শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৫০

৪৪ বছরেও সনদ দিতে ব্যর্থ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

রুহুল আমিন রাসেল

স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জিল হোসেনকে দীর্ঘ ৪৪ বছর যাবৎ সনদ দিতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ২৩ বছর বয়সে স্নাতক পরীক্ষা দিয়ে এখন ৬৯ বছর বয়সে অসুস্থ জিল হোসেন সনদ পেতে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ে রয়েছেন। আর আদালতের রায়ের পর ৪৭ বছর বয়সে তার হাতে আসে পরীক্ষা পাসের  মার্কশিট বা নম্বরপত্র সনদ। জিল হোসেন এখন অসুস্থতার কারণে ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না। তবু আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন অপেক্ষা করছেন ক্ষতিপূরণের জন্য। সনদ ও ক্ষতিপূরণের মামলায় ইতিমধ্যে কেটে গেছে ৪৪ বছর। এ প্রসঙ্গে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. ছাইফুল ইসলাম মঙ্গলবার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘বিষয়টি বিচারাধীন তাই কিছু বলতে পারছি না।’ জানা গেছে, ১৯৭১-৭২ শিক্ষাবর্ষে জিল হোসেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের (কৃষি) পরীক্ষার্থী ছিলেন। এ পরীক্ষা হয় ’৭৩ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার ফলাফলে তাকে অকৃতকার্য ঘোষণা করে। এ ফলাফল পুনর্বিবেচনা চেয়ে একাডেমিক কাউন্সিলে আবেদন করেন তিনি। কিন্তু সে আবেদনে কাজ হয়নি। এরপর ’৭৫ সালে তিনি পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাকে বহিষ্কার করা হয়। প্রতিকার চেয়ে ’৭৫ সালের ২২ এপ্রিল ময়মনসিংহের প্রথম মুনসেফ আদালতে মামলা করেন জিল হোসেন। মামলায় তিনি দাবি করেছিলেন, ’৭৩ সালে দেওয়া পরীক্ষায় তার প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে ভগ্নাংশ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নম্বরের সঙ্গে ভগ্নাংশ যোগ না করে অকৃতকার্য ঘোষণা করে। আদালত ’৭৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ভগ্নাংশ নম্বর যোগ না করে তাকে অকৃতকার্য করানোকেও বেআইনি ঘোষণা করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। পরে হাই কোর্ট মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য মুনসেফ আদালতে পাঠায়। ’৭৮ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রথম মুনসেফ আদালত ভগ্নাংশ নম্বর যোগ করে ৩০ দিনের মধ্যে জিল হোসেনের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করার নির্দেশ দেয়। এর বিরুদ্ধে আবার জেলা জজ আদালতে আপিল করলে তা নামঞ্জুর হয়। পরে হাই কোর্টে আপিল করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এর ওপর ’৮৩ সালের ১৬ জানুয়ারি রায় দেওয়া হয়। রায়ে বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। জানা গেছে, হাই কোর্টের রায়ের পর ’৮৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর জিল হোসেনের একটি আবেদন গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে তাকে পাস মার্ক দিয়ে ’৯৭ সালের ২২ অক্টোবর নম্বরপত্রের সনদ দেয়। তখন তার সরকারি চাকরির বয়সসীমা শেষ। এরপর ২০০০ সালের ১৮ অক্টোবর ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেন জিল হোসেন। এতে দাবি করা হয়, হাই কোর্টের রায় ১৪ বছর নয় মাস পরে কার্যকর করে বিশ্ববিদ্যালয়। এমন কাজে জিল হোসেনের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। জানা গেছে, ক্ষতিপূরণ মামলায় ময়মনসিংহের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের রায়ে ৩০ দিনের মধ্যে ২ কোটি টাকা জিল হোসেনকে দিতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল করে বিশ্ববিদ্যালয়। গত বছর সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের দ্বারস্থ হন জিল হোসেনের ছোট ছেলে নূর মোহাম্মদ। লিগ্যাল এইড কমিটি জিল হোসেনের পক্ষে হাই কোর্টে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাসকে নিয়োগ দেয়। চঞ্চল কুমার বিশ্বাস মঙ্গলবার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘জিল হোসেনের মামলা এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। এ মামলাটি তালিকায় এখনো আসেনি।’ তিনি বলেন, ‘২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের রায়ের বিরুদ্ধে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আপিল গত ১০ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। বিষয়টি একটি দ্বৈত বেঞ্চে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

তথ্যমতে, সিরাজগঞ্জ সদরের চিলগাছা গ্রামে পরিবার নিয়ে থাকেন জিল হোসেন। ওই ঘটনার পর কোনো চাকরিতে ঢোকার সুযোগ পাননি। ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসার চালিয়েছেন। তার চার ছেলে, চার মেয়ে। অসুস্থ জিল হোসেন তার সনদ ও ক্ষতিপূরণ পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান। জিল হোসেনের ছোট ছেলে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী নূর মোহাম্মদ জানিয়েছেন, ‘মামলা চালাতে জমিজমা যা ছিল, প্রায় সবই বিক্রি করে দিয়েছেন বাবা। ২০১০ সালে তিনি স্ট্রোক করেন। দুই বছর পর আবার স্ট্রোক হয়। এখন কথাও স্পষ্টভাবে বলতে পারেন না। ১৯৯৭ সালে মার্কশিট পাওয়ার পর বাবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ’৯৯ সালে সাক্ষাৎ করলে প্রধানমন্ত্রী ২৫ হাজার টাকা অর্থ অনুদান দেন। এ অর্থের সঙ্গে ৩৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করে ক্ষতিপূরণের মামলাটি করেন বাবা। তার শেষ ইচ্ছা মামলার রায় দেখে যাওয়া।’

 


আপনার মন্তব্য