শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:৪১

নদী বাঁচাও ১৯

দখলের কবলে পড়ে চার নদী মরে গেছে মেহেরপুরে

মাহবুবুল হক পোলেন, মেহেরপুর

দখলের কবলে পড়ে চার নদী মরে গেছে মেহেরপুরে

যে নদী ছিল একসময় পূর্ণ যৌবনা, যার বুক চিরে চলার পথে নাবিকের বুক দুরু দুরু করে কাঁপত, সেই নদী এখন ছোটদের খেলার মাঠ, পশুর চারণভূমি আর কৃষকের ধানচাষের খেতে পরিণত হয়েছে। খননের অভাবে বছর বছর পলি পড়ে আর প্রকৃতিগত নানা কারণে নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। মেহেরপুর জেলার প্রধান দুটি নদী ভৈরব আর মাথাভাঙ্গা। এদেরই শাখানদী কাজলা, ছেউটিয়া। এর মধ্যে ভৈরব পুনঃখনন হলেও মাথাভাঙ্গা, কাজলা আর ছেউটিয়া  দখলদারদের দৌরাত্ম্যে আজ মৃত। মাথাভাঙ্গা নদীটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলাঙ্গী নামক স্থান থেকে গঙ্গার শাখানদী হিসেবে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজীপুর দিয়ে এ দেশে প্রবাহিত। এটি ষোলটাকা, রাইপুর ও ধানখোলা ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলায় প্রবেশ করে। মাথাভাঙ্গা নদীপথেই কলকাতার সঙ্গে মেহেরপুর  তথা বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল। মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, পাবনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের যাবতীয় নীলকর এই নদীপথেই তাদের নীল কলকাতায় পাঠাতেন। ষোলটাকা, রাইপুর ও ধানখোলা ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া মাথাভাঙ্গা নদীটির বিভিন্ন অংশের দখল নিয়ে মালিকানা দাবি করে আসছে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত উন্মুক্ত নদী হলেও প্রভাবশালী এসব ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা দিয়ে সুফল নিতে হচ্ছে সাধারণ চাষিদের। এ গ্রামের কয়েকজন চাষি জানান, দখল করা নদীর জমিতে কাঠাপ্রতি ধানের চারা লাগানোর জন্য ৮০০ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। চারা উঠে গেলে সেখানে ওই জমির দখলদাররা ধান চাষ করেন। এ ছাড়া মাছের প্রাচুর্যের জন্য খ্যাত এ নদীতে দখলদাররা বাঁধ দিয়ে পুকুর কেটে মাছ চাষ করছে। ফলে সাধারণ মানুষ মাছ ও সেচ দেওয়ার মতো কোনো সুবিধাই পান না এখান থেকে। জেলার আরও একটি মৃত নদী কাজলা। কাজীপুর ইউনিয়নে মাথাভাঙ্গা থেকে প্রবাহিত হয়ে নপাড়া, ভাটপাড়া, সাহারবাটি, গাড়াডোব হয়ে আমঝুপিতে গতি বদল করে কাজলা একসময় গিয়ে পড়েছিল ভৈরবে। কিন্তু এই ক্ষুদ্র নদীটি দখলদারির কালো থাবা আর পুনঃখনন না হওয়ায় নাব্যতা হারিয়ে সবুজ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পুরো কাজলার বুক ফসলের চাষাবাদ, ফুটবল খেলা আর গোচারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। কাজলার বুক দখল করে আমঝুপি গ্রামে গড়ে উঠছে মসজিদ, স-মিলসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মেহেরপুর জেলার গাংনী থানার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অপর একটি ছোট নদী ছেউটি। ছেউটি মূলত মাথাভাঙ্গারই  শাখা। কিন্তু এ নদীর দুই মাথাই এখন মৃত। তেরাইল বিল থেকে বেরিয়ে এসে মালশাদহ, হাড়িয়াদহ, ধানখোলা, বারাদি গ্রামের পাশ দিয়ে দীনদত্তের কাছে দিয়ে মাথাভাঙ্গায় পড়েছিল ছেউটি। কিন্তু এ নদীর দক্ষিণের এই মুখেও পলি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে প্রবহমান কোনো নদীর সঙ্গেই ছেউটির আর কোনো সম্পর্ক নেই। বর্ষা মৌসুম ছাড়া অন্য কোনো সময় ছেউটিতে মোটেই পানি থাকে না। মেহেরপুরের ভূমি অফিসের দাবি, দখলদারদের অভিযোগ বানোয়াট। তবে অনেক বছর আগে ভূমি অফিসের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির মাধ্যমে ভুয়া লিজের কাগজ তৈরি করার অভিযোগ আছে।

মেহেরপুরের প্রবীণ ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, নদী মরে যাওয়ার কারণে জলপথের সব যোগাযোগ বন্ধ। ফলে মেহেরপুরের সঙ্গে এককালে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠা দামুড়হুদা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, জীবননগর, কালীগঞ্জ, খালিশপুরের সঙ্গে এখন যোগাযোগ নেই বললেই চলে। জেলার নদীগুলো সংস্কার করা হলে অর্থনীতির চাকা ফের চালু হবে। মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক  বলেন, নদীগুলো খনন করা হলে শুকনো মৌসুমে সেচ সুবিধা সৃষ্টি ও বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হবে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে সারা বছর ফসল উৎপাদনের পথ সুগম হবে। এতে এলাকার বার্ষিক শস্য উৎপাদন হার বেড়ে দ্বিগুণ হবে। এ ছাড়া সার্বক্ষণিক পানিপ্রবাহ সৃষ্টি হলে মাছের ওপর নির্ভর করা ২০-২৫ হাজার মৎস্যজীবী পরিবার তাদের পৈতৃক পেশায় পুনর্বাসিত হতে পারবে। ফলে মেহেরপুরবাসীর অর্থনৈতিক  ভাগ্যোন্নয়নে  এক নবদিগন্তের সূচনা হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর