শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৫৪

টাকা দাও সনদ নাও

জয়শ্রী ভাদুড়ী

টাকা দাও সনদ নাও

জন্ম নিবন্ধনে সাল ভুল হওয়ায় তা ঠিক করতে ধামরাই থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে এসেছেন মিজান আলী। উপজেলা থেকে চার মাস আগে যাবতীয় কাগজপত্র পাঠিয়ে দিলেও জাতীয় জন্ম নিবন্ধন দফতরের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে এখনো শেষ হয়নি কাজ। অথচ মুন্সীগঞ্জের তানিয়া আক্তার নামে এক শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধনে ভুল হওয়া সাল উপজেলার কাজ শেষ করে দুই হাজার টাকা দিয়ে দালালের হাতে পাঠানোর তিন দিনের মধ্যে ঠিক করা হয়েছে।

সরেজমিন বৃহস্পতিবার রাজধানীর পরিবহন পুল ভবনের আটতলায় গিয়ে পৌঁছতেই এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে বলেন, জন্ম নিবন্ধন অফিস খুঁজছেন। হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার সঙ্গে আসেন। আমি বলে দিচ্ছি কী করতে হবে।’ তিনি কোন দায়িত্বে আছেন জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘পাশেই আমার অফিস।’ জিয়াউর রহমান নামের ওই ব্যক্তির সঙ্গে একটু এগিয়ে গেলেই জিজ্ঞেস করেন, জন্ম নিবন্ধনে সাল ভুল হয়েছে কি না। আবার হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলে তিনি বলেন, ‘উপজেলা থেকে যাবতীয় কাজ শেষ করে ওখান থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয় এ কাগজ। এরপর এখানে কাজ শেষ হতে অনেক সময় লেগে যায়। তবে আমার মাধ্যমে করালে তিন দিনের মধ্যে কাজ হয়ে যাবে।’ আর বিনিময়ে তাকে দিতে হবে তিন হাজার টাকা। এদিকে অফিসের সামনে প্রায় ১০-১২ জন বিভিন্ন বয়সী মানুষকে বসে থাকতে দেখা যায়। তারা কেউ নিজের, কেউবা আবার পরিবারের কারও নিবন্ধনে জন্ম বা মৃত্যুসাল ভুলের সমস্যা সমাধানে এসেছেন। অধিকাংশ ব্যক্তিই প্রায় তিন-চার মাস আগে কাগজ জমা দিলেও এখনো তাদের ভুল তারিখ ঠিক হয়নি বলে জানান তারা। তাদের কাছেও কাজ দ্রুত করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তিনজন দালালকে ঘুরতে দেখা যায়। কাউকে তিন হাজার, আবার দর-দাম করলে কমানো হবে বলে আশ্বাস দিচ্ছিলেন এই দালালরা। তাদের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা হাবিব, মিলন ও রাকিব বলে নিজেদের পরিচয় দেন। তাদের মোবাইল নম্বর চাইলে এই ভবনের যে-কাউকে তাদের নাম বললেই চিনবে বলে মোবাইল নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানান তারা। কথা শেষ হতেই নিবন্ধন অফিসের একটি কক্ষে ঢুকে যেতে দেখা যায় এদের দুজনকে। মাধ্যমিক পরীক্ষার সনদপত্রের জন্মতারিখ আর জন্ম সনদপত্রের তারিখ আলাদা হওয়ায় এই ভুল সংশোধনে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে এসেছেন গাজীপুরের ফেরদৌস ইসলাম। কত দিন আগে উপজেলা থেকে সংশ্লিষ্ট কাগজ পাঠানো হয়েছে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘চার মাস আগে উপজেলা থেকে আমার কাগজপত্র এই দফতরে পাঠানো হয়েছে। এরপর প্রতিমাসেই আমি একবার করে খোঁজ নিয়ে যাই। কিন্তু প্রতিবারই কর্মকর্তারা বলেন, আপনার আগে যাদেরগুলো এসেছে সেগুলোই এখনো ঠিক হয়নি। পরের মাসে যোগাযোগ করেন। এভাবে প্রায় তিন মাস হলো ঘুরছি কিন্তু আমার জন্ম নিবন্ধনের সাল আর ঠিক হচ্ছে না।’ এ সময় কুমিল্লা থেকে ছেলের জন্মসনদে সাল ভুল হওয়ায় নিবন্ধন দফতরে আসা মঈন উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারের দেওয়া সিস্টেমে কাউকে অবৈধ অর্থ না দিয়ে ভুল সংশোধন করতে চেয়েছিলাম। পাঁচ মাস হলো ঘুরছি কিন্তু কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ এখানে এলেই দালালদের দেখি হাতে দুই-তিনজনের কাগজ নিয়ে নিবন্ধন অফিসে ঢোকে আর ঠিক করে আমাদের সামনে দিয়ে নিয়ে যায়। আমরা অসহায়ের মতো দেখি।’ দালালদের সঙ্গে মিলে নিবন্ধন অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন এই ব্যক্তি। জন্ম ও মৃত্যু সনদ নিবন্ধন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে হাজারো জন্ম ও মৃত্যু সনদ নিবন্ধন চলছে। আর এ কাজে অনেক সময় থেকে যাচ্ছে ভুলভ্রান্তি। সনদে নাম, পিতা-মাতার নাম বা ঠিকানা ভুল হলে সেগুলো ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে সংশোধন করা যায়। কিন্তু কারও যদি জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধনে সাল ভুল হয় তাহলে সেগুলো রাজধানীর রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় ছাড়া ঠিক করা যায় না। জন্ম সনদে সাল কম-বেশি করে অনেক সময় বাল্যবিয়ে বা অপরাধমূলক কাজ হয়। আবার মৃত্যু সনদে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সাল কম-বেশি করে জমি বা অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে অহরহ। এসব দুর্নীতি বন্ধে সরকার জন্ম ও মৃত্যুসাল পরিবর্তনের ক্ষমতা শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ে এসে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে ন্যস্ত করে। এ সুযোগে দালালদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এ কার্যালয়। আর এতে জড়িত আছেন কার্যালয়ের অভ্যন্তরের কতিপয় কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসন থেকে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত উপার্জনের আশায় কড়াকড়ি সত্ত্বেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দালালদের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে রেজিস্ট্রার জেনারেল থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘুষ-দালালি বন্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কড়া নজরদারিতে রাখছেন বলে জানান এই কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর