Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ অক্টোবর, ২০১৭ ২৩:৫৯

সর্বনাশা আত্মহননে তারুণ্য

জিন্নাতুন নূর

সর্বনাশা আত্মহননে তারুণ্য

বিষণ্নতায় আক্রান্ত তরুণ ছেলে-মেয়েরা আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তাদের এই আশঙ্কার সত্যতা পাওয়া যায় আত্মহত্যা বিষয়ক গবেষণাতেও। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বাংলাদেশ এর তথ্যে, বাংলাদেশে ফি বছর আত্মহত্যা করছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের আরেক গবেষণা থেকে জানা যায়, আত্মহত্যাকারী মানুষদের ৬১ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। আর বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয়তম কারণ আত্মহত্যা। অতীতের তুলনায় আত্মহত্যার ঘটনা এখন বেড়েছে। সামান্য তুচ্ছতর ঘটনাকে কেন্দ্র করেও এখন তরুণ-তরুণীরা আত্মহত্যা বেছে নিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের ‘ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড রিস্ক ফ্যাক্টর অব সুইসাইড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় (নভেম্বর ২০১৬-এপ্রিল ২০১৭) উল্লেখ করা হয়, যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের ৬১ শতাংশের বয়স ত্রিশের নিচে। আর এদের ৫৮ শতাংশই নারী, ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ১৭ শতাংশ গৃহিণী। আত্মহত্যাকারীদের ৬১ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার এবং এদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ বিবাহিত। গবেষণার জন্য ৬ মাস ধরে ১১ থেকে ৭০ বছর বয়সী ২৭১ জন মানুষের ওপর জরিপ হয়। এতে আরও বলা হয়, দড়িতে ঝুলে আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮৩ শতাংশ। আত্মহত্যার কারণ মানসিক বিষণ্নতা এবং পারিবারিক কলহ। বিশেষজ্ঞরা জানান, পিতা-মাতার ভালোবাসা বঞ্চিত হয়ে, প্রয়োজনীয় বিনোদনের অভাব, পারিবারিক অশান্তি, পড়ালেখা নিয়ে শাসন, উত্ত্যক্ততা, মা-বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ ও পারিবারিক শৃঙ্খলার অভাব তরুণ প্রজন্মের আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মা-বাবা উভয়ই কর্মক্ষেত্রে থাকায় তারা এখন সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। আর একাকিত্বের মধ্যে থাকা সন্তান সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে না। তারা বিষণ্নতায় ভুগে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটাচ্ছে। অক্টোবর মাসেই এ পর্যন্ত আত্মহত্যার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। লেখাপড়ায় অমনোযোগিতার জন্য তিরস্কার করায় গত ৭ অক্টোবর ঈশ্বরদীতে সিলিং ফ্যানে ঝুলে লিজা খাতুন (১৪) এবং রাজশাহীর দুর্গাপুরে গত ৫ অক্টোবর বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে মাহফুজা খাতুন (১২)। বখাটেরা উত্ত্যক্ত করায় বগুড়ায় ১০ ও ১১ অক্টোবর দুই স্কুল ছাত্রী, ১০ শ্রেণির শিলা আক্তার ও প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থী মিলি খাতুন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। চলতি বছরে দুই নারী মডেলও আত্মহত্যা করেন। এদের একজন জ্যাকুলিন মিথিলার পরিবার পুলিশকে জানায়, শ্বশুরবাড়ির লোকদের অত্যাচারে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন মিথিলা। ৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে এই মডেল আত্মহত্যা করেন এবং মৃত্যুর আগে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আত্মহত্যার ঘোষণা দেন। ঢাকার আরেক নারী মডেল রিসিলা বিনতে ওয়াজিরা গত ৩১ জুলাই স্বামীর সঙ্গে হোয়াটস অ্যাপে কথা বলার সময় ফোন না কেটে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক কলহের কারণে তিনি আত্মহত্যা করেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণত আত্মহত্যার দুটি ধরন। তাত্ক্ষণিক তাড়না থেকে আত্মহত্যা। অন্যটি পরিকল্পিত আত্মহত্যা। তরুণী ও কিশোরীদের মধ্যে অনেকেই প্রেমে ব্যর্থ হয়ে, ইন্টারনেটে নিজের অশ্লীল ছবি ছড়ানোর ঘটনা, বখাটেদের উত্ত্যক্ততা এবং অভিভাবকের কড়া শাসনে রুষ্ট হয়ে তাত্ক্ষণিক তাড়নায় আত্মহত্যা করছে। আশঙ্কার বিষয় এই যে, অভিভাবকরা শাসন করায় উঠতি বয়সী শিশুদের আত্মহত্যার ঘটনা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের অনেকেই আবার পড়ালেখায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে না পেরেও আত্মহত্যা করছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিমাত্রার বিষণ্ন যে রোগীরা আত্মহত্যার পরিকল্পনা করে তাদের জন্য শুধু কাউন্সিলিং যথেষ্ট নয়। এ ধরনের রোগীদের আত্মহত্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট। কিন্তু বাংলাদেশি মনোচিকিত্সকরাই জানান যে, রোগীর অনুপাতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রশিক্ষিত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট যথেষ্ট অভাব। মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দৈনিক গড়ে ৩০ জন রোগীর মধ্যে পাঁচজনই অতিরিক্ত বিষণ্নতার রোগী পাই। কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্নতায় ভুগতে থাকলে এক সময় তিনি পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা করেন।

তার মতে, সমাজে যারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তাদের সঠিক চিকিত্সার প্রয়োজন। আর পরিবারের লোকজনদেরও আত্মহত্যা প্ররোচিত হওয়ার আশঙ্কা আছে এমন সদস্যদের চিকিত্সা গ্রহণে উত্সাহিত করতে হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর