শিরোনাম
প্রকাশ : ১২ আগস্ট, ২০২০ ১৭:২৫

শোকের মাস আগস্টে স্বাধীনতা বিরোধীরা আজও সক্রিয়

এইচ টি জুবায়ের সৈকত

শোকের মাস আগস্টে স্বাধীনতা বিরোধীরা আজও সক্রিয়

আগস্ট মানেই বাংলাদেশের কাছে বিভীষিকা। শোকের মাস আগস্ট। ষড়যন্ত্রের মাসও। আজও ষড়যন্ত্র চলছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ১৯৭১-এ তাঁদের দেশীয় দোসরদের সাহায্যে নির্মম অত্যাচার চালায় আগস্টে। একাধিক বধ্যভূমি রক্তাক্ত হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের রক্তে। ব্যাপক গণহত্যার পাশাপাশি চলে মা-বোনদের সম্ভ্রম লুণ্ঠন। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে শুরু হয় বর্বরতার চূড়ান্ত নিদর্শন। পাকিস্তানিদের বাঙালি নিধন কর্মকাণ্ডে মদদ যুগিয়েছে চীন। মুখ ঘুরিয়ে ছিল আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশ। কিন্তু প্রতিবেশীর দুর্দশায় চুপ করে থাকতে পারেনি ভারত। ভারতীয় সেনাদের সার্বিক সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পরাস্ত হয় পাকিস্তান। কিন্তু বিদেশীদের চক্রান্ত আজও শেষ হয়নি। আগস্ট এলেই যেন বেড়ে যায় শত্রুর হিংস্রতা। তাই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খুন করার পর  ২০০৪-এ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকেও হত্যার চেষ্টা করা হয়।

বাংলাদেশের রক্তাক্ত ইতিহাসের জন্ম আগস্টেই। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের মধ্যেই ছিলো রক্তাক্ত পরিণতির বীজ। ব্রিটিশরা ভারতের পূর্ব-প্রান্তকে পশ্চিমপ্রান্তের পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দেয়। সাবেক পূর্ব পাকিস্তান হয়ে ওঠে পাকিস্তানিদের অত্যাচার আর লুণ্ঠনের মুক্তভূমি। ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সবকিছুতেই বাড়তে থাকে পাক-অত্যাচার। রাজনৈতিক অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয় পূর্ব-পাকিস্তানিদের। ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে পাকিস্তান অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দেন। আর তারপরই শুরু হয় অপারেশন সার্চ লাইট নামে পাকিস্তান বাহিনীর নির্মম অত্যাচার। ২৫ মার্চ থেকেই রক্তাক্ত হতে শুরু করে বধ্যভূমি। ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন পাকিস্তানিদের হাতে। ২ লাখেরও বেশি মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়। তবে সেই অত্যাচার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় মহান মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তান সেনাকে ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে। শত-সহস্র শহীদের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তারপরও ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ও যুদ্ধাপরাধীরা এখনও বাংলাদেশকে অস্থির করে তোলার চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

২৫ মার্চ মাস থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্মম গণহত্যায় লাল হয়ে ওঠে পদ্মা-মেঘনার পানি। সংগঠিত হয় একাধিক গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট। ৭১-এর আগস্ট মাসও ছিল ভয়াবহ। মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও তাঁদের দেশীয় শত্রুরা অত্যাচারের মাত্রা বাড়াতে থাকে। রাজাকার আর আলবদরদের চেষ্টায় প্রায় প্রতিদিনই বাংলার মাটি রক্তাক্ত হয় বীর শহিদের রক্তে। লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হতে বাধ্য হন। বর্বরতার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে ভারতীয় কিংবদন্তি সেতার শিল্পী পন্ডিত রবিশঙ্করের অনুরোধে জর্জ হ্যারিসন আয়োজন করেছিলেন বাংলাদেশের সমর্থনে কনসার্ট। বব ডিলান-সহ বহু নামী শিল্পী সেই কনসার্টে অংশ নেন।

১৯৭১-এর আগস্টের প্রতিটি দিনই ছিলো ভয়াবহ। মার্চ থেকেই শুরু হয়েছিল বাঙালি নিধন। আগস্টেও সেটা চলতে থাকে। ৩ আগস্ট ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের পাদদেশে ছোটগ্রাম নকশী সেদিন রক্তাক্ত হয়েছিল পাকিস্তানি সেনার অত্যাচারে। রাজাকার আর আলবদরদের সহযোগিতায় বহু মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয় নকশীর মাটিতে। ৪ আগস্ট আটোয়ারি গণহত্যা পাকিস্তানের বর্বরতার আরেক নিদর্শন। আটোয়ারি উপজেলার ধামোর ইউনিয়ন থেকে জনা পঁচিশেক মানুষকে পাকিস্তানি সেনা ছাউনিতে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মম অত্যাচারের পর হত্যা করা হয়। এর পরদিনই চুয়াডাঙায় ৮ মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। গ্রামবাসীরাও রক্তাক্ত হন পাকিস্তানি হানাদারদের গুলিবর্ষণে। ৭ আগস্ট ঠাকুরগাঁও জেলার রুহিয়া ইউনিয়ণের রামনাথ হাটের গণহত্যা সেখানকার মানুষ আজও ভুলতে পারেনি। গ্রামবাসীকে তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করা হয়। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় শিশু ও কিশোরদেরও। দুই দিন ধরে গণহত্যা চালিয়ে স্থানীয় নুরুল ইসলামের বাড়িতে পাকিস্তানি হানাদাররা মৃতদের লাশ কবর দেয়।

বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরে শুধুমাত্র জানাজায় অংশ নেওয়ার অপরাধে পাকিস্তানি হানাদাররা গণহত্যা চালায়। ১৬ আগস্ট স্থানীয় সোমেশ্বর নদীর পারে রশি দিয়ে বেঁধে মেশিন গানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় নিরীহ গ্রামবাসীদের দেহ। তারপর সেই লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় সোমেশ্বরী নদীতে। খুলনা, সিলেট, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুন্দরবন প্রভৃতি জায়গায় একাধিক বধ্যভূমিতে চলতেই থাকে পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞ। বানিয়াচঙ্গ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল কাগাপাশা ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত মাকালকান্দি রক্তাক্ত হলো ১৮ আগস্ট। পুলিশ অফিসার জয়নাল আবেদিন ও রাজাকার সৈয়দ ফজলুল হককে সঙ্গে নিয়ে মনসা পূজার দিন মাকালকান্দি গ্রামে নিরীহ মানুষদের ওপর হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনারা। তাদের অতর্কিত হামলায় বহু গ্রামবাসী প্রাণ হারান। ১২ জন গ্রামবাসীকে সূতা নদীর সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাকিদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে খুন করে পাকিস্তানিরা। ১৯ আগস্ট সকালে নোয়াখালির গোপালপুর রক্তাক্ত হয় পাকিস্তানি বর্বরতায়। শ-দুয়েক পাকিস্তানি সেনা গোপালপুর বাজারে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাজার থেকে ধরে এনে খালপাড়ে দাঁড় করিয়ে ৫৬ জনকে গুলি করে। একইভাবে ১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শালীহর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যায় ১ জন মুসলমান ও ১৩ জন হিন্দু প্রাণ হারান। ২৮ আগস্ট আখাউড়া উপজেলার টানমান্দাইলে গঙ্গাসাগর দিঘির পারে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়  মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের আত্মীয়দের।

১৯৭১ সালে আগস্টের শেষদিনটি ছিলো মঙ্গলবার। আর সেই মঙ্গলবারই নরসিংদী ও সুনামগঞ্জের মানুষদের কাছে ছিলো বিভীষিকাময় দিন। দিনের শুরুটা অবশ্য ছিলো মুক্তিবাহিনীর পক্ষে। এদিন শিবপুর থানায় সফল আক্রমণ চালান মুক্তিযোদ্ধারা। পুটিয়রে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল বিক্রমে ৩৩টি মরদেহ ফেলে রেখে পালাতে হয় পাকিস্তানি সেনাদের। চার ঘণ্টার যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনার ক্যাপ্টেন সেলিমও প্রাণ হারায়। এরপরই পাকিস্তানি-সেনারা নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর গণহত্যা চালায়। রাজাকার, অলবদররা শান্তি বৈঠকের নামে গ্রামবাসীদের ছিরামিসি উচ্চ বিদ্যালয়ে জমায়েত হন। তারপরই নৌকায় পিঠমোড়া করে বেঁধে চলে গুলিবৃষ্টি। ১২৬ জন গ্রামবাসী শহিদ হন। জনশূন্য গ্রামে চলে লুঠতরাজ। শেরপুর নকলা উপজেলার নারায়ণ খোলাতেও ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা-সহ অর্ধশতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। ১৯৭১-এর ৩১ আগস্ট পাকহানাদার বাহিনী সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মীরপুর ইউনিয়নের শ্রীরামসী গ্রামে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় নারকীয় তাণ্ডব চালিয়ে গ্রামের সহজ সরল ১২৬ জনকে হত্যা করে। আগস্টের শেষ দিনে অবশ্য পাকিস্তানেরও ৫০-৬০ জন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রাণ হারায়।

১৯৭১-এর পরেও আগস্ট মাসে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে নিহত হন বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ পুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্নেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক, প্রায় একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় বেন্টু খান। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু তারপরও চলছে তাঁদেরকেও খুন করার ষড়যন্ত্র।  ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড ছুড়ে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। অল্পের জন্য সেদিন তিনি বেঁচে গেলেও  আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং শ-পাঁচেক নেতাকর্মী আহত হন।

চক্রান্ত এখনও থামেনি।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শুরু হয়েছে ঘাতক-দালাল নির্মূল এবং যুদ্ধাপরাধীদের সাজাদান প্রক্রিয়া। ভারত অবশ্য সবসময়ই বাংলাদেশের পাশে থেকেছে। বঙ্গবন্ধু নিজেই ১৯৭৪ সালে ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লিগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে বলেছিলেন, ভারতের ১৪ হাজার সেনা বাংলার মাটিতে রক্ত দিয়ে বাংলার মানুষকে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু কখনওই কোনও ঔপনিবেশিক মানসিকতা ছিলো না ভারতের। তাই পাকিস্তান বাহিনীকে পরাস্ত করেও ভারতীয় সেনা এক মুহূর্তও থাকেনি বাংলাদেশে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি তবু ভারত বিরোধিতার নামে দেশটিকে দুর্বল করার খেলায় মত্ত।  তাই আগস্ট শুধু শোকের মাস হিসেবেই নয়, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাজাকারদের ষড়যন্ত্র বানচালের ভাবনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে আগস্টে। নইলে সর্বনাশ।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য