শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:৩১

যৌন বিকৃতির টার্গেটে শিশুরা

মির্জা মেহেদী তমাল

যৌন বিকৃতির টার্গেটে শিশুরা

আট বছরের শিশু সামিয়াকে (প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হচ্ছে না) ঘরে রেখে এলাকার পানির কল থেকে পানি আনতে গিয়েছিলেন তার মা। ঘিঞ্জি এলাকার খুপরি ঘরগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি লাগোয়া। মনের মাঝে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও শিশুকন্যাটিকে একাই রেখে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু ফিরে এসে মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে দিশাহারা তার মা। হঠাৎ তার মনে হলো, পাশের বাড়িতে যে পুরুষলোকটি বসা ছিল, সে কোথায় গেল? এ ভেবেই তখন তিনি পাশের বাড়ির দরজায় ধাক্কা দেন। কিন্তু কেউ দরজা খুলছিল না। তবে তিনি কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারেন তার মাত্র আট বছরের শিশুটিকে প্রতিবেশী বৃদ্ধ ধর্ষণ করেছে। কী হয়েছে-পুরোপুরি খুলে বলতে পারছিল না মেয়েটি। সে বলছিল, মা, দাদা আমার পাজামা খুলে দিয়েছে। নিজের কাপড় খুলেছে। আমি খেলতেছিলাম। মুখ চেপে ধরে নিয়ে গেছে। প্রতিবেশী তাই দাদা ডাকত মেয়েটি। এ ঘটনাটি কয়েক মাস আগের। ঘটে রাজধানীতেই। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার গেণ্ডারিয়া এলাকায় আয়েশা নামের দুই বছরের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, নাহিদ (৪৫) নামের এক প্রতিবেশী শিশুটির বাসার পাশের একটি চারতলা ভবনের তিন তলায় থাকেন। নাহিদ দুই বছরের ওই শিশুকে খিচুড়ি খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে নিজের বাসায় ডেকে নেন। পরে শিশুটিকে ‘ধর্ষণের’ পর তিনতলার বারান্দা থেকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করেন। একই সপ্তাহেই সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গাবতলা গ্রামে আট বছর বয়সী এক শিশু ‘ধর্ষণের’ শিকার হয়। ধর্ষণের পর শিশুটি অচেতন হয়ে গেলে, মারা গেছে ভেবে তাকে পার্শ্ববর্তী একটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় শিশুটির পরিবার একই গ্রামের জয়দেব সরকার নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ দায়ের করেছে। ঢাকার ডেমরা এলাকার একটি ঘরের খাটের নিচ থেকে ফারিয়া আক্তার দোলা (৫) ও  নুসরাত (সাড়ে ৪ বছর) নামের দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। যে ঘর থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করা হয় ওই ঘরের মালিক মোস্তফা ও তার মামাতো ভাই আজিজুলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে জবানবন্দিতে তারা স্বীকার করে, শিশু দুটিকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে তারা। এসব কেবল কয়েক দিনের ঘটনা। কিন্তু এমন অনেক ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনাও আছে যা মানুষ হয়তো জানেও না। কেবল সংবাদপত্রে শিরোনাম হওয়া গত পাঁচ বছরের শিশু নির্যাতনের চিত্রই খুব ভয়াবহ। শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, আর ধর্ষণের পর অপমানে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে অনেক। এমনকি ধর্ষণের হাত থেকে প্রতিবন্ধী শিশুরাও রেহাই পায়নি। শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরও ৬৩৯ জন শিশু। বাংলাদেশে পথবাসী, শ্রমজীবী এবং দরিদ্র শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে প্রায়ই, বলছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, অনেকে অজ্ঞতার কারণে আর বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেকেই আদালত বা পুলিশের দোড়গোড়ায় পৌঁছাচ্ছেন না। ফলে এসব অপরাধ ঘটছেই। অনেক শিশুর অভিভাবক জানেই না কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়। আর অনেকে দেখছেন অনেক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে কিন্তু বিচার তো হচ্ছে না। বাইরে মিটমাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সমাজে এমন অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক (সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক) তৌহিদুল হক বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফলে ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত লালসা, আচরণগত ও নানা কারণে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে। আমাদের দেশে শিশু ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হচ্ছে, তারা (শিশুরা) ধর্ষকের হাত থেকে বাঁচার মতো সক্ষমতা রাখে না। খুব সহজেই তাদের ওপর জোর-জবরদস্তি করা যায়। বয়সের কারণে তারা বড়দের মতো প্রতিবাদ করতে পারে না বা আত্মরক্ষাও করতে পারে না। ফলে যেসব মানুষের মধ্যে ধর্ষণ প্রবণতা আছে, তারা এই সুযোগকে কাজে লাগায়। তারা শিশু এবং বিকলাঙ্গ নারীদের টার্গেট করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়াটা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি ভয়ানক চিত্র ও সতর্কবাণী। ধর্ষণের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব ধর্ষণের ঘটনার পেছনে দায়ী মূলত কয়েকটি বিষয়। প্রথমত হলো- প্রযুক্তির অপব্যবহার। কারণ ইন্টারনেটে অতি সহজে যৌন ছবি, উত্তেজক ভিডিও পাওয়া যায়। ফলে ধর্ষণের নৈরাজ্য বেড়ে যাচ্ছে। পুলিশ বলছে বিকৃত মানসিকতা ও মাদকাসক্তির কারণে সমাজে এমন অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে পুলিশ সব সময় এসব ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামিদের গ্রেফতারে তৎপর থাকে এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর