শুক্রবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

মেঘনায় ভেসে আসা লাশের রহস্য জানা গেল দেড় বছর পর

খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দেয় পুরনো প্রেমিক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় দেড় বছর পর জানা গেল মেঘনা নদীতে ভেসে আসা এক নারীর লাশের রহস্য। ওই নারীর নাম লিপা আক্তার ওরফে নিপা (২২)। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে তাকে হত্যার নেপথ্য কাহিনি বেরিয়ে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিয়ের পর পুরনো প্রেমিক আমিনুল ইসলাম ওরফে আমিরুলের সঙ্গে ফের যোগাযোগ শুরু হয় নিপার। তাদের সম্পর্কের একপর্যায়ে নিপা গর্ভবতী হয়ে পড়লে আমিরুলকে বিয়ের জন্য চাপ দেন নিপা। এক রাতে বিয়ের কথা বলে নিপাকে ঘর থেকে নিয়ে যায় আমিরুল। মেঘনা নদীর মাঝে নৌকায় নিপাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। আমিরুলসহ এই কিলিং মিশনে অংশ নেয় মোট সাতজন। গতকাল দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই হেডকোয়ার্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান সংস্থাটির নরসিংদী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বছরের ২৬ এপ্রিল মেঘনা নদী থেকে অজ্ঞাত এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি দাফন করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেখে পুলিশের সহায়তায় পরিবার           নিশ্চিত হয় লাশটি লিপা আক্তার নিপার। লাশ পাওয়ার পরই নরসিংদী সদর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরবর্তীতে নিপার মা কোহিনুর বেগমের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে নরসিংদী সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলাটি প্রথমে নৌ-পুলিশ তদন্ত করলেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় পরে পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআইর নরসিংদী জেলার এসপি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, আমিরুলের বন্ধু সুজন মিয়া ও চাচাতো ভাই জহিরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রধান আসামি আমিরুল পলাতক রয়েছেন। আর বাকি চারজন বর্তমানে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন। গ্রেফতার দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়- আমিরুলের সঙ্গে নিপার দীর্ঘ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু আমিরুলের বাবা তাদের সম্পর্ক মেনে নেননি, বরং নিপাকে অন্যত্র বিয়ে দিতে সহায়তা করেন। সেখানে নিপা এক বছর সংসার করে এবং একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। একপর্যায়ে নিপার স্বামীকে তাদের অতীতের প্রেমের কাহিনি বলেন আমিরুল। এতে নিপার স্বামী ক্ষিপ্ত হয়ে নিপাকে সন্তানসহ বাবার বাড়িতে রেখে আসেন। এর মধ্যে নিপার স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে ফেলেন এবং নিপার সঙ্গে আমিরুলের ফের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্কের এক পর্যায়ে নিপা গর্ভবতী হয়ে পড়েন। আমিরুল নিপার বাচ্চাটি নষ্ট করার জন্য হাসপাতালে গেলে এটি সম্ভব হবে না বলে জানায় চিকিৎসক। সে সময় নিপা চার থেকে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে আমিরুলকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন নিপা। এর মধ্যে আমিরুল অন্য সহযোগীদের নিয়ে নিপাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সে অনুযায়ী গত বছরের ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যার পর নিপাকে বিয়ের কথা বলে নৌকায় করে মেঘনা নদীতে নিয়ে যায়। মাঝ নদীতে নিয়ে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে এবং কাঠ দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে নিপার মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা। তিনি বলেন, নিপাকে হত্যার পর চরের কোথাও লাশটি চাপা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু নদীর সবদিকে জেলেদের উপস্থিতি থাকায় উপায় না দেখে নিপার লাশটি নদীতে ভাসিয়ে দেয় তারা। আর হত্যায় ব্যবহৃত গামছা ও তাদের সঙ্গে থাকা কোদাল নদীতে ফেলে দেয়। এমনকি নৌকাটিও অন্যত্র বিক্রি করে দেয়। পরে নৌকাটিকে আলামত হিসেবে সংগ্রহ করতে পেরেছে পিবিআই। পরবর্তীতে ভাসমান লাশটি ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ শনাক্তের পর হত্যা মামলা করতে গিয়ে নিপার পরিবার নানা ধরনের ভয়ভীতির সম্মুখীন হয়। পরে নিপার মা কোহিনুর বেগমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নরসিংদী সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়।

সর্বশেষ খবর