শিরোনাম
রবিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০০:০০ টা

দিনে উচ্ছেদ রাতে ফের দখল

রোমান চৌধুরী সুমন, নারায়ণগঞ্জ

দিনে উচ্ছেদ রাতে ফের দখল

চারটি নদী আর একটি নদে বেষ্টিত শিল্প নগরীখ্যাত নারায়ণগঞ্জ। শীতলক্ষ্যা, বুড়ীগঙ্গা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, ও ব্রহ্মপুত্র নদ দীর্ঘ ২০ বছর ধরে দখলবাজির শিকার হয়ে আসছে। দুই পাড় বেপরোয়াভাবে দখল করে রেখেছে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানসহ অগণিত দখলদার। আর এ দখলের বিরুদ্ধে প্রায় সময়ই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চালাচ্ছে উচ্ছেদ অভিযান। কিন্তু দিনে উচ্ছেদ অভিযান শেষ হতেই রাতে দখল হয়ে যাচ্ছে জায়গাগুলো। আবার উচ্ছেদ হচ্ছে, আবার দখল হচ্ছে। এ ভাবেই চলছে ‘চোর-পুলিশ’ খেলা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দখলদাররা মেতে আছেন নদী দখলের অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। এতে নারায়ণগঞ্জের স্রোতস্বিনী নদী ও নদীর মূল শাখা নদীগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষায় নদীতে জোয়ার ভাটার দেখা মিললেও শুকনো মৌসুমে নদীগুলো মরা নদীতে পরিণত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন নদী এলাকা ঘুরে দেখা যায় মূল নদী থেকে শুরু করে শাখা নদীও রক্ষা পায়নি দখলদারদের হাত থেকে।

শীতলক্ষ্যা : দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদী। এক দিকে নদীর দুই তীর দখল, অন্য দিকে এলোমেলোভাবে নৌযান নোঙর করে রাখার ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদী। এতে প্রতিনিয়ত বিঘ্ন ঘটছে নৌযান চলাচল, সেই সঙ্গে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। শীতলক্ষ্যা নদীতে দখল এবং বিশৃঙ্খলভাবে জাহাজ নোঙরের কারণে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে একটি চ্যানেল। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। গত দুই বছরে বড় দুটি লঞ্চ দুর্ঘটনাসহ অর্ধডজন নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫ জন যাত্রী। নৌপথ সরু হওয়ার কারণে দুর্ঘটনা বাড়লেও তা দেখার যেন কেউ নেই। অবৈধভাবে নদী দখল করে রাখায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম নাসিম ওসমান তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু সংলগ্ন নদী সরু হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। ফলে ব্রিজের সামনে যে কোনো সময় নৌদুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। দুই বছর আগে এখানে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় সাবিত আল হাসান নামে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে প্রাণ হারান ৩৫ জন যাত্রী। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর সামনে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় সাবিত আল হাসান নামে একটি লঞ্চ ডুবে ৩৪ জন নারী পুরুষের প্রাণহানি ঘটে। এ ছাড়া ২০২২ সালের ২১ মার্চ এমভি রূপসীর সঙ্গে একই রুটে চলাচলকারী অপর একটি লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে একটি লঞ্চ ডুবে ১১ জন যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটে।

বুড়ীগঙ্গা দখল : নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থেকে পোস্তখোলা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পাড়ে সাধারণ মানুষ পায়ে হাঁটার জন্য নির্মিত পথ (ওয়াকওয়ে) ভেঙে দিয়ে অবৈধভাবে নদী দখল করে পরিচালিত হচ্ছে বালু ও পাথরের লোড-আনলোডের ব্যবসা। ফতুল্লার দাপা বালুরঘাট বুড়িগঙ্গা নদী থেকে বালু ও পাথর ওঠানোর জন্য ওয়াকওয়ের দেয়াল ভেঙে নদী ভরাট করে জেটি ও কাঠের সিঁড়ি নির্মাণ করে মালামাল আনা-নেওয়া করছে দখলদাররা। এতে বালু ও পাথরের নুড়ি পড়ে ভরাট হচ্ছে নদীর তলদেশ। মাঝেমধ্যে বিআইডব্লিউটিএ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ভেঙে ফেলা হলেও অভিযানের পরপরই ফের দখল করে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বালু ও পাথরের ব্যাবসা। এ ছাড়া নদীর দুই পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা। নদীর পাড়ে রয়েছে অনেক বালু ঘাট। সেখান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালু জেলার বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়। বর্ষা মৌসুমে বালুর চাহিদা বেড়ে যায় কয়েক গুণ, আর এ অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতেই নদীর জায়গা দখল করে করা হয় বালু মজুদ। ওই বালুতে ধীরে ধীরে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

ধলেশ্বরী নদ : ফতুল্লায় বুড়িগঙ্গা নদীর শেষ প্রান্তে মুন্সীগঞ্জের সঙ্গে সংযোগ হয়েছে ধলেশ্বরী নদীটি। নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটভাটা, বালু ও চোরাই তেল ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের নদী দখলে অনুমতিপত্র নেই। তারপরও প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে ধলেশ্বর নদ দখল করে রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দেখা যায়, নদীর পাড় দখল করে এসব প্রতিষ্ঠান আধা পাকা টিনশেড অফিস নির্মাণ করেছে। বক্তাবলী ফেরিঘাট এলাকায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অফিস এখনো রয়েছে। এভাবে নদীটি দখল হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ব্রহ্মপুত্র নদ : বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে অবস্থিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান ব্রহ্মপুত্র নদ। দখলদারদের কবলে পড়ে এ নদ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। কলাগাছিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদ দখল করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভূমি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগসাজশে শক্তিমান ব্যক্তিরা নদের ওপরই নির্মাণ করছে পাকা স্থাপনা। দুই তীর দখল করে নির্মাণ করা হচ্ছে কলকারখানাসহ নানা স্থাপনা। ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে ব্রহ্মপুত্র। স্থানীয়রা বলছেন, দখল বন্ধ না হলে এ নদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। এ নদটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও বন্দর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে আরও কয়েকটি জেলায়। এ নদকে ঘিরে এখনো অনেক জেলে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়। এ ছাড়া প্রতি বছর চৈত্র মাসে অষ্টমীতিথিতে ব্রহ্মপুত্র নদের লাঙ্গলবন্দে স্নান উৎসবও হয়। আগমন ঘটে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ সনাতন ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থীর। কিন্তু কোনো নদী আইন না মেনে এই নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডকইয়ার্ড, কলকারখানা। ব্যক্তি প্রয়োজনে নদীর পাড় বালু দিয়ে ভরাট করে স্থানীয় প্রভাবশালী অনেকেই গড়ে তুলেছে অসংখ্য টং দোকান।

মেঘনা নদী দখল : সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদী ও মেঘনা ঘাট এলাকায় দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ইতোমধ্যে মেঘনার প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে তারা। মেঘনা সেতু থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে প্রায় আড়াই বিঘা খাস জমি দখল করে উঠেছে বিভিন্ন চক্রের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মেঘনা সেতু-সংলগ্ন নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে স্থাপনা ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় মেঘনা সেতুর দুই পাশের নিচের জায়গাগুলোতেও অবৈধ দখলে চলছে বালু ও পাথরের ব্যবসা। এদিকে খাস জায়গা ও নদী তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সরকারি উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও তা কাজে আসছে না। সকালে উচ্ছেদ হলে বিকালে হয় পুনর্বাসন। মেঘনাঘাট এলাকায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার সরকারি জমি দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন চক্র। বিভিন্ন সময় দখল উচ্ছেদ অভিযান দেখা যায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু তা যেন শুধুই আইওয়াশ। দিনে উচ্ছেদ হলেও রাতেই হয় দখল। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিয়েই বছরের পর বছর এসব নদী দখল করে আছে অসাধু চক্র।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর