শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০১৯ ২৩:৩৯

নদী বাঁচাও ৩৪

প্রমত্তা নদীর বুকে ধু-ধু বালুচর

মো. কাবুল উদ্দিন খান, মানিকগঞ্জ

প্রমত্তা নদীর বুকে ধু-ধু বালুচর

নদীবেষ্টিত জেলা মানিকগঞ্জ। এ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা ও ইছামতী নদী। কিন্তু যে নদী দেখলে ভয়ে বুক কাঁপত, সেই পদ্মা এখন মরে যেতে বসেছে। প্রমত্তা পদ্মার নেই আগের সেই স্রোত আর তেজ। পদ্মার বুকে কোথাও কোথাও ধু-ধু বালুচর। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই এটি নদী না ফসলি জমি, নাকি খেলার মাঠ। অন্য নদীগুলোর অবস্থাও একই। অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্ট তৈরি, দখল-দূষণসহ উজানের পলিতে ভরে গেছে এসব নদী। সময়মতো খনন না করার কারণে ভরাট হয়ে চরাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও চলছে চাষাবাদ। দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানচিত্র। জানা যায়, একসময় জেলার আজিমনগর, লেছড়াগঞ্জ, জাগির, বেউথা ঘাট, জাফরগঞ্জ সর্বত্রই নদীবন্দর ছিল। এসব এলাকা থেকে বড় বড় স্টিমার, লঞ্চ, নৌকা দেশ-বিদেশে চলাচল করত। এখন এসব কেবলই স্মৃতি। কালের বিবর্তনে মানিকগঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবহমান চারটি নদীই এখন মৃতপ্রায়। বর্ষা মৌসুম ছাড়া এ নদীগুলো থাকে পানিশূন্য। নদীর বুকজুড়ে ধু-ধু বালুচর। কোথাও চাষাবাদ, কোথাও গরু চরানো কিংবা দুরন্তদের খেলাধুলার দৃশ্য চোখে পড়ে। কল-কারখানার বর্জ্যে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে ধলেশ্বরী নদীর জাগির, গোলড়া; কালিগঙ্গা নদীর ত্বরা, বান্দুটিয়া, বেউথাসহ বৃহৎ এলাকা। গোলড়া এলাকার ইয়াকুব আলী মোল্লা, মো. সোনা মিয়াসহ অনেকেই জানান, উজানের বালিতে নদী ভরাট হয়ে গেছে। কিছু জায়গায় পানি থাকলেও কারখানার বর্জ্যে এ পানি কোনো কাজে আসে না। পানিতে মানুষ তো দূরের কথা, পশুও নামানোর উপায় নেই। বেউথা এলাকার লোকজন জানান, কারখানার বর্জ্যে কালীগঙ্গার পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। নদীতে বর্জ্য না ফেললে যা পানি আছে তাতেই নদীপাড়ের মানুষ বেঁচে যাবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রমতে, মানিকগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ধলেশ্বরী, পুরাতন ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, ইছামতী নামে চারটি নদী রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪১ কিলোমিটার। ধলেশ্বরী নদী ঘিওর উপজেলার যাবরা থেকে শুরু করে সাটুরিয়ার তিল্লি, বরাইদ হয়ে জাগিরের ভিতর দিয়ে সিংগাইরের শেষ মাথা পর্যন্ত মিশেছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ কিলোমিটার। পুরাতন ধলেশ্বরী নদীটি দৌলতপুর উপজেলার মূল যমুনা থেকে শুরু হয়ে ঘিওর উপজেলার যাবরা নামক স্থানে এসে শেষ হয়। এর দৈর্ঘ্য ২৬ কিলোমিটার। যাবরা থেকে শুরু হয়ে সিংগাইরের ধল্লা পর্যন্ত কালীগঙ্গা নদীর অবস্থান, যার দৈর্ঘ্য ৩৫ কিলোমিটার। শিবালয় উপজেলা থেকে শুরু করে উথুলী হয়ে হরিরামপুরে পদ্মা নদীর সঙ্গে মিশেছে ইছামতী নদী। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার। এ ছাড়া যমুনা নদী দৌলতপুর থেকে পাটুরিয়াঘাটে এসে শেষ হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য ৪০ কিলোমিটার। পদ্মা নদী হরিরামপুরের পাঁচটি ইউনিয়নকে বেষ্টিত করে রেখেছে। পদ্মা, যমুনা নদী ছাড়া সব নদীই এখন মৃতপ্রায়। ইতিমধ্যে বেশ কিছু নদী বিলীন হয়ে গেছে।

 যে নদীগুলো নামে টিকে আছে, দেখে বোঝার উপায় নেই যে এগুলো একসময় গভীর ছিল। জেলা থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম ছিল এই নদীপথ। কালের বিবর্তনে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং উজান থেকে আসা মাটি-বালুতে নদীগুলো ভরাট হয়ে ধু-ধু চরাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। নদীগুলো খনন না করার কারণে দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পথে। ফলে মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নদী মরে যাওয়ার ফলে কৃষিতে সেচকাজ দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একসময় কালীগঙ্গার তীরবর্তী বেউথা ঘাট, ধলেশ্বরীর তীরবর্তী জাগির ও জাফরগঞ্জ বাজার ছিল জেলার বড় নদীবন্দর। এসব নদীবন্দর থেকে বড় বড় স্টিমার, লঞ্চ, নৌকা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করত। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ত্বরাঘাট নামক স্থানে কালীগঙ্গা নদীতে ফেরি সার্ভিস চালু ছিল। জানা যায়, সর্বপ্রথম সড়কপথে সবচেয়ে বড় ব্রিজটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কালীগঙ্গা নদীতে ত্বরাঘাট এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। পানি না থাকার কারণে মানিকগঞ্জের সব নদীবন্দর কার্যক্রম হারিয়ে ফেলেছে। ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীর বুকজুড়ে এখন বোরো, ভুট্টা মাষকলাই, তামাক এবং বিভিন্ন সবজির আবাদ হচ্ছে। একসময়ের তীব্র খোরস্রোতা কালীগঙ্গায় এখন চলছে চাষাবাদ, গোচারণ ও দুরন্তদের খেলাধুলা।


আপনার মন্তব্য