অবরুদ্ধ করে। হজরত হোসাইন (রা.)-এর পরিবারের সব পুরুষ সদস্য ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নিহত হন। হোসাইন (রা.) তাঁর এক শিশু পুত্রের তেষ্টা মেটাতে তাঁবু থেকে বেরিয়ে ফোরাত নদের দিকে যাওয়ার সময় ইয়াজিদের সৈন্যদের তীরের আঘাতে কোলের মধ্যে সে মারা যায়। হোসাইন (রা.) বসে পড়েন এবং ইয়াজিদি সৈন্যের ছোড়া বর্শার আঘাতে প্রাণ হারান। 

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা হামজা (রা.)-এর লাশ চিরে কলিজা বের করে চিবিয়েছিল উমাইয়া দলপতি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা। কারবালার প্রান্তরে নবীবংশের ওপর একই ধরনের নৃশংসতা প্রদর্শন করে হিন্দার দৌহিত্র পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার সৈন্যরা। তারা ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মস্তক কেটে ফেলে। তাঁর দেহকে পদদলিত করার ধৃষ্টতাও দেখায়। হোসাইন (রা.)-এর খন্ডিত মস্তক ইয়াজিদের নিযুক্ত গভর্নর ওবায়দুল্লাহর পদতলে উপস্থিত করা হয়। 

কারবালা যুদ্ধের পর ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে মক্কা ও মদিনায় বিদ্রোহ দেখা দেয়। ইয়াজিদ বাহিনী মদিনা আক্রমণ করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় নগরীকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। চার খলিফার আমলে খেলাফতের রাজধানী মদিনায় যে সব মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্থাপনা তৈরি হয়েছিল সেগুলো বিনষ্ট করা হয়। মদিনাবাসীর ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয়। 
ইতিহাসবিদ আমির আলীর মতে, ‘যে শহর রসুলে খোদাকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং যা তাঁর জীবন ও কার্যকলাপের সংস্পর্শে পবিত্রতা অর্জন করেছিল তা সম্পূর্ণরূপে অপবিত্র হলো।’ মদিনা ধ্বংসের পর ইয়াজিদ বাহিনী পবিত্র নগরী মক্কা আক্রমণ করে। দুই মাস ধরে মক্কা অবরোধ করে রাখে তারা। তারা ইসলামের পবিত্র কাবাঘরে অগ্নিসংযোগ করে। ইতিহাসবিদ হিট্টি বলেন, ‘অবরোধকারীরা কাবাঘরে অগ্নিসংযোগ করে, পবিত্র কৃষ্ণপ্রস্তর তিন খণ্ড হয়ে যায়। কাবাঘর ক্রন্দনরত রমণীর ভগ্ন হৃদয়ের রূপ লাভ করে।’

মক্কায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সময় ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার মৃত্যুসংবাদ মক্কায় পৌঁছে। ফলে ইয়াজিদ বাহিনী তাদের নৃশংস অভিযান বন্ধ করে দামেস্কে ফিরে যায়। ইতিহাসবিদ উইলিয়ামস মুর বলেন, ‘ইয়াজিদের (সাড়ে তিন বছরের) রাজত্বকালে ইসলামের কোনো প্রসার ঘটেনি।’ ইতিহাসবিদ ইবনুত তিকতাকা বলেন, ‘ইয়াজিদ সাড়ে তিন বছর রাজত্ব করেন। প্রথম বছরে তিনি হজরত আলীর পুত্র হোসাইন (রা.)-কে হত্যা করেন। দ্বিতীয় বছরে মদিনা আক্রমণ করে ধ্বংসসাধন করেন এবং তৃতীয় বছরে কাবা শরিফ বিধ্বস্ত করেন।’

হজরত মুয়াবিয়া হজরত হাসানের (রা.) সঙ্গে যে সমঝোতায় উপনীত হয়েছিলেন তাতে মুয়াবিয়ার পর খিলাফতের দায়িত্ব হজরত হোসাইন (রা.)-এর কাছে সমর্পণ করার ওয়াদা করা হয়েছিল। এ ওয়াদা ভঙ্গ করে নিজের মদ্যপ, দুশ্চরিত্র ও স্বেচ্ছাচারী পুত্র ইয়াজিদকে তিনি নিজের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। ইয়াজিদের খেলাফতলাভের পথ নিষ্কণ্টক করতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হাসান (রা.)-কে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়। কারবালা প্রান্তরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে আরেক দৌহিত্র ইমাম হোসাইনকে পরিবারের সদস্যসহ হত্যা করা হয়। 

মুয়াবিয়া ক্ষমতায় এসে জুমার নামাজের খুতবায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতা হজরত আলী (রা.) ও তাঁর বংশধরদের প্রতি অভিশাপ দেওয়ার প্রথা চালু করেন। ৫৯ বছর পর ন্যায়নিষ্ঠ উমাইয়া খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ এ জঘন্য প্রথা বাতিল করেন। সরাসরি ইসলামের বিরোধিতা না করলেও উমাইয়া শাসকরা দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায় হামলা, কাবাঘরে অগ্নিসংযোগ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফিদাক নামের ফলের বাগান তাঁর বংশধরদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়াসহ নানা অপরাধের ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। 

ক্ষমতার জন্য  মুয়াবিয়া-পুত্র ইয়াজিদ অসংখ্য অপকর্মের আশ্রয় নিলেও তার পরিণতি ভালো হয়নি। পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র দ্বিতীয় মুয়াবিয়া উমাইয়া সাম্রাজ্যের শাসক হন। ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর তিনি ক্ষমতা ত্যাগ করে আগের ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যান। উমাইয়া খেলাফতের কর্তৃত্ব চলে যায় উমাইয়া গোত্রের আরেক ধারার প্রতিনিধি মারওয়ানের হাতে। নব্বই বছর যাবৎ আবু সুফিয়ানের বংশধররা ক্ষমতায় থাকে। 

তাদের মধ্যে একমাত্র দ্বিতীয় ওমর বা ওমর বিন আবদুল আজিজ ইসলামী ধারার প্রতি শতভাগ আনুগত্যের অধিকারী ছিলেন। অন্যদের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। উমাইয়া শাসনের প্রতি ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অসন্তুষ্ট ছিল। এ অসন্তুষ্টি কাজে লাগিয়ে উমাইয়াদের জাতশত্র“ হিশামিরা খেলাফতের বিভিন্ন স্থানে জনগণকে সংগঠিত করে।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আব্বাসের বংশধর বা আব্বাসীয়রা ছিল এ আন্দোলনের নেতৃত্বে। তাদের প্রতি হজরত আলী (রা.)-এর অনুসারীদের সমর্থন ছিল। ৭৫০ সালে আবুল আব্বাস উমাইয়া শাসনের পতন ঘটিয়ে আব্বাসীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। উমাইয়াদের প্রতি নৃশংস আচরণ করা হয় আব্বাসীয় শাসনের সূচনাকালে। উমাইয়াদের গণহারে হত্যা করা হয়। মৃত উমাইয়ারাও প্রতিহিংসা থেকে রক্ষা পায়নি। কবর থেকে তাদের হাড় উঠিয়ে তা চূর্ণ করে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে আব্বাসীয়রা।


বিডি প্রতিদিন/ তাফসীর আব্দুল্লাহ


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর