শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৩ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ মে, ২০২০ ০০:০১

করোনাকালেও কমছে না রোহিঙ্গা অপরাধ

ফারুক তাহের, চট্টগ্রাম

করোনাকালেও কমছে না রোহিঙ্গা অপরাধ

হেন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা জড়ায়নি। প্রায় সব ধরনের ভয়ঙ্কর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফের বেশ কয়েকটি ক্যাম্পকে করে রেখেছে যেন অপরাধের স্বর্গরাজ্য। রাত নামলেই এসব ক্যাম্প চলে যায় রোহিঙ্গা ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের কবলে। সারা বিশ্ব যেখানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে, এ অবস্থায়ও কমছে না রোহিঙ্গাদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড। খুন, ধর্ষণ, মাদক পাচার, শিশু পাচার, ডাকাতি, অপহরণ, পতিতাবৃত্তিসহ সব ভয়ঙ্কর অপরাধের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা। ফলে কক্সবাজারের দুই উপজেলার ৩২টি ক্যাম্পে গত আড়াই বছরে রোহিঙ্গাদের হাতে রোহিঙ্গা খুন হয়েছে অর্ধশতাধিক। আবার মাদক ও অপরাধ দমন করতে গিয়ে র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে অন্তত ৮০ জন রোহিঙ্গা। দুর্ধর্ষ কিছু রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর হাতে খুন হয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতাসহ পাঁচজন। এমনকি রোহিঙ্গাদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীও। কখনো কখনো এসব রোহিঙ্গা অপরাধীকে দমন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বেগ পেতে হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নয়াপাড়া ও শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্প। এ ক্যাম্পের চারপাশে রয়েছে পাহাড়ি জনপদ। কিছুটা দুর্গম এ রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে এখনো সক্রিয় রয়েছে চার-পাঁচটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দল। তারা পাহাড়ে অবস্থান করে ডাকাতি ছাড়াও মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, অপহরণের মতো ভয়ঙ্কর সব অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অপরাধ সংঘটনে তাদের জন্য তথ্য আদান-প্রদান, অস্ত্র ও মাদক মজুদসহ ত্রাণ সরবরাহ করছে ক্যাম্পের কিছু মাঝি বা ক্যাম্পনেতা। ইতিমধ্যে তাদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে সক্রিয় ডাকাত দলের নেতৃত্বে রয়েছে জাকির ডাকাত, কামাল, খায়রুল আমিন, নুর আলী, আমান উল্লাহ, মাহমুদুল হাসান, হামিদ, নেছার, রাজ্জাক, বুলু ওরফে বুইল্যা, রফিক, মাহনুর ওরফে ছোট নুর। তারা একাধিক দলে ভাগ হয়ে নানা অপরাধ করছে। তাদের মূল নেতা হিসেবে রয়েছে আবদুল হাকিম, জাকির ও সালমান। তারা জানান, শালবন ক্যাম্প অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বেশ কয়েক দফা ওই ক্যাম্পে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েছে র‌্যাব। কেননা অভিযানের আগে ডাকাত দলের কাছে অভিযানের খবর পৌঁছে যাচ্ছে। ক্যাম্পের কিছু অসাধু মাঝি অর্থের লোভে ডাকাতদের সহযোগিতা করছে। সর্বশেষ গত বছর ডিসেম্বরে রোহিঙ্গা ডাকাত দলেরগুলোতে দুই র‌্যাব সদস্য বিদ্ধ হয়েছিলেন। এমনকি সন্ধ্যার পর ক্যাম্প এলাকায় ঢুকতেও ভয় পান অনেকে। টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন, রোহিঙ্গাদের নানা অপরাধের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ এখন চরম বিপদে। কক্সবাজারের ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে স্থানীয়রা এখন সংখ্যালঘু। বিশাল ক্যাম্পে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। দিনের বেলায় যেমন-তেমন, রাত নামলেই রোহিঙ্গা ক্যাম্প যেন এক একটি আতঙ্কের জনপদ হয়ে ওঠে। র‌্যাব-১৫ অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, ‘যতই দিন যাচ্ছে, রোহিঙ্গারা বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ক্যাম্পে রোহিঙ্গা ডাকাত দল সক্রিয় রয়েছে। এতে অভিযানের সময় আমাদের সদস্যরাও গুলিবিদ্ধ হচ্ছে।’ অপরাধপ্রবণ রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ক্যাম্পে বাড়ছে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধও। ২ মার্চ কক্সবাজারের টেকনাফে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এক দিনেই র‌্যাব এবং বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) পৃথক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আট রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। র‌্যাবের অভিযানে নিহত সাতজনকে ডাকাত এবং বিজিবির অভিযানে নিহত একজনকে মাদক কারবারি বলে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এক দিনে এত বেশি রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি বলে দাবি করেছেন স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত নভেম্বরে এক প্রতিবেদনে দাবি করে, বাংলাদেশে ২০১৮ সালের মে থেকে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েছে। সেই থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৮৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন বলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের হিসাব সূত্রে জানা গেছে, যার মধ্যে পুলিশের অভিযানে ৩৫, বিজিবির অভিযানে ২৫ এবং র‌্যাবের অভিযানে ২৫ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। গত বছর ২২ আগস্ট রাতে জাদিমুরাতে স্থানীয় যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক (৩০) সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হওয়ার পর রোহিঙ্গা ডাকাত গোষ্ঠীগুলোকে দমনে আরও সক্রিয় হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ, চুরি, মাদক ও মানব পাচারসহ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে উখিয়া ও টেকনাফ থানায় মামলা হয়েছে ৫০০’র মতো। এর মধ্যে মাদক মামলা, হত্যা মামলা ও নারী-সংক্রান্ত মামলাই বেশি। এসব মামলায় আসামি রয়েছে বারো এ হাজার ২০০’র মতো। উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বিপুল এ জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এদিকে দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কারসাজিতে পরপর দুবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আর রোহিঙ্গাদের এমন অপরাধ কর্মকান্ড ও সহিংস আচরণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও ভাবিয়ে তুলেছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, কোনো কাজ ও সংসারের পিছুটান না থাকায় রোহিঙ্গারা নানা অপকর্মে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ইয়াবা রাজ্য বানিয়েছে। ধর্ষণ, খুন, হামলা তাদের নিয়মিত কাজে পরিণত হয়েছে। তাদের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা এখন অসহায় হয়ে পড়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর