শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ মে, ২০১৯ ২৩:৩০

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তিতে তারুণ্য

বাড়ছে হতাশা ও পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি

আকতারুজ্জামান ও জয়শ্রী ভাদুড়ী

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তিতে তারুণ্য

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রংপুরের ঠাকুরপাড়ায় হামলা ও হতাহতের ঘটনা ঘটায় দুর্বৃত্তরা। রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামলার ঘটনায় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তিতে হতাশ হয়ে পড়ছে তারুণ্য। পর্নোগ্রাফি আসক্তি, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে শখ্য, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বিপথগামী হচ্ছে তরুণ সমাজ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের অতি ব্যবহার শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়েরা এসব চাপের মধ্যে থাকায় ব্রেনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা, মানিয়ে নেওয়ার শক্তি হারিয়ে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে মানুষ। তরুণরা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ জীবনযাপনকে চাপে ফেলছে, তৈরি করছে সংকট, বাড়াচ্ছে প্রতিযোগিতা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উই আর সোশ্যাল’ এবং কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান ‘হুটস্যুইট’ পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, পৃথিবীর যেসব শহরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি তার মধ্যে ঢাকা দ্বিতীয়। ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকাতে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফেসবুক। সক্রিয় ইউজার অ্যাকাউন্ট ১৮০ কোটিরও বেশি। এর ৮৭ শতাংশই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহার করেন। মোবাইল ফোনে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন, এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির তালিকাতেও বিশ্বে ১০ নম্বরে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৬৯ শতাংশ হারে। এর ৫৫ শতাংশই প্রতিদিন ফেসবুক ব্যবহার করেন। ব্যবহারকারীদের ৪৪ শতাংশ নারী, ৫৬ শতাংশ পুরুষ। দ্বিতীয় স্থানে আছে ফেসবুক মেসেঞ্জার। এরপর রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব। এদের সক্রিয় ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট ১০০ কোটির ওপরে। একই জরিপে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যার ইন্টারনেট ব্যবহারের ৭৮ শতাংশই মোবাইল সংযোগনির্ভর। পৃথিবীতে প্রায় ২৭০ কোটির বেশি লোক সক্রিয়ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আধুনিক জীবনের নতুন এক বাস্তবতা। তবে শিশু-কিশোরদের মধ্যে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ২০১৭ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শ্রেণিকক্ষে সেলফোন নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ। যদিও স্কুল পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন হচ্ছে সামান্যই। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আসক্তি রোধ করা যাচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, মাধ্যমিকে স্কুল চলাকালেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী আবার এটি ব্যবহার করছে পাঠদান চলাকালে। শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যধিক আসক্তি কমিয়ে দিচ্ছে পড়ালেখায় মনোযোগ। দেখা যাচ্ছে, যে সময়টুকু এখন তারা ফেসবুক কিংবা অন্যান্য সাইটে ব্যয় করছে, আগে এ সময়ে তারা পড়ালেখা করত। এ সময়ে তারা বিদ্যালয় থেকে দেওয়া বাড়ির কাজ সম্পন্ন করত কিংবা যথাসময়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে প্রয়োজনীয় কাজে সক্রিয় থাকত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অধিক সম্পৃক্ততা তাদের সময়ানুবর্তিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এখন তারা সময়মাফিক সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারছে না। এতে শিক্ষার্থীদের ফলাফল যেমন খারাপ হচ্ছে, তেমনি সার্বিকভাবে পড়ালেখায় পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির ক্ষতি একমুখী নয়, বহুমাত্রিক। শুধু পড়ালেখা নয়, অধিক সময় ধরে মোবাইল ব্যবহারের কারণে তাদের মনোদৈহিক নানা সমস্যা তৈরি হয়। অনেকক্ষণ স্থির বসে কিংবা শুয়ে থাকায় তাদের শারীরিক সচলতা কম হয়। ফলে ঘাড় ব্যথা যেমন হয়, তেমনি বাড়ে স্থূলতা। এতে তারা শারীরিকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। আবার মানসিকভাবেও তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, বিষণœতা, একাকিত্ব, অপরাধ প্রবণতা। ব্যাহত হচ্ছে সামাজিকীকরণ। বাস্তব জগৎ থেকে একটি ভার্চুয়াল জগতে জড়িয়ে পড়ায় অনেক ক্ষেত্রে তারা সম্পৃক্ত হচ্ছে ভুয়া ও কৃত্রিম সম্পর্কে। ফলে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ভালোভাবে বিকাশ লাভ করছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব তরুণ-তরুণীদের জীবনে তৈরি করছে হতাশা। মানসিক অস্থিরতায় ভোগে বিশৃঙ্খল জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করছে তারা। সামাজিকতা নষ্ট হওয়ায় সমাজে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা।


আপনার মন্তব্য