শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ মার্চ, ২০২০ ১৫:৪৬
আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০২০ ১৭:৪৮

মানব সভ্যতার গতি থামাল করোনা দুর্যোগ!

এফ এম শাহীন

মানব সভ্যতার গতি থামাল করোনা দুর্যোগ!
এফ এম শাহীন

শত সহস্র বছরের গতিময় মানব জীবনকে থামিয়ে দিলো করোনা নামক একটি ভাইরাস! ভাবতে পারেন কোন বোমারু বিমান নয়, কোন শক্তিশালী অস্ত্র, বিশ্বের নামকরা প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীও নয়। নয় কোন নাপাম বোমা, মলোটভ ককটেল কিংবা আণবিক বোমা। অজানা অচেনা একটি ভাইরাস কেড়ে নিচ্ছে হাজার হাজার মানব প্রাণ। আক্রান্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। সংক্রমণের আতঙ্কে জীবনকে বন্দী করে রেখেছে কোটি কোটি প্রাণ। সিনেমা হল থেকে খেলার মাঠ ফাঁকা হয়েছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য দেশে দেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও চার্চসহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে স্কুল, কলেজ, শপিং মল, সমস্ত স্থল, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর দিয়ে চলাচলে নিষেধ করা হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে । 

অথচ আমরা দেখেছি বিজ্ঞানের আর্শীবাদে পৃথিবী চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। সৃষ্টির নেশায় মত্ত থেকে মানুষ এক এক সময় আবিষ্কার করেছে এক এক ধরনের জিনিস। সময়ের সাথে সাথে চাহিদামত সেই সব আবিষ্কারের পরিবর্তন পরিবর্ধন করেছে নানা রঙে নানা ঢঙে । মানব ইতিহাসে সবচাইতে বড় আবিষ্কার হচ্ছে আগুনের আবিষ্কার। পুরনো পাথরের যুগ থেকে আগুন বস করে মানুষ তার বিশ্বকে নতুন করে সাজিয়েছে। হাজার বছরের সাধনায় স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিয়েছে এই গ্রহের শ্রেষ্ঠ জীব দাবি করা মানুষ । 

আমরা দেখেছি এই মানুষ তার প্রিয় অচীন পাখি প্রাণকে সুরক্ষা করতে যতটা না ভেবেছে বা খরচ করেছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় করেছে, মেধা খাটিয়েছে মানুষকে হত্যার জন্য বানানো মরনাস্ত্র বানাতে। প্রয়োজনীয়তার চেয়ে আভিজাত্য যে পৃথিবীতে বড় হয়ে যায়, সেই পৃথিবীতে জীবন বাঁচানো মানুষদের চেয়ে বিনোদনের মানুষ সেলিব্রেটি হয়ে যায়! তারা শান্তি আর সম্প্রীতির জন্য যতটা না ভেবেছে তার চেয়ে অধিক ভেবেছে ভোগ উপভোগ আর সম্ভোগে। তার জন্য যুগে-যুগে, দেশে-দেশে এই মানুষ কতই না মনুষ্যত্বহীন অমানবিক অপরাধ করেছে নিরীহ মানুষ ও অবলা জীবের উপর, তার বর্ণনা আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায় ।     

আজ সেই মানুষের সব আবিষ্কারের ইতিহাসকে মুছে দিতে মরিয়া একটি মাত্র প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনা। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানেই গত বছরের ডিসেম্বরে এই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এখন এ ভাইরাস বিশ্বের ১৬৫টি দেশে ছড়িয়েছে। বুধবার পর্যন্ত মারা গেছে আট হাজারের বেশি মানুষ। আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে। করোনাভাইরাস এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস, যা এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। ২০০২ সাল থেকে চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স, যার পুরো নাম সিভিয়ার অ্যাকুইট রেসপিরেটরি সিনড্রোম। এই ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল আর ৮০৯৮ জন সংক্রমিত হয়েছিল। সেটিও ছিল এক ধরণের করোনাভাইরাস। নতুন এই রোগটিকে প্রথমদিকে নানা নামে ডাকা হচ্ছিল, যেমন 'চায়না ভাইরাস', 'করোনাভাইরাস', '২০১৯ এনকভ', 'নতুন ভাইরাস', 'রহস্য ভাইরাস' ইত্যাদি। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগটির আনুষ্ঠানিক নাম দেয় কোভিড-১৯ যা 'করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। 

পরিসংখ্যান বিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটার এর তথ্যমতে, সারাবিশ্বে বুধবার রাত পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৮ হাজার ৪৫৭ জনের শরীরে করোনার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এরমধ্যে মারা গেছেন ৮ হাজার ২৭৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৭৩৩ জন, আর মারা গেছেন ৩০৫ জন। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ফিরেছেন অন্তত ৮২ হাজার ৯০৯ জন। 

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হওয়া চীনে ৮০ হাজার ৮৯৪ জনের মধ্যে মারা গেছেন ৩ হাজার ২৩৭ জন। এরপরই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ইতালি। সেখানে ৩১ হাজার ৫০৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৫০৩ জনের। সুস্থ হয়েছেন ২৯৪১ জন। ইরানে মারা গেছে ১১৩৫ জন আর আক্রান্ত হয়েছে ১৭৩৬১। সুস্থ হয়েছে ৫৩৮৯ জন। স্পেনে মারা গেছে ৬২৩ জন। আক্রান্ত ১৩,৯১০ জন।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৪ জন করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। আর মারা গেছেন একজন। এই ভাইরাস মানুষের তৈরি না প্রকৃতি থেকে এসেছে তা নিয়ে নানা বিতর্ক শুরু হয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। 

বাংলাদেশে গতকাল (বুধবার) একজনের মৃত্যুর খবরে সবার টনক নড়েছে । অথচ আমরা এক থেকে দেড় মাস প্রস্তুতি নেয়ার সময় পেয়েছিলাম! কিন্তু কোন অজানা কারণে তেমন কোন প্রস্তুতি আমাদের চোখে পড়েনি। ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা উপজেলা থেকে খবর আসছে এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের পরীক্ষা করার কিট নেই, নেই আক্রান্ত রোগীর সেবা দানে ডাক্তার-নার্সদের সুরক্ষা সরঞ্জাম। বিদেশ থেকে আসা পর্যটক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও প্রবাসী 'নবাবজাদাদের' হোম কোয়ারেন্টাইনের নামে সর্বোচ্চ উদাসীনতা দেখিয়ে পুরো দেশটাকে অনিরাপদ করে ফেলেছি আমরা! জানিনা এই আতঙ্ক আর মহামারী থেকে মুক্তি মিলবে কিভাবে?  

তবে বিশ্বের বড় বড় গবেষক ও বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নির্ঘুম প্রচেষ্টার পরও এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলেও বাংলাদেশের কিছু কাঠমোল্লার দল দোয়া ও দাওয়াই দিয়ে বিভ্রান্ত করছে নিরীহ আতঙ্কগ্রস্থ মানুষকে। এই রোগটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন বিশ্ব মহামারি ঘোষণা করেছে , বাংলাদেশ সরকারও গণজমায়েত নিষিদ্ধ করার পরেও প্রশাসনের নাকের ডগায় লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জে বুধবার সকালে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি গণজমায়েত করেছে! 

অন্যদিকে প্রবাস থেকে আসা 'নবাবজাদাদের' যারা হোম কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম না মেনে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বেড়াতে যাচ্ছেন, আমোদে আছেন- তাদের প্রতিরোধ করার দায়িত্ব যেমন কর্তৃপক্ষের, তেমনি এলাকাবাসীর। এখনই সময় হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্যাংক, ফার্মেসি, মুদি দোকান ছাড়া সব বন্ধ করার! করোনাভাইরাস থেকে মানুষকে বাঁচাতে আগামী ১৫ দিনের জন্য কিছু না হলেও মানুষের নিরাপত্তার জন্য বন্ধ করুন সব রকমের গণজমায়েত । অনেক উদাসীনতা দেখেছি! ক্যামেরার সামনে আপনাদের বড় বড় কথা আর শুনতে চাই না । শুধু প্রেস ব্রিফিং না করে মন দিয়ে শুনুন, এই ভাইরাস কোন জজ-ব্যারিস্টার, এমপি-মন্ত্রী , আমলা-কামলা চেনে না। চেনে না কোন সেনাবাহিনী, র‌্যাব-পুলিশ। একবার মহামারীতে রুপ নিলে পালিয়েও বাঁচতে পারবেন না । তাই দ্রুত মানব কল্যাণে হেলাফেলা না করে সিদ্ধান্ত নিন ।

এই মহামারী আর আতঙ্কের মধ্যে বিশ্বাস করতে চাই, সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত ও সম্মিলিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ, ঘুরে দাঁড়াবে বিশ্ব । মানুষ গাইবে আবার প্রাণের জয়গান। দ্রুত আবিষ্কার হবে মানবকল্যাণের গবেষক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের হাত ধরে প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রতিষেধক। মানুষের জয় হবেই । 

লেখক : সম্পাদক, ডেইলি জাগরণ ডট কম ।
সাধারণ সম্পাদক, গৌরব ‘৭১’।
মেইল- [email protected]

বিডি-প্রতিদিন/শফিক


আপনার মন্তব্য